banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

Monthly Archives: January 2026

 

লুইস গিবসন: বিশ্বের সেরা ফরেনসিক আর্টিস্ট

ডিজিটাল নজরদারি যেখানে আজ তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার, সেই যুগের অনেক আগেই অপরাধ অনুসন্ধানের নির্ভরতা ছিল মানুষের স্মৃতি আর একটি পেন্সিলের ওপর। ঠিক সেই বাস্তবতায় যিনি নিজের শিল্পশক্তিকে ন্যায়বিচারের অস্ত্রে রূপ দিয়েছিলেন, তিনি হলেন লুইস গিবসন। ফরেনসিক স্কেচকে একসময় “সফট সায়েন্স” বলে অবজ্ঞা করা হলেও তাঁর অভূতপূর্ব কাজ প্রমাণ করে দেয়—একটি নিখুঁত স্কেচও অপরাধী শনাক্তে প্রযুক্তির সমতুল্য, কখনো তার থেকেও বেশি শক্তিশালী হতে পারে।

লুইস গিবসন জন্মগ্রহণ করেন টেক্সাসের ডালাসে, ১৯৫০ সালে। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল শিল্পের প্রতি গভীর টান এবং মানুষের মুখ পর্যবেক্ষণের এক আশ্চর্য ক্ষমতা। পরিবারের সদস্যরা লক্ষ্য করতেন, অন্য শিশুদের মতো শুধু আঁকিবুঁকি করার বদলে লুইস মানুষের অভিব্যক্তি, মুখের রেখা ও সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যগুলি অনায়াসে ধরতে পারতেন। তাঁর শিক্ষাজীবনেও আর্ট, সাইকোলজি ও মানব-পর্যবেক্ষণভিত্তিক বিষয়গুলোর প্রতি আগ্রহ ছিল অত্যন্ত দৃঢ়।

জীবনের এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাঁকে ফরেনসিক
আর্টের পথে নিয়ে আসে। তরুণ বয়সে তিনি নির্মম এক হামলার শিকার হন এবং দুর্ভাগ্যবশত সেই অপরাধী কখনো শাস্তি পায়নি। এই অমানবিক অভিজ্ঞতা তাঁকে ভেঙে দেয়নি; বরং তিনি সিদ্ধান্ত নেন নিজের প্রতিভাকে ব্যবহার করবেন অন্য ভিকটিমদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে। ভিকটিম বা সাক্ষীর স্মৃতি থেকে অপরাধীর মুখ পুনর্গঠন করার যে শিল্প, লুইস সেটিকে রূপ দেন পেশাদার দক্ষতায়।

পরবর্তীতে তিনি যোগ দেন হিউস্টন পুলিশ ডিপার্টমেন্টে। সেখানে শুরু হয় তাঁর কিংবদন্তি ক্যারিয়ার। পুলিশের অনুরোধে তাঁকে বিভিন্ন শহরে নিয়ে যাওয়া হতো জটিল মামলার সাক্ষীদের সঙ্গে কাজ করার জন্য। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষকে পর্যবেক্ষণ করে, তাদের স্মৃতি থেকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বৈশিষ্ট্য উদ্ধার করে তিনি তৈরি করতেন অপরাধীর স্কেচ—যার নিখুঁততা দেখে অনেক প্রসিকিউটরই সেগুলোকে প্রায় আসল ছবির মতো বলে বর্ণনা করতেন। চোয়ালের সামান্য বাঁক, কপালের তীব্রতা, চোখের কোণের সংকোচন—এমন ক্ষুদ্র বৈশিষ্ট্যও তিনি অবিশ্বাস্যভাবে বাস্তবসম্মত করে তুলতেন।
তাঁর স্কেচের কারণে বছরের পর বছর অমীমাংসিত থাকা বহু মামলা নতুন করে গতিপথ পায়। নিখোঁজ শিশু, যৌন নিপীড়ন, খুন, ডাকাতি—সব ধরনের মামলাতেই তাঁর স্কেচ ছিল তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো সহায়ক। ফরেনসিক স্কেচ, যাকে একসময় নগণ্য একটি অংশ হিসেবে দেখা হতো, লুইস গিবসনের সাফল্যের কারণে আজ বিশ্বজুড়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে মূল্যবান দক্ষতা হিসেবে স্বীকৃত।

তাঁর কাজের বিশ্ব স্বীকৃতি আসে যখন গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস লুইস গিবসনকে ঘোষণা করে বিশ্বের সবচেয়ে সফল ফরেনসিক আর্টিস্ট। তাঁর স্কেচের সূত্র ধরে শনাক্ত অপরাধীর সংখ্যা ১,৩১৩ জনেরও বেশি—যা কোনো একক শিল্পীর সর্বোচ্চ অর্জন। যদিও পূর্ববর্তী কিছু সংবাদে ১,২৬৬ জন উল্লেখ ছিল, কিন্তু গিনেসের হালনাগাদ সংখ্যা তাঁর অবদানের পরিধিকে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরে।

পেশাগত জীবনের পাশাপাশি লুইস গিবসনের ব্যক্তিগত জীবনও স্থির ও অনুপ্রেরণামূলক। তিনি বিবাহিত এবং দুই সন্তানের জননী। পরিবারের সমর্থনই তাঁকে দীর্ঘ কর্মজীবনে অবিচল রেখেছে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরেনসিক আর্ট পড়িয়েছেন এবং বিশ্বব্যাপী ওয়ার্কশপ ও বক্তৃতার মাধ্যমে নতুন শিল্পীদের প্রস্তুত করেছেন। তাঁর লেখা বই ও প্রশিক্ষণ উপকরণ আজও ফরেনসিক আর্টের শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স।

সবশেষে বলা যায়, লুইস গিবসন শুধু একজন শিল্পী নন—ন্যায়বিচারের সংগ্রামে তিনি এক আলোকবর্তিকা।ব্যক্তিগত বেদনা থেকে শুরু হওয়া যাত্রায় তিনি প্রমাণ করেছেন—শিল্প শুধু সৌন্দর্যের মাধ্যম নয়, এটি সত্য উদ্ঘাটনের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ারও হতে পারে।

 

নারীর ৫ ঘণ্টা কর্মদিবস: সুবিধা, চ্যালেঞ্জ ও অর্থনৈতিক প্রভাব

বাংলাদেশে নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত স্পষ্ট। দেশের লিঙ্গভিত্তিক জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারীকে যদি শ্রমবাজারে পুরোপুরি কাজে যুক্ত করা যায়, তা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য বড় অর্জন হতে পারে।
তবে বাস্তবতা এমন নয় যে প্রতিটি নারী পূর্ণদিনের (৮–৯ ঘণ্টা) কাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম। গর্ভাবস্থা, নবজাতক পরিচর্যা, পরিবারের অন্যান্য দায়িত্ব ইত্যাদি কারণে বহু উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন নারী চাকরি থেকে দূরে সরে যান।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৪ সালে ১৫ বছরের ঊর্ধ্ব বয়সের নারীর লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশন রেট ছিল প্রায় ৪৪.১৫ %, যেখানে মোট শ্রমবাজারে নারীর অংশ প্রায় ৩৬.৯৪ %।
তদুপরি, অধিকাংশ নারী এখনও অ-ফর্মাল সেক্টরে কাজ করছেন; একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, কর্মরত নারীর ৯৬.৬ % অ-ফর্মাল কাজে নিয়োজিত।
এই তথ্যগুলো নির্দেশ করে যে, শুধু নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; তাদের জন্য নিরাপদ, স্থায়ী এবং মর্যাদাপূর্ণ কাজের সুযোগ তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রেক্ষাপটে, “৫ ঘণ্টার কর্মদিবস” অথবা সংক্ষিপ্তকালীন (part‑time) কাজ একটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এই মডেল নারীদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে: পরিবার ও ক্যারিয়ারের ভারসাম্য রক্ষা করা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা ধরে রাখা, এবং যুব ও স্থানীয় কর্মশক্তিকে কাজে লাগানো। উদাহরণস্বরূপ, গর্ভবতী বা সদ্য-মাতা নারী ৫ ঘণ্টার কাজ করলে সন্তান পরিচর্যা ও ক্যারিয়ার দুটোই সহজভাবে চালিয়ে যেতে পারবে।
পাশাপাশি, নতুন কর্মীদের জন্য part‑time অনবোর্ডিং মডেল তাদের দক্ষতা যাচাই ও পরবর্তীতে পূর্ণ‑সময় কাজে উত্তরণের সুযোগ তৈরি করে।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই কর্মঘণ্টা সংক্ষিপ্তকরণ নারীর শ্রমবাজারে অবদান নিশ্চিত করতে সহায়ক। এটি শুধু কর্মজীবনই ধরে রাখে না, বরং জাতীয় উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখে। পারিবারিক দায়িত্ব এবং কর্মসংস্থানের ভারসাম্য মানসিক চাপ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি কমায়।
তবে এটি কার্যকর করতে হলে পার্ট‑টাইম কর্মীদের জন্য প্রোপোরশনাল বেতন, সামাজিক বীমা, পারফরম্যান্স-ভিত্তিক মূল্যায়ন ও ট্রান্সপারেন্ট প্রমোশন সিস্টেম নিশ্চিত করতে হবে।

