banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

Daily Archives: January 16, 2026

 

ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে স্বপ্নপথে কানিজ ফাতেমা

চাঁদপুরের এক তরুণী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে, যখন সকলের আশা ছিল স্থিতিশীল চাকরির দিকে এগোনো, তখন তিনি বেছে নিলেন এক ভিন্ন পথ—উদ্যোক্তা হওয়া। আশপাশের মানুষ হয়তো বিস্মিত, কেউ কেউ হয়তো কটাক্ষও করেছিল, কিন্তু কানিজ ফাতেমা নিজস্ব স্বপ্নের পথে অটল থেকেছেন। আজ তিনি শুধু একজন সফল ব্যবসায়ী নন, বরং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করার জন্যও পরিচিত।

কানিজ ফাতেমা প্রিয়া বহু ধরনের ব্যবসায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন—কাপড়, রেস্টুরেন্টসহ একাধিক উদ্যোগে হয়েছেন সফল। তাঁর জীবন সঙ্গী মঞ্জুরুল ইসলাম সুমন একজন চিত্রশিল্পী, এবং তাদের দুই সন্তান রয়েছে।

১৯৯৯ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় পাড়ি দেন কানিজ। এরপর ধাপে ধাপে এগিয়ে চলার গল্প শুরু হয়। ২০০৭ সালে তাঁর ব্যবসা ‘ডিভাস স্টাইল’ যাত্রা শুরু করে। ডিভাস স্টাইল মূলত তৈরি পোশাকের বাজারে—শাড়ি, পাঞ্জাবি, শিশুদের পোশাক, বেডশিট এবং কাপল ড্রেসসহ নিজস্ব ডিজাইনের পোশাক অনলাইন ও অফলাইনে বিক্রি করা হয়। বর্তমানে এখানে ২০ জন কর্মী কাজ করছেন।

তাঁর উদ্যোক্তা জীবন সবসময় সহজ ছিল না। ইঞ্জিনিয়ারিং পেশা ছেড়ে ব্যবসার পথে যাওয়া অনেকেরই পছন্দ হয়নি। কটাক্ষ ও সমালোচনার মধ্যেও কানিজ হার মানেননি। তিনি নিজস্ব দৃঢ় মনোবল নিয়ে বলেন, “সফল হলে সবাই পাশে থাকবে। তাই আমি সবসময় আমার কাজে মনোযোগ দিতাম। জীবন আমার, তাই সেটিকে সুন্দরভাবে গড়তে হবে।” শুরুর দিকে পরিবারের অনীহা থাকলেও এখন মা-বাবা তাঁর সিদ্ধান্তের সঙ্গে গর্বিত।

কানিজের উদ্যোগ শুধু ব্যবসা নয়; তিনি সমাজের জন্যও কাজ করেন। ‘আর্ট অব ডিভা ফাউন্ডেশন’ এর মাধ্যমে তিনি গ্রামে নিম্ন আয়ের নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন। উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে পণ্য সরবরাহ, শীতবস্ত্র বিতরণ, ঈদ উপহার ও এতিমদের খাদ্য সহযোগিতা—সবই এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সম্ভব হচ্ছে।

নারী উদ্যোক্তাদের ঝরে পড়ার মূল কারণ হিসেবে তিনি দেখেছেন পরিবারিক সহযোগিতা ও আর্থিক সমস্যা। তিনি বলেন, “নারী উদ্যোক্তার জন্য প্রথম প্রতিবন্ধকতা আসে পরিবার থেকে। তাই পারিবারিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

কানিজ দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু টিপস দিয়েছেন নারী উদ্যোক্তাদের জন্য:

যেটি নিয়ে উদ্যোগ নিতে চান, তা ভালোভাবে জানুন।

বাজার গবেষণা অপরিহার্য।

যে পণ্যের উপর কাজ করবেন, তার চাহিদা বোঝা জরুরি।

সঠিক কাঁচামাল নির্বাচন করুন।

উদ্যোগে তার শ্রম ও নিষ্ঠা স্বীকৃতিও পেয়েছে। জয়িতা ২০১৯, পাওয়ার উইমেন পদ্মা ব্যাংক ২০২১, এবং দক্ষিণ এশিয়ার ১০০ সেরা নারী উদ্যোক্তা অ্যাওয়ার্ড ২০২২ এর মত পুরস্কার তার কাজের পরিচায়ক।

কানিজ ফাতেমা ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ ব্যবসা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছেন, যেখানে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং গ্রামের নিম্ন আয়ের নারীরা উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মনির্ভর হবেন। তাঁর এই স্বপ্ন ও পরিকল্পনা প্রমাণ করে, সাহসী পদক্ষেপ এবং দৃঢ় মনোবল দিয়ে যে কেউ নতুন সম্ভাবনার পথে এগোতে পারে।

 

বাংলাদেশের প্রথম ‘কার্বন-নিরপেক্ষ’ শিশু রুহাব

দেশের প্রথম ‘কার্বন-নিরপেক্ষ’ শিশু হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার ছোট্ট আয়ান খান রুহাব। মাত্র আট মাস বয়সেই সে হয়ে উঠেছে পরিবেশবান্ধব জীবনের এক অনন্য প্রতীক।
পরিবেশ বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ICCCAD) আনুষ্ঠানিকভাবে এই স্বীকৃতি প্রদান করে।

