চাঁদপুরের এক তরুণী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে, যখন সকলের আশা ছিল স্থিতিশীল চাকরির দিকে এগোনো, তখন তিনি বেছে নিলেন এক ভিন্ন পথ—উদ্যোক্তা হওয়া। আশপাশের মানুষ হয়তো বিস্মিত, কেউ কেউ হয়তো কটাক্ষও করেছিল, কিন্তু কানিজ ফাতেমা নিজস্ব স্বপ্নের পথে অটল থেকেছেন। আজ তিনি শুধু একজন সফল ব্যবসায়ী নন, বরং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করার জন্যও পরিচিত।
কানিজ ফাতেমা প্রিয়া বহু ধরনের ব্যবসায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন—কাপড়, রেস্টুরেন্টসহ একাধিক উদ্যোগে হয়েছেন সফল। তাঁর জীবন সঙ্গী মঞ্জুরুল ইসলাম সুমন একজন চিত্রশিল্পী, এবং তাদের দুই সন্তান রয়েছে।
১৯৯৯ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় পাড়ি দেন কানিজ। এরপর ধাপে ধাপে এগিয়ে চলার গল্প শুরু হয়। ২০০৭ সালে তাঁর ব্যবসা ‘ডিভাস স্টাইল’ যাত্রা শুরু করে। ডিভাস স্টাইল মূলত তৈরি পোশাকের বাজারে—শাড়ি, পাঞ্জাবি, শিশুদের পোশাক, বেডশিট এবং কাপল ড্রেসসহ নিজস্ব ডিজাইনের পোশাক অনলাইন ও অফলাইনে বিক্রি করা হয়। বর্তমানে এখানে ২০ জন কর্মী কাজ করছেন।
তাঁর উদ্যোক্তা জীবন সবসময় সহজ ছিল না। ইঞ্জিনিয়ারিং পেশা ছেড়ে ব্যবসার পথে যাওয়া অনেকেরই পছন্দ হয়নি। কটাক্ষ ও সমালোচনার মধ্যেও কানিজ হার মানেননি। তিনি নিজস্ব দৃঢ় মনোবল নিয়ে বলেন, “সফল হলে সবাই পাশে থাকবে। তাই আমি সবসময় আমার কাজে মনোযোগ দিতাম। জীবন আমার, তাই সেটিকে সুন্দরভাবে গড়তে হবে।” শুরুর দিকে পরিবারের অনীহা থাকলেও এখন মা-বাবা তাঁর সিদ্ধান্তের সঙ্গে গর্বিত।
কানিজের উদ্যোগ শুধু ব্যবসা নয়; তিনি সমাজের জন্যও কাজ করেন। ‘আর্ট অব ডিভা ফাউন্ডেশন’ এর মাধ্যমে তিনি গ্রামে নিম্ন আয়ের নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন। উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে পণ্য সরবরাহ, শীতবস্ত্র বিতরণ, ঈদ উপহার ও এতিমদের খাদ্য সহযোগিতা—সবই এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সম্ভব হচ্ছে।
নারী উদ্যোক্তাদের ঝরে পড়ার মূল কারণ হিসেবে তিনি দেখেছেন পরিবারিক সহযোগিতা ও আর্থিক সমস্যা। তিনি বলেন, “নারী উদ্যোক্তার জন্য প্রথম প্রতিবন্ধকতা আসে পরিবার থেকে। তাই পারিবারিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
কানিজ দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু টিপস দিয়েছেন নারী উদ্যোক্তাদের জন্য:
যেটি নিয়ে উদ্যোগ নিতে চান, তা ভালোভাবে জানুন।
বাজার গবেষণা অপরিহার্য।
যে পণ্যের উপর কাজ করবেন, তার চাহিদা বোঝা জরুরি।
সঠিক কাঁচামাল নির্বাচন করুন।
উদ্যোগে তার শ্রম ও নিষ্ঠা স্বীকৃতিও পেয়েছে। জয়িতা ২০১৯, পাওয়ার উইমেন পদ্মা ব্যাংক ২০২১, এবং দক্ষিণ এশিয়ার ১০০ সেরা নারী উদ্যোক্তা অ্যাওয়ার্ড ২০২২ এর মত পুরস্কার তার কাজের পরিচায়ক।
কানিজ ফাতেমা ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ ব্যবসা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছেন, যেখানে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং গ্রামের নিম্ন আয়ের নারীরা উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মনির্ভর হবেন। তাঁর এই স্বপ্ন ও পরিকল্পনা প্রমাণ করে, সাহসী পদক্ষেপ এবং দৃঢ় মনোবল দিয়ে যে কেউ নতুন সম্ভাবনার পথে এগোতে পারে।