তবে এই মডেলের বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জও আছে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, গার্মেন্টস ও জরুরি সেবার মতো সেক্টরে শিফট সিস্টেম অপরিবর্তনীয় চাহিদা থাকতে পারে, যা শুধু ৫‑ঘণ্টার মডেল দ্বারা সব সময় পূরণ করা সম্ভব নাও হতে পারে। এছাড়া পার্ট‑টাইম কর্মীদের জন্য বেতন কাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা (যেমন বীমা, পেনশন), পারফরম্যান্স মূল্যায়ন ও প্রমোশনের নিয়মগুলোর পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন। আইনগতভাবে ও নীতিগতভাবেও পরিবর্তন আনা দরকার — পার্ট‑টাইম কর্মীদের জন্য স্বীকৃতি, নিয়োগ প্রক্রিয়া, চুক্তি ধরন এবং সুবিধার কাঠামোতে সংস্কার জরুরি।

এই সমস্যা মোকাবিলায় কিছু প্রাসঙ্গিক সুপারিশ:
১. পাইলট প্রোগ্রাম চালু করা: বিভিন্ন সেক্টরে ৫ ঘণ্টার/পার্ট‑টাইম কর্মদিবসের প্রভাব পরিমাপ।
২. শিফট ও রোটেশন ব্যবস্থা: জরুরি সেবা, স্বাস্থ্য ও গার্মেন্টসে গ্রেডেড শিফট, ওভারল্যাপিং শিডিউল ও জব-শেয়ারিং।
৩. অনবোর্ডিং ও রি-স্কিলিং: নতুন কর্মীদের জন্য part‑time অনবোর্ডিং এবং পারিবারিক বিরতির পর ফিরে আসা নারীদের জন্য অনলাইন/অফলাইন রি-স্কিলিং প্রোগ্রাম।
৪. সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা: প্রোপোরশনাল বেতন, পেনশন ও বীমা কাঠামো।
৫. পারফরম্যান্স মূল্যায়ন ও সচেতনতা: পারফরম্যান্স ভিত্তিক মূল্যায়ন, প্রমোশন এবং HR-এ লিঙ্গ সচেতনতা বৃদ্ধি।

সবকিছু বিচার বিশ্লেষণ করে বলা যায়, ৫ ঘণ্টার কর্মদিবস কেবল নারীর সুবিধার বিষয় নয়, এটি নারীর কর্মজীবন, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা সংরক্ষণ ও অর্থনীতিতে অবদান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি পরিবার ও কর্মের ভারসাম্য বজায় রাখার সুযোগ দেয় এবং সমাজে লিঙ্গ-সমতার বাস্তবায়নে সহায়ক। নীতিনির্ধারক, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই মডেলকে শুধুমাত্র বিকল্প না রেখে সুপ্রতিষ্ঠিত ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের পথ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

 

ফল্ট লাইনের প্লেট খুলে যাচ্ছে: উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ ভূমিকম্পঝুঁকির দিক থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল এলাকায় অবস্থান করছে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬ সালের এক গবেষণা জানিয়েছিল, গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নিচে একটি সুপ্ত ‘মেগাথ্রাস্ট ফল্ট’ রয়েছে, যা এক সময় ৯ মাত্রার মতো শক্তিশালী ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই শঙ্কাকে নতুন করে সামনে এনেছে। কারণ দেশের তিনটি দৈত্যাকৃতির টেকটোনিক প্লেট—ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মা প্লেটের সংযোগস্থলে দীর্ঘদিন ধরে যে চাপ জমছিল, সেটি এখন আটকানো অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে। ভূ-বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, এই প্লেট খুলে যাওয়ার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হলে বাংলাদেশ আরও উচ্চ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

গত ২১-২২নভেম্বর দেশের বিভিন্ন জেলায় চারবার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা জানান, এটি আসন্ন চাপমুক্তির অংশ হতে পারে এবং আগামী এক সপ্তাহে আরও ২০ বার ছোট–বড় কম্পন অনুভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বুয়েটের ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মেহেদি আহমেদ আনসারী বলেন, এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য করার সময় নয়, তবে স্পষ্টত দেখা যাচ্ছে ভূগর্ভে চাপ জমে আছে। যদি কয়েক দিনের মধ্যে ৫.৭ মাত্রার চেয়েও বড় কোনো ভূমিকম্প ঘটে, তাহলে স্বল্পসময়ে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। তাঁর মতে, বিভিন্ন এলাকায় উৎপত্তিস্থলের কথা বলা হলেও সমস্ত কম্পনের উৎস একই-নরসিংদী অঞ্চল।

জাপানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভূমিকম্প গবেষক রুবাইয়াত কবির মনে করেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানই তাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
ভারতীয় প্লেট উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে ধীরে ধীরে ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। এর ফলে পার্শ্ববর্তী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ মারাত্মক ভূমিকম্পের মুখে পড়ছে।
এদিকে নরসিংদীর ঘোড়াশালে মাটিতে দেখা দেওয়া ফাটল পরিদর্শনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের একটি দল নমুনা সংগ্রহ করেছে, যাতে পরীক্ষার মাধ্যমে কম্পনের ধরন ও গভীরতা নির্ণয় করা যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, গত কয়েক দিনের কম্পন হচ্ছে বড় ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা প্লেট এখন খুলে যাচ্ছে। বিশেষভাবে সিলেট থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত প্লেট বাউন্ডারি গত ৮০০ থেকে ১,০০০ বছর ধরে শক্তি সঞ্চয় করে আসছে; যা যেকোনো সময় তীব্র ভূমিকম্পের রূপ নিতে পারে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, সাবডাকশন জোনে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্প সাধারণত ৭.৫ মাত্রার ওপরে হয়ে থাকে এবং সেগুলো ধ্বংসাত্মক হয়।
পৃথিবীর ‘রিং অব ফায়ার’-এ এমন ভূমিকম্প নিয়মিত দেখা যায়। বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলও একই ধরনের সাবডাকশন জোনের ওপর অবস্থিত হওয়ায় উদ্বেগ এখানে অত্যন্ত বেশি।

ইতিহাস বলছে, ১৭৬২ সালে মিয়ানমার-টেকনাফ প্লেট সীমানায় ৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে সেন্টমার্টিন দ্বীপ তিন মিটার উপরে উঠে এসেছিল। ওই কম্পনে বঙ্গোপসাগরে সুনামি সৃষ্টি হয়ে পাঁচশর বেশি মানুষ মারা যায়। ফলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একই অঞ্চলে আবারো শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে, যার পরিণতি ভবিষ্যতে বড় ধরনের ধ্বংস নিয়ে আসতে পারে। তাছাড়া সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, হিমালয়ের নিচে ভারতীয় প্লেট ধীরে ধীরে ভেঙে অভ্যন্তরীণ ম্যান্টল স্তরের দিকে ঢুকে যাচ্ছে। এর ফলে ভূত্বকে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়ে উপমহাদেশজুড়ে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি বহুগুণে বাড়তে পারে।

অন্যদিকে ২১ নভেম্বর সকালে নরসিংদী মাধবদী থেকে উৎপত্তি হওয়া ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প ঢাকায় যে ক্ষতি করেছে, তা রাজধানীর নাজুক অবস্থাই তুলে ধরে। কয়েক সেকেন্ডের কম্পনে ভবনের দেয়াল ফাটল, স্ল্যাব ধস, বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আতঙ্ক, গ্যাস–বিদ্যুৎসংযোগে ত্রুটি দেখা দেয়। শিশুসহ অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়, আহত হয় কয়েক শত মানুষ। রাজউকের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকায় প্রায় ২১ লাখ ভবনের মধ্যে বড় একটি অংশেই বিল্ডিং কোড মানা হয়নি। মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেই যেখানে দৃশ্যমান ক্ষতি হচ্ছে, সেখানে ৭ বা ৮ মাত্রার কম্পন হলে কী ধরনের বিপর্যয় নামবে, তা কল্পনাতেও ভয়ংকর।

ঢাকার আরও একটি সমস্যা হলো এর নরম পলিমাটির গঠন। Basin Effect-এর কারণে কম মাত্রার ভূমিকম্পও ঢাকায় বড় কম্পনের মতো অনুভূত হয়। ফলে একই মাত্রার ভূমিকম্প সিলেট বা নরসিংদীর তুলনায় ঢাকায় বেশি ঝাঁকুনি সৃষ্টি করে। এ কারণেই ৩.৩ বা ৩.৭ মাত্রার আফটারশকও রাজধানীতে ৫ মাত্রার মতো অনুভূত হয়েছে।

যদিও ভূমিকম্পের পর হওয়া ছোট ছোট কম্পনগুলো স্বাভাবিক আফটারশক—যা আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী ধীরে ধীরে কমে আসার কথা—তবুও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য স্পষ্ট: স্বল্পমেয়াদে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি খুব বেশি নয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। কারণ ভূমিকম্প ঠেকানো যায় না; তবে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত করে পুনঃমূল্যায়ন, সরকারি–বেসরকারি পর্যায়ে বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, এবং নাগরিকদের ঘরোয়া নিরাপত্তা–প্রস্তুতি নিশ্চিত করা।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সাম্প্রতিক কম্পনগুলো শুধু বড় বিপর্যয়ের পূর্বাভাসই দিচ্ছেনা, এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক অবস্থান কতটা বিপজ্জনক।
প্লেট টেকটনিকের এই ধীর পরিবর্তন কখন কোন দিকে মোড় নেবে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
তাই এখনই কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়াই হতে পারে সম্ভাব্য বিপর্যয় ঠেকানোর একমাত্র উপায়।