রুহাবের বাবা ইমরান রাব্বি, পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রীনম্যান–এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং মা আয়শা আক্তার কিরণ সংগঠনটির সমন্বয়ক। সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য একটি ইতিবাচক উদ্যোগ নিতে গিয়ে তারা রোপণ করেছেন ৫৮০টি গাছের চারা—নিজ বাড়ি ও আত্মীয়দের জমিতে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, এই বৃক্ষগুলোই রুহাবের পুরো জীবনের সম্ভাব্য কার্বন নিঃসরণ ভারসাম্য বজায় রাখবে।

আয়শা কিরণ বলেন, “রুহাবের জন্য আমরা যা করেছি, তা শুধু তার জন্য নয়—এই পৃথিবীর ভবিষ্যতের জন্যও। চাই, প্রতিটি বাবা-মা তাদের সন্তানের জন্য কিছু গাছ লাগান।”

আইসিসিসিএডি এর ইয়ুথ অ্যান্ড জেন্ডার বিষয়ক প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর সুমাইয়া বিনতে সেলিম জানান-
“বিশ্ব ব্যাংকের মানদণ্ড থেকে দেখা হয়েছে কোনো দেশের মানুষ বছরে কতটুকু কার্বন নিঃসরণ করে। সেই হিসাব এবং একটি গাছ বছরে কতটুকু কার্বন শোষণ করতে পারে- এই দুটি বিষয় বিবেচনা করে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ধরে রুহাবকে কার্বন-নিরপেক্ষ শিশু হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।”

প্রতিষ্ঠানটির এক সমন্বয়ক বলেন, “এটি কেবল একটি স্বীকৃতি নয়, এটি পৃথিবী বাঁচানোর এক আন্দোলনের প্রতীক। আমরা চাই, ভবিষ্যতে আরও মানুষ এ ধরনের উদ্যোগে অংশ নিক।”

এদিকে, কার্বন-নিরপেক্ষতা বলতে বোঝায় এমন এক ভারসাম্য, যেখানে একজন মানুষ যতটুকু কার্বন বাতাসে ছড়ায়, প্রকৃতির উদ্যোগে বা প্রযুক্তির মাধ্যমে ততটাই কমিয়ে আনা হয়। এতে পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে ভারতের তামিলনাড়ুর দুই বছর বয়সী আদাভি বিশ্বের প্রথম ‘কার্বন-নিরপেক্ষ’ শিশু হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। তার মা-বাবা মেয়ের জীবদ্দশার কার্বন নিঃসরণ ভারসাম্য রাখতে রোপণ করেছিলেন প্রায় ছয় হাজার গাছ।

 

বাংলাদেশে উদ্বেগজনকভাবে কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে।

বাংলাদেশে কন্যাশিশুরা এখনো নানামুখী সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে— এমন তথ্য উঠে এসেছে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি এই প্রতিবেদনে দেখা যায়, কন্যাশিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মাত্রা এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।

শনিবার (৪ অক্টোবর) বিকেল ৩টার পর রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটির তথ্য প্রকাশ করা হয়। জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছে শিশু অধিকার বিষয়ক সংস্থা এডুকো বাংলাদেশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে দেশে ৩৪ জন শিশু অপহরণ ও পাচারের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৮ জন কন্যাশিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও বাকিদের অবস্থান অজানা। একই সময়ে ৮৩ জন কন্যাশিশু খুনের শিকার হয়েছে এবং ৫০ জন কন্যাশিশুর রহস্যজনক মৃত্যু ঘটেছে, যাদের মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যায়নি।

এ ছাড়া, এই সময়ের মধ্যে ৫৪ জন কন্যাশিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে এবং ৩৯০ জন কন্যাশিশু ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, নানা মানসিক ও সামাজিক চাপের কারণে ১০৪টি শিশু আত্মহত্যা করেছে, যা সমাজে কন্যাশিশুর নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্যের চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেটর সৈয়দা আহসানা জামান এ্যানি। তিনি বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের মধ্য দিয়ে নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এমন একটি সমাজ গঠন করতে হবে যেখানে একজন নারী বা কন্যাশিশু কোনো ধরনের সহিংসতার ভয় ছাড়াই ঘর থেকে বের হতে পারবেন এবং নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবেন। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রেও নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সভাপতি ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, আমাদের সমাজে নারী ও কন্যাশিশুর অবস্থার কিছু পরিবর্তন হলেও তা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। বাল্যকাল থেকেই নারীদের প্রতি বঞ্চনা ও বৈষম্যের অবসান ঘটাতে হবে। তাদের শিক্ষা, পুষ্টি ও দক্ষতায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তিনি আরও বলেন, “নারীর অবস্থার পরিবর্তন মানে পুরো জাতির অবস্থার পরিবর্তন।”

সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংসদে নারীদের সরাসরি নির্বাচনের প্রস্তাব নিয়ে পাঁচবার আলোচনা হয়েছে, কিন্তু ১০০ আসনে নারীদের সরাসরি নির্বাচনের বিষয়ে এখনো ঐকমত্য হয়নি। তিনি মন্তব্য করেন, “এই ঘটনায় নারী রাজনৈতিক অধিকার পরাজিত হয়েছে— জয়ী হয়েছে পুরুষতন্ত্র।”

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, আইনি কাঠামোর কার্যকারিতা নিশ্চিতকরণ এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে শিশুবান্ধব পরিবেশ তৈরির বিকল্প নেই। ফোরামের মতে, কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র— তিন পক্ষকেই আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।