 

কর্মব্যস্ত নারীদের স্বাস্থ্যরক্ষা:জীবনধারা বদলের জরুরি পরামর্শ

আজকের সমাজে নারীরা শুধু ঘর সামলিয়েই থেমে থাকেন না; তারা কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা, ব্যবসা—সবক্ষেত্রেই সমানভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এ কারণে প্রতিদিনের ব্যস্ততার ভিড়ে নিজেদের স্বাস্থ্যের দিকে খুব কম সময় দিতে পারেন। কিন্তু সময়মতো যত্ন না নিলে ছোট ছোট অসুবিধাই পরবর্তীতে বড় রোগে রূপ নিতে পারে। তাই সচেতন জীবনধারা ও নিয়মিত যত্ন কর্মজীবী নারীর সুস্থতার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা নারীদের মধ্যে মেরুদণ্ড, কোমর ও কাঁধের ব্যথা খুবই সাধারণ। একই ভঙ্গিতে লম্বা সময় বসে থাকা, ভারী ব্যাগ ব্যবহার বা ব্যায়ামের অভাব এ ব্যথার প্রধান কারণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, দিনে আট ঘণ্টার বেশি বসে কাজ করা নারীদের একটি বড় অংশ মেরুদণ্ডের ব্যথায় আক্রান্ত হন।
নিয়মিত অল্প বিরতি নেওয়া, সঠিক বসার ভঙ্গি বজায় রাখা এবং স্ট্রেচিং ব্যায়াম করা এই সমস্যার কার্যকর সমাধান।

স্ক্রিন-নির্ভর কাজের আধিক্যের কারণে চোখের ক্লান্তি আরেকটি বড় সমস্যা। কম্পিউটার বা মোবাইল স্ক্রিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে কাজ করলে চোখ লাল হওয়া, মাথাব্যথা বা ঝাপসা দেখার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
এ থেকে রক্ষা পেতে ‘২০–২০–২০ নিয়ম’ অনুসরণ করা কার্যকর; অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট পর ২০ সেকেন্ডের জন্য ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে তাকানো।
পাশাপাশি কাজের জায়গায় পর্যাপ্ত আলো ব্যবহার এবং চোখের নিয়মিত পরীক্ষা জরুরি।

ব্যস্ততার কারণে অনেক নারী সময়মতো খাবার খেতে পারেন না, যা হজমের সমস্যা, ওজন বৃদ্ধি বা হ্রাসসহ নানা জটিলতার সৃষ্টি করে। অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস পাকস্থলির ওপর বাড়তি চাপ ফেলে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
তাই দিনে কয়েকবার অল্প অল্প পরিমাণে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, প্রচুর পানি পান এবং ফল-সবজি, প্রোটিন ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা প্রয়োজন।

কাজের চাপ, ডেডলাইন, পারিবারিক দায়িত্ব—সব মিলিয়ে কর্মজীবী নারীরা নিয়মিত মানসিক চাপের মুখোমুখি হন। দীর্ঘমেয়াদি স্ট্রেস রক্তচাপ বৃদ্ধি, হৃদরোগের ঝুঁকি এবং মানসিক অবসাদ তৈরি করতে পারে।
এজন্য প্রতিদিন কিছুটা সময় নিজেকে দেওয়া,ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত ঘুম মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো বা কোনো শখের কাজ করাও মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়।

অনেক নারীর ক্ষেত্রে ব্যস্ততার কারণে মাসিক চক্রে অনিয়ম দেখা দেয়, যা হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে। স্ট্রেস, ওজন পরিবর্তন বা অনিয়মিত ঘুম এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। নিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম এবং মানসিক প্রশান্তি হরমোন ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য নিয়মিত চিকিৎসক পরামর্শ গ্রহণ করাও অত্যন্ত প্রয়োজন।

ব্যায়ামের অভাব কর্মব্যস্ত নারীদের আরেকটি বড় সমস্যা। দীর্ঘ সময় বসে থাকা হার্টের রোগ, ওজন বৃদ্ধি ও হাড়ের ক্ষয় তৈরি করতে পারে।
প্রতিদিন ৩০–৪৫ মিনিট হাঁটা, যোগব্যায়াম বা হালকা শরীরচর্চা এসব সমস্যা কমিয়ে আনে এবং শরীরকে দ্রুত সক্রিয় রাখে।
একইভাবে পর্যাপ্ত পানি পান না করলে ডিহাইড্রেশন, ত্বকের সমস্যা ও ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। তাই প্রতিদিন অন্তত দুই থেকে তিন লিটার পানি পান করা উচিত।

স্বাস্থ্য সচেতনতা শুধু শারীরিক নয়, মানসিক সুস্থতার জন্যও প্রয়োজন। কর্মজীবী নারীরা দেশের সমাজ ও অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছেন; তাই সুস্থ থাকা তাদের ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি কর্মজীবনেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সঠিক জীবনধারা ছোট সমস্যাকে বড় হওয়ার আগেই নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।

 

রাজনীতির পরিবর্তনে নারীর অংশগ্রহণ: সংকট ও সম্ভাবনা

২০২৪ সালের অগাস্টে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়, তা কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনাই নয়—বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক স্থবিরতা ও সামাজিক জটিলতার ভেতর থেকে উদ্ভূত এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা।
টানা গণ-আন্দোলন, অসন্তোষ ও রাষ্ট্রীয় চাপের এক সংমিশ্রণে ১৫ বছরের পুরনো ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে পড়ে, আর এর পরপরই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের অভিঘাত নারী সমাজে যে বহুমাত্রিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, তা আশার আলো যেমন দেখায়, তেমনি অনিশ্চয়তার ধোঁয়াশাও ঘনীভূত করে।

নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণে এক ধরনের স্বস্তি ফিরে আসে। আগের সরকারের সময় যে ভীতি, হয়রানি ও রাজনৈতিক দমনপীড়ন নারী কর্মীদের সীমাবদ্ধ করে রেখেছিল, তা কিছুটা হলেও সরে গেছে—এ কথা অস্বীকার করা যাবে না। মাঠের রাজনীতি, নাগরিক প্রতিরোধ, মত প্রকাশ—সব জায়গায় নারীর উপস্থিতি নতুন করে দেখা যাচ্ছে। দলীয় নিয়ন্ত্রণ শিথিল হওয়ায় স্বাধীনভাবে সংগঠিত হওয়ার সুযোগও বেড়েছে। কিন্তু এই দৃশ্যমান উন্মুক্ততার ভেতরেও লুকিয়ে আছে গুরুতর বাস্তবতা।

নারীর নিরাপত্তা প্রশ্নটি এই পরিবর্তনের সময় আরও জটিল রূপ নিয়েছে। রাজনৈতিক সংঘর্ষ কমলেও তার অবসান হয়নি, আর যতদিন রাজনৈতিক উত্তেজনা বিদ্যমান থাকবে, ততদিন নারী সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকবে—এটি বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে সুস্পষ্ট। রাজনৈতিক সমাবেশে মহিলা কর্মীদের উপর হামলার ঘটনা এখনও ঘটে; লাঞ্ছনা ও অপমানের চক্র থামেনি।
এর চেয়েও উদ্বেগজনক হলো সাইবার সহিংসতা। নারী সাংবাদিক, নারী রাজনীতিবিদ এবং অধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য প্রচার, ব্ল্যাকমেইলিং, ছবি বিকৃতি, হুমকি—এসব এখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের কণ্ঠরোধ করতে এই ভার্চুয়াল সহিংসতা কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা নারীর রাজনৈতিক উপস্থিতিকে নীরব করে দেওয়ার এক নতুন সংস্কৃতি তৈরি করছে।

নারীর রাজনৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো ভোটার সংখ্যা। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী দেশে নারীর ভোট সংখ্যা ৬ কোটি ২১ লাখেরও বেশি—একটি বিরাট গণশক্তি। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে এই শক্তির প্রতিফলন খুবই দুর্বল। আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকা সত্ত্বেও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীর অংশগ্রহণ ১০ শতাংশেরও কম। এই বৈষম্য প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক শক্তি এখনো প্রান্তিকীকরণ ও দলীয় পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে ওঠে দাঁড়াতে পারেনি।

নারীর ওপর সহিংসতার চিত্রও রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে হাজার হাজার মামলা হয়েছে—এর বড় অংশই যৌন সহিংসতা ও নির্যাতনসংক্রান্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে প্রকৃত সংখ্যা এই পরিসংখ্যানের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি। সামাজিক লজ্জা, বিচার না পাওয়ার ভয়, প্রভাবশালীদের চাপ—নারী এখনও এই তিন বৃত্তের মাঝখানে আটকে আছেন। ফলে আইন থাকা সত্ত্বেও বিচার পাওয়া এখনো অসাধ্য পর্বতের মতো।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর অবদান দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের উন্নয়নের চালিকাশক্তি। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নারীর কর্মসংস্থান ও ব্যবসায়িক অগ্রগতি বাধার মুখে পড়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়া, নতুন চাকরি সৃষ্টি না হওয়া, বাজারের অস্থিতিশীলতা—এসব কারণে নারী উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। যারা ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনা করতেন, তারা নিয়মিত ক্ষতির মুখে পড়ছেন; অনেক কারখানা ও কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকের নিয়োগ কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব নারীর অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকেও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

পরিস্থিতির এই বহুমাত্রিক পরিবর্তন বুঝিয়ে দেয় যে, নারীকে রাজনীতির কেন্দ্র থেকে দূরে রেখে কোনো গণতান্ত্রিক সংস্কার কার্যকর হতে পারে না। রাষ্ট্র এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—একদিকে সম্ভাবনার দরজা খোলা, অন্যদিকে সঙ্কটের ঘনঘটা। এই বাস্তবতায় নারীর নিরাপত্তা, অধিকার এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকে নিশ্চিত করা কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের পূর্বশর্ত।
সরকার, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজের যৌথ উদ্যোগ ছাড়া এই পরিবর্তন সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ যদি সত্যিকারের নতুন রাজনৈতিক যুগে প্রবেশ করতে চায়, তবে নারীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রীয় জায়গায় আনা ছাড়া সামনে এগোনোর কোনো পথ নেই।

 

Conduct Disorder: শিশু-কিশোরের আচরণগত বিপর্যয়

বর্তমান সমাজে শিশু ও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। কিন্তু অনেক সময় এমন কিছু আচরণ আমরা উপেক্ষা করি যা আসলে মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ হতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো Conduct Disorder (CD) এমন এক মানসিক অবস্থা যেখানে শিশু বা কিশোর নিয়মিতভাবে সমাজের গ্রহণযোগ্য নিয়ম ও নৈতিক আচরণ লঙ্ঘন করে, এবং অন্যের অধিকার বা অনুভূতির প্রতি সহানুভূতিহীন হয়ে পড়ে। এটিকে কেবল “দুষ্টুমি” হিসেবে গণ্য না করে, বরং একটি গভীর মানসিক বিকার হিসেবে এড্রেস করা প্রয়োজন যা সময়মতো চিকিৎসা না হলে ব্যক্তিত্ব বিকাশে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে।

Conduct Disorder কী
Conduct Disorder হলো এমন একটি আচরণজনিত মানসিক ব্যাধি, যেখানে শিশু বা কিশোর ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কাজ করে যা সমাজ, পরিবার বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়মবিরুদ্ধ।
সাধারণত এ রোগ ৫ থেকে ১৬ বছর বয়সীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
এটি ধীরে ধীরে শুরু হয়ে সময়ের সঙ্গে আচরণের উপর প্রভাব তৈরী করে আরও জটিল করে তুলে।

বিশেষজ্ঞরা একে “Persistent pattern of violating rules and rights of others” বলে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
অর্থাৎ, বারবার নিয়ম ভাঙা, মিথ্যা বলা, মারধর করা, চুরি করা বা সহিংস আচরণ প্রদর্শন করা—এই সবই Conduct Disorder-এর অন্তর্ভুক্ত।

লক্ষণ ও আচরণগত বৈশিষ্ট্য
Conduct Disorder আক্রান্ত শিশু বা কিশোরের আচরণে কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য দেখা যায়:

১আক্রমণাত্মক আচরণ: অন্যকে মারধর করা, ভয় দেখানো, বা প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা।

২.সম্পত্তিনাশী প্রবণতা: জিনিসপত্র ভাঙা, আগুন লাগানো বা ইচ্ছাকৃত ক্ষতি করা।

৩.প্রতারণা ও মিথ্যাচার: নিয়মিত মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা বা চুরি করা।

৪.নিয়মভঙ্গ ও দায়িত্বহীনতা: স্কুল পালানো, বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া, সামাজিক নিয়ম উপেক্ষা করা।

এ ধরনের আচরণ যদি দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী হয় এবং দৈনন্দিন জীবন বা শিক্ষায় বাধা সৃষ্টি করে, তখন এটি নিশ্চিতভাবে Conduct Disorder হিসেবে বিবেচিত হয়।

সম্ভাব্য কারণ ও প্রভাবক উপাদান
Conduct Disorder-এর উৎস একক নয়; এটি সাধারণত জৈবিক, মানসিক ও সামাজিক কারণের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে।

১.জৈবিক কারণ:
মস্তিষ্কের frontal lobe-এর কার্যকারিতায় সমস্যা থাকলে নিয়ন্ত্রণক্ষমতা কমে যায়, যা impulsive আচরণের জন্ম দেয়।

২.মানসিক কারণ:
শৈশবের অবহেলা, ট্রমা, ভালোবাসার অভাব বা আত্মসম্মানহীনতা শিশুদের মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে।

৩.সামাজিক কারণ:
পারিবারিক ভাঙন, সহিংস পরিবেশ, অনিয়মিত প্যারেন্টিং, বা অপরাধপ্রবণ এলাকার প্রভাবও বড় ভূমিকা রাখে।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
Conduct Disorder চিকিৎসাবিহীন থাকলে শিশুর সামাজিক, শিক্ষাগত ও আবেগীয় বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেকেই কৈশোরে গিয়ে antisocial personality disorder-এ আক্রান্ত হয়, যা অপরাধপ্রবণতার ঝুঁকি বাড়ায়। স্কুলে নিষ্ক্রিয়তা, বন্ধুত্বে সমস্যা, ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা—সবই এর পরিণতি হিসেবে দেখা যায়।

চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা
Conduct Disorder-এর চিকিৎসা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ধৈর্যনির্ভর প্রক্রিয়া, যেখানে পরিবার, শিক্ষক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সমন্বিত ভূমিকা জরুরি।

১.Cognitive Behavioral Therapy (CBT): শিশুর নেতিবাচক চিন্তা ও প্রতিক্রিয়া পরিবর্তনের মাধ্যমে ইতিবাচক আচরণ তৈরি করে।

২.Parent Management Training (PMT): পিতামাতাকে শেখানো হয় কীভাবে শিশুর আচরণকে ধৈর্য ও ইতিবাচকভাবে পরিচালনা করতে হবে।

৩.Family Therapy: পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও যোগাযোগের অভাব দূর করতে সাহায্য করে।

৪.Medication:
কিছু ক্ষেত্রে antidepressant বা mood stabilizer প্রয়োগ করা হয়, বিশেষত যখন ADHD বা depression সহ-অবস্থান করে।

প্রতিরোধ ও সচেতনতা
Conduct Disorder প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো প্রারম্ভিক পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ ও সহানুভূতিশীল আচরণ।

১.শিশুদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া

২.পারিবারিক কোয়ালিটি টাইম বৃদ্ধি করা

৩.সহিংসতা-মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা

৪.স্কুলে মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ সেবা চালু করা

এসব পদক্ষেপ অনেক ক্ষেত্রেই এই ব্যাধি প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

Conduct Disorder এমন এক মানসিক অবস্থা যা উপেক্ষা করলে পরবর্তীতে শিশুর ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
প্রতিটি “অস্বাভাবিক আচরণ”-এর পেছনে কোনো না কোনো ব্যথা বা অভাব লুকিয়ে থাকে—তা বোঝাই হলো প্রথম চিকিৎসা। শিশুদের প্রতি সহানুভূতি, মানসিক যত্ন এবং সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে সমাজকে আরও মানবিক ও নিরাপদ করা সম্ভব।

 

সিজোফ্রেনিয়া :কীভাবে চিনবেন ও সামলাবেন

কখনও কি মনে হয়, সবাই আপনাকে নজরে রাখছে? পরিচিতদের ভালোবাসায়ও সন্দেহ জন্মায়? অথবা কানে ভেসে আসে এমন কিছু শব্দ, যা অন্য কেউ শুনতে পায় না? এগুলো শুধু কল্পনা নয়- হতে পারে এক জটিল মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, সিজোফ্রেনিয়া (Schizophrenia) নামে পরিচিত।

সিজোফ্রেনিয়া এমন এক দীর্ঘমেয়াদি মানসিক অসুখ, যেখানে মানুষের ভাবনা, আচরণ ও বাস্তবতা উপলব্ধি মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়। রোগী বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, নিজের মনে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেন—যেখানে ভয়, বিভ্রান্তি ও একাকিত্ব ঘিরে ধরে। অনেক সময় তারা বিশ্বাস করেন কেউ তাদের ক্ষতি করতে চায়, কিংবা মনে করেন নিজের ভেতরের কণ্ঠ তাদের নির্দেশ দিচ্ছে। ফলে, দৈনন্দিন জীবন, কাজ, সম্পর্ক—সব কিছুই বিঘ্নিত হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষ সিজোফ্রেনিয়ায় ভুগছেন। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও এই রোগ ক্রমবর্ধমান। অনেক সময় দারিদ্র্য, সামাজিক অবহেলা, কিংবা মানসিক অসচেতনতার কারণে রোগীরা চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত থাকেন। সাধারণত কৈশোরের শেষ ভাগ বা প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের শুরুতেই এর উপসর্গ প্রকাশ পায়—যেমন অদ্ভুত চিন্তা, ঘুমের সমস্যা, একাকিত্ব, অতিরিক্ত ভয় বা সন্দেহপ্রবণতা, এবং আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি।

সিজোফ্রেনিয়ার সঠিক কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি, তবে গবেষণায় দেখা গেছে এটি একাধিক উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত একটি জটিল অবস্থা।
প্রধান কারণগুলো হলো:

জিনগত প্রভাব: পরিবারে কারো এই রোগ থাকলে ঝুঁকি বেড়ে যায়।

মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যের গোলযোগ: ডোপামিন ও গ্লুটামেট নামক নিউরোট্রান্সমিটারগুলোর অস্বাভাবিকতা চিন্তা ও আচরণে প্রভাব ফেলে।

গর্ভকালীন বা জন্মকালীন জটিলতা: গর্ভাবস্থায় ভাইরাস সংক্রমণ বা অক্সিজেনের ঘাটতি পরবর্তী জীবনে ঝুঁকি বাড়ায়।

পরিবেশগত ও মানসিক চাপ: মানসিক ট্রমা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা অতিরিক্ত স্ট্রেস।

চিকিৎসার দিক থেকে, সিজোফ্রেনিয়া এখন আর আগের মতো অচিকিৎসাযোগ্য নয়। নিয়মিত চিকিৎসা, কাউন্সেলিং,মানসিক সহানুভূতি এবং সুস্থ পরিবেশে রোগীরা অনেকটাই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
চিকিৎসা সাধারণত তিনটি স্তরে হয় —
ওষুধ (Antipsychotics): মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য ঠিক রাখতে সহায়তা করে।

মনোচিকিৎসা ও কাউন্সেলিং:
রোগীকে নিজের অনুভূতি চিনতে ও বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে।

সামাজিক ও পারিবারিক সহায়তা:
নিরাপদ, সহমর্মিতাপূর্ণ পরিবেশ রোগীর উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

রোগী হঠাৎ করে চিকিৎসা বন্ধ করলে অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে পারে। তাই ওষুধ বন্ধ করা বা পরিবর্তনের আগে অবশ্যই মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। অনেক দেশে এখন community-based rehabilitation program চালু আছে, যেখানে রোগীদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া হয়।

পরিবার এখানে সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি। সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত মানুষদের অনেক সময় ভুল বোঝা হয়—তাদের ‘পাগল’ বলে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়, যা তাদের মানসিক অবস্থাকে আরও খারাপ করে। অথচ ভালোবাসা, ধৈর্য ও বোঝাপড়া—এই তিনটিই রোগীর সুস্থতার প্রধান হাতিয়ার। পরিবার ও বন্ধুদের উচিত রোগীর পাশে থাকা, তার অনুভূতি শোনা, এবং তাকে সমাজে গ্রহণযোগ্যতার অনুভূতি দেওয়া।

সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত কাউকে দেখলে ভয় পাবেন না বা হুট করে তার প্রতি জাজমেন্টাল হয়ে যাবেননা । জেনে রাখুন এটি চিকিৎসাযোগ্য মানসিক অসুখ মাত্র।

 

গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা

দেশের শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গাতেই নারীরা আজ কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা ও জীবনের প্রয়োজনে নিয়মিতভাবে গণপরিবহন ব্যবহার করছেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই চলাচল অনেক সময় তাদের জন্য হয়ে ওঠে ভয়, অপমান ও অস্বস্তির কারণ।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও ইউএন উইমেনের সাম্প্রতিক এক জরিপে প্রকাশিত হয়, বাংলাদেশের প্রায় ৮৭ শতাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে গণপরিবহনে হয়রানির শিকার হন, আর তাদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি নয়, বরং একটি সামাজিক সংকটের প্রতিফলন—যেখানে নিরাপদ চলাচলের মৌলিক অধিকার প্রতিনিয়ত লঙ্ঘিত হচ্ছে।

নারীদের গণপরিবহনে হয়রানির ঘটনা ঘটলে প্রথম করণীয় হলো নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এমন পরিস্থিতিতে ভয় বা লজ্জায় চুপ না থেকে বরং সরব প্রতিবাদ জানানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আশপাশের মানুষকে অবহিত করা, জোরে চিৎকার করে জানানো কী ঘটছে, এবং প্রয়োজনে চালক, কন্ডাক্টর বা নিকটস্থ যাত্রীদের সহায়তা নেয়া। সম্ভব হলে মোবাইল ফোনে ঘটনার ছবি, ভিডিও বা অডিও রেকর্ড করে রাখা। কোনো প্রত্যক্ষদর্শী থাকলে তার নাম ও ফোন নম্বর নোট করা, কারণ এই তথ্যগুলো পরবর্তীতে আইনি প্রমাণ হিসেবে অমূল্য ভূমিকা রাখে।

আইনের দৃষ্টিতে গণপরিবহনে শারীরিক বা মৌখিক হয়রানি কোনো সাধারণ অসভ্যতা নয়, এটি একটি শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ধারা ৩৫৪ অনুযায়ী, কোনো নারীকে আক্রমণ করা, জোর করে স্পর্শ করা, বা তার শালীনতা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে বলপ্রয়োগ করা হলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। একইভাবে, ধারা ৫০৯ অনুসারে কোনো নারীকে অপমান বা শ্লীলতাহানি করার উদ্দেশ্যে শব্দ, অঙ্গভঙ্গি বা আচরণ করাও আইনের আওতায় দণ্ডনীয়। তদুপরি, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০—এর অধীনেও এসব অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।

এ ধরনের ঘটনার শিকার হলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় জেনারেল ডায়েরি (জিডি) করা উচিত। যদি ঘটনাটি গুরুতর হয়—যেমন শারীরিক আক্রমণ বা যৌন সহিংসতা—তবে এফআইআর দায়ের করতে হবে। এখন অনলাইনেও জিডি করার সুযোগ রয়েছে, যা প্রাথমিকভাবে অভিযোগ নথিভুক্ত করতে সহায়তা করে। পুলিশের পাশাপাশি কোনো আইনজীবী বা নারী সহায়তা কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত ও কার্যকর হয়। ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত ভিডিও, ছবি, অডিও বা মেডিকেল রিপোর্ট সবসময় সংরক্ষণ করে রাখা উচিত, কারণ এসব প্রমাণ তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মৌখিক কটূক্তি বা হেনস্তার মতো ঘটনাও ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কেউ যদি গণপরিবহনে অশালীন কথা বলে বা কটূক্তি করে, সঙ্গে সঙ্গে দৃঢ়ভাবে প্রতিবাদ জানান। অনেক সময় ভুক্তভোগীরা লজ্জা বা ভয়ের কারণে চুপ থাকেন, কিন্তু নীরবতা অপরাধীকে সাহসী করে তোলে। সমাজে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি, যাতে প্রত্যক্ষদর্শীরা ঘটনাস্থলে প্রতিক্রিয়া জানান ও অপরাধীকে সামাজিকভাবে নিরুৎসাহিত করেন।

হয়রানির শিকার ব্যক্তির জন্য একটি মানসিক আঘাত। তাই এমন ঘটনার পর পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীর সহযোগিতা নেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে স্থানীয় নারী সহায়তা কেন্দ্র, ন্যাশনাল হেল্পলাইন ১০৯, কিংবা কোনো এনজিওর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু আইনগত পরামর্শই নয়, মানসিক সহায়তাও প্রদান করে।

তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সামাজিক মনোভাবের পরিবর্তন।
দেখা যায় এহেন পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীকে বারংবার দোষারোপ বা হেয় করা হচ্ছে।
এসমস্ত ভিক্টিম ব্লেইমিং সংস্কৃতি থেকে সরে এসে ভুক্তভোগীর প্রতি
সহায়তাও সহানুভূতি প্রদর্শনের মাধ্যমে তার পাশে দাঁড়ানোই সভ্য সমাজের পরিচায়ক।
গণপরিবহনে হয়রানি কেবল নারীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, এটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন। তাই পরিবর্তনের দায়িত্ব—নাগরিক হিসেবে, যাত্রী হিসেবে, মানুষ হিসেবে আমাদের সবারই।

জীবিকার তাগিদে, শিক্ষার প্রয়োজনে কিংবা পারিবারিক দায়িত্বে প্রতিদিন লাখো নারী ঘর থেকে বের হন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা হলেও, সচেতন প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্বও কম নয়।তাই আর নীরবতা নয়, প্রতিবাদই পারে অন্যায়ের দেয়াল ভেঙে দিতে।

 

গোলটেবিল বৈঠক: নতুন বাংলাদেশে শাসক নয়, সেবক চাই

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে গত ১৮ অক্টোবর শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় অনুষ্ঠিত হলো এক ব্যতিক্রমধর্মী গোলটেবিল বৈঠক—প্রতিপাদ্য ছিল “নতুন বাংলাদেশের নেতৃত্বে শাসক নয়, সেবক চাই।” নারী নেতৃত্বভিত্তিক সংগঠন ‘সম্মিলিত নারী প্রয়াস’ আয়োজিত এই আলোচনায় অংশ নেন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা।

বক্তারা বলেন, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও দলীয় আনুগত্য নয়, বরং জনগণের কল্যাণে নিবেদিত সেবামুখী নেতৃত্বই পারে নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি মজবুত করতে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শেহরিন আমিন মোনামি বলেন, রাজনৈতিক স্বার্থে সমাজকে শ্রেণী ও মানসিকতায় বিভক্ত করা হয়েছে—গ্রাম-শহর, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, এমনকি রাজনৈতিক অবস্থানভেদেও। এই বিভাজনই শোষণের সুযোগ তৈরি করেছে। তার মতে, নারীর প্রতিনিধিত্ব কেবল মুখের বুলি নয়, বাস্তব কাজের মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়া উচিত। ভবিষ্যতের নেতৃত্বকে পরিচয়ের রাজনীতি নয়, কাজের নৈতিকতা ও দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে।

বুয়েটের এমএমই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তাকিয়া আনা ফখরুল বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ধর্মভিত্তিক বিদ্বেষ বা ইসলামফোবিয়া গভীর আকার ধারণ করেছিল। নতুন সরকারের পক্ষে তা একদিনে দূর করা সম্ভব নয়, তবে উদ্যোগ নিতে হবে সচেতনতার সঙ্গে। তিনি বলেন, নেতৃত্বে থাকতে হবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ভবিষ্যৎ ভাবনায় দক্ষতা—যে নেতা কেবল ক্ষমতায় নয়, পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করবেন।

ঢাবির জিনপ্রকৌশল ও জিনপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, প্রকৃত শাসক সে-ই, যিনি ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার নয়, বরং ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, দুর্নীতিমুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বই পারে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে।

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন বলেন, অতীতে যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন ছিল তুলনামূলক সহজ, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্নীতি, ভোট কেনাবেচা ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এই প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তিনি বলেন, জনগণের সচেতনতা ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থাই নেতৃত্ব নির্বাচনে গুণগত পরিবর্তন আনতে পারে।

তার মতে, ভবিষ্যতের শাসককে হতে হবে দ্বৈতধর্মী—একদিকে জনগণের সেবক, অন্যদিকে অপরাধ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর। এজন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, জবাবদিহিতা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি।

বৈঠকের সারসংক্ষেপে বক্তারা একমত হন যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এখন ‘শাসক মানসিকতা’ নয়, ‘সেবক মানসিকতা’ প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি। নৈতিকতা, দায়বদ্ধতা ও জনগণের প্রতি দায়বোধ—এই তিন মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠতে হবে নতুন নেতৃত্ব।

 

নারীর অদৃশ্য পরিশ্রমের দৃশ্যমান বাস্তবতা

বিশ্বজুড়ে নারী ও পুরুষের কাজের সময় নিয়ে আলোচনাটা আজ আর নতুন নয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত বছর পেরিয়ে গেলেও নারীর কাজের ঘন্টা—বিশেষ করে অবৈতনিক কাজের সময়—এখনো অর্থনীতির মূলধারায় যথাযথভাবে গণনা করা হয় না। এই পার্থক্য আইন বা নীতির কারণে তৈরি হয়নি, বরং এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা সামাজিক ধারণা, পারিবারিক ভূমিকা এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর ফল।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পরিসংখ্যান দেখায়, বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে নারীরা পুরুষের তুলনায় গড়ে কম সময় বেতনভুক্ত কাজে ব্যয় করেন। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁরা ঘরোয়া ও যত্নমূলক কাজে পুরুষের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি সময় দেন। অর্থাৎ, কাজের ঘন্টার হিসাবে নারীরা কখনোই কম পরিশ্রম করছেন না; বরং তাঁদের পরিশ্রমের বড় অংশটাই থেকে যাচ্ছে “অদৃশ্য”।

অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (OECD) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উন্নত দেশগুলোতেও কর্মঘণ্টায় লিঙ্গভেদ স্পষ্ট। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে প্রায় ২৮ শতাংশ নারী খণ্ডকালীন কাজে যুক্ত, যেখানে পুরুষের হার মাত্র ৮ শতাংশ। অর্থাৎ, নারীরা প্রায় চারগুণ বেশি হারে কম সময়ের চাকরি বেছে নিচ্ছেন।
তবে এই পার্থক্য কোনো আইনি বাধ্যবাধকতার ফল নয়। বরং সমাজের প্রচলিত রীতিনীতিই নারীদের এমন পেশা বেছে নিতে বাধ্য করে যেখানে সময়ের নমনীয়তা থাকে, যাতে তারা গৃহস্থালি, সন্তান লালন-পালন কিংবা বয়স্কদের যত্নের কাজ সামলাতে পারেন। ফলে নারীর কাজের ঘন্টা সংখ্যা হিসেবে কম মনে হলেও, বাস্তবে তা একেবারেই সঠিক চিত্র নয়।

উদাহরণস্বরূপ, ফ্রান্স, ডেনমার্ক ও নরওয়ের মতো দেশে পুরুষ ও নারী উভয়ের সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা প্রায় ৩৫ থেকে ৩৯ ঘণ্টা। কিন্তু নেদারল্যান্ডস ও সুইজারল্যান্ডে অনেক নারী সপ্তাহে ৩০ ঘণ্টার কম কাজ করেন। যুক্তরাষ্ট্রে নারীরা গড়ে প্রতিদিন ৭.৯ ঘণ্টা কাজ করেন, যেখানে পুরুষদের জন্য এই সময় ৮.৪ ঘণ্টা। পার্থক্যটা অল্প মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতা— পরিবার, সন্তানের দায়িত্ব ও গৃহস্থালি কাজের চাপ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো, নারীরা বৈতনিক কাজের বাইরে যে বিপুল সময় দেন ঘরোয়া কাজে, তা কোনো অর্থমূল্যে ধরা হয় না। ২০২৪ সালে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের (ILO) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭৪৮ মিলিয়ন মানুষ পরিচর্যা ও যত্নের কাজের কারণে শ্রমবাজারের বাইরে রয়েছেন— তাদের মধ্যে ৭০৮ মিলিয়নই নারী।
প্রতিবেদনটি আরও জানায়, নারীরা প্রতিদিন পুরুষদের তুলনায় গড়ে আড়াই গুণ বেশি সময় ব্যয় করেন রান্না, ঘর পরিষ্কার, শিশু ও বয়স্কদের যত্নের মতো কাজগুলোতে। অথচ এই কাজগুলোই পরিবার ও সমাজকে সচল রাখে। যদি এই সময়কে বৈতনিক কাজের সঙ্গে যোগ করা হয়, তবে দেখা যায়— নারীর মোট কর্মঘণ্টা পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু সমস্যা হলো, এই পরিশ্রমের কোনো বেতন নেই, কোনো ছুটি নেই, এমনকি অনেক সময় কোনো স্বীকৃতিও নেই।

বহু সমাজে এখনো গৃহস্থালি কাজকে নারীর “প্রাকৃতিক দায়িত্ব” হিসেবে দেখা হয়। এমন ধারণার কারণে অনেক নারী চাকরির ক্ষেত্রে নমনীয় সময়সূচি বেছে নিতে বাধ্য হন, অথবা পুরোপুরি কর্মক্ষেত্র থেকে সরে দাঁড়ান। ফলে অর্থনৈতিকভাবে তাঁরা পিছিয়ে পড়েন, কিন্তু গৃহস্থালি দায়িত্বের ভার হালকা হয় না।
যেসব দেশে পরিবার ও রাষ্ট্র মিলে শিশুসেবা বা বয়স্কদের যত্ন ভাগাভাগি করে নেয়, যেমন— স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো, সেখানে নারী-পুরুষ উভয়েরই কর্মঘণ্টা তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়া বা আফ্রিকার অনেক দেশে সামাজিক কাঠামো ও নীতিগত সহায়তার অভাবে নারীরা এখনো দ্বিগুণ পরিশ্রম করেন— একদিকে ঘর, অন্যদিকে কর্মক্ষেত্র।

নারীরা প্রতিদিন যে সময় ব্যয় করেন রান্না, কাপড় ধোয়া, সন্তান বা বৃদ্ধদের যত্নে— সেগুলো সমাজের চোখে “কাজ” নয়, কারণ তার কোনো বাজারমূল্য নেই। অথচ এই কাজগুলো ছাড়া কোনো সমাজই টিকতে পারে না। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যদি গৃহস্থালি কাজের আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়, তবে তা অনেক দেশের জিডিপির বড় অংশ হয়ে দাঁড়াবে।

নারী আজ অফিসে কাজ করছেন, সংসারও সামলাচ্ছেন— কিন্তু তাঁর এই অবদান দুই ভাগে বিভক্ত। এক ভাগের দাম আছে, আরেক ভাগের নেই। অথচ দুটি অংশই সমাজের চালিকাশক্তি। তাই এখন সময় এসেছে এই অদৃশ্য শ্রমকে দৃশ্যমান স্বীকৃতি দেওয়ার।
নারীর বৈতনিক ও অবৈতনিক—দুই ধরনের কাজই সমান মর্যাদা ও গুরুত্বের দাবিদার।
সুতরাং, বৈষম্যের মূল উৎস দূর করতে হলে শুধু চাকরির সুযোগ নয়, ঘরের ভেতরের দায়িত্ব ভাগাভাগিও জরুরি। নারী ও পুরুষ উভয়েই যদি সমঝোতা ও ইনসাফের ভিত্তিতে ঘর ও বাইরের দায়িত্ব বহন করেন, তবেই সমাজে প্রকৃত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে।

 

ডিপফেইকে ছবি বিকৃতি,মামলা করলেন ঢাবি শিক্ষিকা মোনামি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা শেহরীন আমিন ভূঁইয়া মোনামি তার ছবি বিকৃত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের অভিযোগে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করেছেন। সোমবার (৩ নভেম্বর) সকালে তিনি নিজেই শাহবাগ থানায় উপস্থিত হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।

মামলায় চারজনকে নামীয় আসামি করা হয়েছে এবং আরও কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে, যারা বিকৃত ছবি শেয়ার বা অশালীন মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

১ নম্বর আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্ট মুজতবা খন্দকারকে। ২ নম্বর আসামি মহিউদ্দিন মোহাম্মদ, ৩ নম্বর আসামি ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী নিরব হোসাইন, এবং ৪ নম্বর আসামি আশফাক হোসাইন ইভান। মামলাটি দায়েরের পর তা অধিকতর তদন্তের জন্য গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)র সাইবার ইউনিটে পাঠানো হয়েছে।

মামলার সময় উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে সালমা এবং মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম ঝুমা, ডাকসুর আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক মো. জাকারিয়া ।
ডাকসুর আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক মো. জাকারিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি লেখেন, “শেহরীন আমিন ভূঁইয়া ম্যাম তার ছবি এডিট করে ফেসবুকে পোস্ট করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মামলা করেছেন। আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক হিসেবে আমি সার্বিক সহায়তা করেছি।”

জাকারিয়া আরও জানান, ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের সাইবার হয়রানির শিকার হলে ডিবির সাইবার ইউনিট দ্রুত ব্যবস্থা নেবে বলে আশ্বাস দিয়েছে। তিনি বলেন, “যারা বিকৃত ছবি পোস্ট করেছেন, অশালীন মন্তব্য করেছেন বা শেয়ার দিয়েছেন, সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে ইনশাআল্লাহ।”

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে দোষীদের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনের কঠোর ধারায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খালিদ মনসুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকা সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করেছেন। আমরা মামলাটি গ্রহণ করে তদন্তের জন্য পাঠিয়েছি।”

এদিকে, ফ্যাক্টচেকিং সংস্থা বুম বাংলাদেশ যাচাই করে জানিয়েছে, সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ছবিগুলো বাস্তব নয়; বরং এআই (Artificial Intelligence) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি। তাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ছবিগুলো গুগলের জেনারেটিভ টুল “Gemini” দিয়ে তৈরি এবং এতে SynthID নামে ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক পাওয়া গেছে—যা শুধুমাত্র এআই-তৈরি কনটেন্টে যুক্ত থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা কেবল একটি ব্যক্তিগত হয়রানির বিষয় নয়; বরং এটি বাংলাদেশে ডিপফেইক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নারীদের হেনস্তা, চরিত্র হনন ও সামাজিকভাবে অপমান করার এক ভয়াবহ প্রবণতাকে স্পষ্ট করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, এআই-নির্ভর টুল ব্যবহার করে নারীদের ছবি বিকৃত বা কল্পিত “অশালীন” দৃশ্য তৈরি করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে—যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত।

সার্বিকভাবে, শেহরীন আমিন ভূঁইয়া মোনামির মামলা শুধু এক শিক্ষকের ন্যায়বিচারের আবেদন নয়; এটি ডিপফেইক ও এআই-নির্ভর নারীবিরোধী অনলাইন সহিংসতার বিরুদ্ধে এক সতর্ক বার্তা, যা ভবিষ্যতে নীতিনির্ধারক ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার জন্য নতুন দিক উন্মোচন করতে পারে।

 

ফ্রিতে ২ লাখ টাকার আইটি কোর্স, কোর্স শেষে চাকরির নিশ্চয়তা

দেশের তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক-বাংলাদেশ ইসলামিক সলিডারিটি এডুকেশন ওয়াক্ফ (আইডিবি-বিআইএসইডব্লিউ) আবারও তাদের ৭০তম আইটি স্কলারশিপ প্রোগ্রামের জন্য আবেদন গ্রহণ শুরু করেছে।

এই প্রোগ্রামের আওতায় নন-আইটি ব্যাকগ্রাউন্ডের স্নাতক বা সমমানের শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে সাড়ে আট মাসের আইটি প্রশিক্ষণ নিতে পারবেন। পুরো কোর্সটির মূল্য প্রায় ২ লাখ টাকা, তবে এটি সম্পূর্ণ ফ্রি স্কলারশিপে করানো হবে।

কোর্স শেষে সফল শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে দেশ-বিদেশে চাকরির সুযোগ। ইতিমধ্যে এ প্রোগ্রামের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত ৯২% শিক্ষার্থী সফলভাবে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
আইডিবি-বিআইএসইডব্লিউ এখন পর্যন্ত ১৭,০০০+ আইটি প্রফেশনাল তৈরি করেছে, যারা কাজ করছেন বিশ্বের ৩,২০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানে।

প্রোগ্রামটির অধীনে বর্তমানে ১৩টি আইটি কোর্সে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এগুলো সাজানো হয়েছে আধুনিক চাকরির বাজারের প্রয়োজন অনুযায়ী, যাতে কোর্স শেষে শিক্ষার্থীরা সরাসরি পেশাজীবনে প্রবেশ করতে পারেন।

প্রার্থীকে স্নাতক, ফাজিল, মাস্টার্স, কামিল পাস বা অধ্যয়নরত হতে হবে।
এছাড়া চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং (কম্পিউটার, টেলিকমিউনিকেশন, ইলেকট্রনিকস, সিভিল, আর্কিটেকচার, সার্ভে বা কনস্ট্রাকশন) পাসরাও আবেদন করতে পারবেন।
বয়স হতে হবে সর্বোচ্চ ৩০ বছর।
তবে, আগের কোনো রাউন্ডে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীরা নতুন করে আবেদন করতে পারবেন না।

ভর্তি পরীক্ষা ও প্রক্রিয়া
লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা ঢাকা ও চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হবে।
লিখিত পরীক্ষায় গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে এমসিকিউ পদ্ধতিতে প্রশ্ন থাকবে।
প্রতি রাউন্ডে মোট ১৬৫টি আসন নির্ধারিত রয়েছে।
ডিপ্লোমাধারী প্রার্থীদের জন্য কোর্সগুলো শুধু ঢাকায় পরিচালিত হবে।

আবেদনের শেষ সময়: ১৫ নভেম্বর ২০২৫
বিস্তারিত জানতে ও আবেদন করতে ভিজিট করুন:
https://apply.isdb-bisew.info/

 

ভিলেজ ইমপাওয়ারমেন্ট: শীর্ষ ৫০ নারী নেত্রীর তালিকায় শিফা

বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এক গর্বের সংবাদ—জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাবিতা বিনতে আজাদ শিফা স্থান করে নিয়েছেন রাশিয়ার পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন ‘রোসাটম’-এর অধীন প্রতিষ্ঠান ‘অবনিন্সক টেক একাডেমি’ কর্তৃক নির্বাচিত বিশ্বের শীর্ষ ৫০ নারী নেত্রীর তালিকায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শত শত আবেদনকারীর মধ্য থেকে কঠোর বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন। তার পূর্ববর্তী কর্ম-অভিজ্ঞতা, গবেষণাকর্ম এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম এই সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

শিফার জীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সমাজসেবার প্রতি গভীর ভালোবাসা, যা তিনি শিখেছেন বাবা-মায়ের কাছ থেকে। ছোটবেলা থেকেই তিনি দেখেছেন, মানুষের উপকারে আসাটাই জীবনের প্রকৃত অর্থ। সমাজকর্ম বিভাগে ভর্তি হয়ে তিনি বুঝতে পারেন—সমাজকর্মের শিক্ষার্থীরা যদি ডায়নামিক হতে পারে, তাদের সামনে অফুরন্ত সম্ভাবনা অপেক্ষা করছে। এই বিশ্বাসকে ধারণ করেই পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি নিজেকে যুক্ত করেন নানা স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডে। তার এই অদম্য প্রচেষ্টা তাকে আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড ভিশন ইন্টারন্যাশনাল’-এর রোহিঙ্গা ক্রাইসিস রেসপন্স প্রকল্পে লিড প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবে কাজ করার সুযোগ এনে দেয়।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করতে গিয়ে শিফা উপলব্ধি করেন—বাংলাদেশের অনেক তরুণ মেধাবী হলেও সঠিকভাবে নিজেদের প্রকাশ করতে না পারার কারণে পিছিয়ে পড়ে। ঢাকা শহরে পড়াশোনার সময় তিনি দেখেছেন, যোগাযোগ দক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাবে অনেক শিক্ষার্থী তাদের যোগ্যতার যথাযথ স্বীকৃতি পায় না। এই সমস্যার সমাধান নিয়েই জন্ম নেয় তার উদ্যোগ ‘ভিলেজ ইমপাওয়ারমেন্ট’। তরুণদের যোগাযোগ দক্ষতা ও সফট স্কিল উন্নয়নের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
শিফার স্বপ্ন, ২০২৭ সালের মধ্যে এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে অন্তত এক লাখ শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলা। তার বিশ্বাস, একজন মানুষ যদি নিজের সফট স্কিল গুণাবলিগুলো উন্নত করতে পারে, তবে সে নিজের জীবনের পথ নিজেই তৈরি করে নিতে সক্ষম হবে।

শিফার সাফল্যের পেছনে তার পরিবারের অবদান অপরিসীম। বাবা ইঞ্জিনিয়ার আবুল কালাম আজাদ এবং মা সোহরাত বেগম ছিলেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা। সততা, নিষ্ঠা, নীতিনিষ্ঠা এবং পরিশ্রমের যে শিক্ষা তিনি তাদের কাছ থেকে পেয়েছেন, সেটিই তাকে জীবনের প্রতিটি বাঁকে শক্তি জুগিয়েছে। বাবা-মায়ের নিঃস্বার্থ ত্যাগ ও ভালোবাসাই তার এগিয়ে চলার সবচেয়ে দৃঢ় ভিত্তি।

রাশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার অভিজ্ঞতা শিফার জীবনে এনেছে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিয়ে তিনি দেখেছেন—পৃথিবীতে অনেক ভালো মানুষ রয়েছেন, যারা একে অপরের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে সম্মান করেন। শিফা বলেন, “দেশের বাইরে আমি মানেই বাংলাদেশ। আমাকে দেখে অনেকেই বাংলাদেশকে চিনেছে। এই অভিজ্ঞতা আমাকে আরও দায়িত্বশীল করে তুলেছে।” তার এই বক্তব্যে ফুটে ওঠে দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধ।
যারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তাদের জন্য শিফার বার্তা অত্যন্ত প্রেরণাদায়ক।
তার মতে, নারীদের জন্য আজকের যুগে সুযোগের দ্বার অনেক উন্মুক্ত। ঘরে বসেই ইংরেজি শেখা, নতুন ভাষা বা কোডিং শেখার মতো দক্ষতা অর্জন এখন অনেক সহজ। তিনি বলেন, “আপনাকে আপনার লক্ষ্য জানতে হবে। যদি আপনার লক্ষ্য বড় হয়, তবে ছোট ছোট বাধা খুব সহজেই পেরিয়ে যাওয়া যায়।”

শিফার এই সাফল্য প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর পরিশ্রম এবং পারিবারিক মূল্যবোধের সমন্বয় থাকলে যেকোনো স্বপ্নই পূরণ করা সম্ভব। ‘ভিলেজ ইমপাওয়ারমেন্ট’-এর মাধ্যমে তিনি যে পরিবর্তনের বীজ বপন করেছেন, তা একদিন আত্মবিশ্বাসী ও দক্ষ তরুণ প্রজন্মে রূপ নেবে—যারা নিজের জীবন বদলে দিতে পারবে, আর সেইসঙ্গে বদলে দেবে পুরো সমাজকেও।

 

জকসু নির্বাচনে লড়বেন ১৫ মাসের কারাবন্দী সেই খাদিজা

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) বহুল আলোচিত শিক্ষার্থী খাদিজাতুল কুবরা আসন্ন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (জকসু) নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
আওয়ামী দুঃশাসনের সময় প্রায় ১৫ মাস কারাভোগ করা এই শিক্ষার্থী বলেন, “আমি জকসু নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে কোন প্যানেল বা পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। খুব শিগগিরই জানাব।”

সম্প্রতি এক গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে নিজের ইচ্ছা ও লক্ষ্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানান খাদিজা। তিনি বলেন, “প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকেন্ড ক্যাম্পাসের কাজ দ্রুত শেষ করার বিষয়ে কাজ করব। শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসন, ক্যান্টিন ও ছাত্রী হলে খাবারের মান উন্নয়ন, এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা—এসব বিষয় থাকবে আমার অগ্রাধিকারে।”

শিক্ষার্থীদের আর্থিক স্বাধীনতার বিষয়েও পরিকল্পনা জানিয়ে খাদিজা বলেন, “অনেক শিক্ষার্থী টিউশন করাতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হন। আমি চাই, তারা যেন আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে স্বনির্ভর হতে পারেন। পাশাপাশি প্রাইভেট হাসপাতালে জবি শিক্ষার্থীরা যাতে স্বল্প খরচে চিকিৎসাসেবা নিতে পারেন, সেজন্যও ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছি।”

নিজের কারাবাসের অভিজ্ঞতার কথা টেনে খাদিজা বলেন, “আমার মতো যেন আর কোনো শিক্ষার্থী বিনা বিচারে জেল না খাটে—এটাই আমার অন্যতম অঙ্গীকার। সর্বোপরি আমি শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করতে চাই।”

খাদিজাতুল কুবরা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৯–২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। ২০২০ সালের অক্টোবরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্য প্রচার এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে কলাবাগান ও নিউমার্কেট থানায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়। সে সময় তিনি অবসরপ্রাপ্ত মেজর দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে এ মামলায় গ্রেপ্তার হন এবং প্রায় ১৫ মাস কারাভোগ করেন।

বর্তমানে মুক্ত জীবনেই নতুন পথচলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন খাদিজা—এবার ছাত্র রাজনীতির ময়দান হোক শিক্ষার্থীদের অধিকার ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের।

 

ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে স্বপ্নপথে কানিজ ফাতেমা

চাঁদপুরের এক তরুণী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে, যখন সকলের আশা ছিল স্থিতিশীল চাকরির দিকে এগোনো, তখন তিনি বেছে নিলেন এক ভিন্ন পথ—উদ্যোক্তা হওয়া। আশপাশের মানুষ হয়তো বিস্মিত, কেউ কেউ হয়তো কটাক্ষও করেছিল, কিন্তু কানিজ ফাতেমা নিজস্ব স্বপ্নের পথে অটল থেকেছেন। আজ তিনি শুধু একজন সফল ব্যবসায়ী নন, বরং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করার জন্যও পরিচিত।

কানিজ ফাতেমা প্রিয়া বহু ধরনের ব্যবসায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন—কাপড়, রেস্টুরেন্টসহ একাধিক উদ্যোগে হয়েছেন সফল। তাঁর জীবন সঙ্গী মঞ্জুরুল ইসলাম সুমন একজন চিত্রশিল্পী, এবং তাদের দুই সন্তান রয়েছে।

১৯৯৯ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় পাড়ি দেন কানিজ। এরপর ধাপে ধাপে এগিয়ে চলার গল্প শুরু হয়। ২০০৭ সালে তাঁর ব্যবসা ‘ডিভাস স্টাইল’ যাত্রা শুরু করে। ডিভাস স্টাইল মূলত তৈরি পোশাকের বাজারে—শাড়ি, পাঞ্জাবি, শিশুদের পোশাক, বেডশিট এবং কাপল ড্রেসসহ নিজস্ব ডিজাইনের পোশাক অনলাইন ও অফলাইনে বিক্রি করা হয়। বর্তমানে এখানে ২০ জন কর্মী কাজ করছেন।

তাঁর উদ্যোক্তা জীবন সবসময় সহজ ছিল না। ইঞ্জিনিয়ারিং পেশা ছেড়ে ব্যবসার পথে যাওয়া অনেকেরই পছন্দ হয়নি। কটাক্ষ ও সমালোচনার মধ্যেও কানিজ হার মানেননি। তিনি নিজস্ব দৃঢ় মনোবল নিয়ে বলেন, “সফল হলে সবাই পাশে থাকবে। তাই আমি সবসময় আমার কাজে মনোযোগ দিতাম। জীবন আমার, তাই সেটিকে সুন্দরভাবে গড়তে হবে।” শুরুর দিকে পরিবারের অনীহা থাকলেও এখন মা-বাবা তাঁর সিদ্ধান্তের সঙ্গে গর্বিত।

কানিজের উদ্যোগ শুধু ব্যবসা নয়; তিনি সমাজের জন্যও কাজ করেন। ‘আর্ট অব ডিভা ফাউন্ডেশন’ এর মাধ্যমে তিনি গ্রামে নিম্ন আয়ের নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন। উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে পণ্য সরবরাহ, শীতবস্ত্র বিতরণ, ঈদ উপহার ও এতিমদের খাদ্য সহযোগিতা—সবই এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সম্ভব হচ্ছে।

নারী উদ্যোক্তাদের ঝরে পড়ার মূল কারণ হিসেবে তিনি দেখেছেন পরিবারিক সহযোগিতা ও আর্থিক সমস্যা। তিনি বলেন, “নারী উদ্যোক্তার জন্য প্রথম প্রতিবন্ধকতা আসে পরিবার থেকে। তাই পারিবারিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

কানিজ দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু টিপস দিয়েছেন নারী উদ্যোক্তাদের জন্য:

যেটি নিয়ে উদ্যোগ নিতে চান, তা ভালোভাবে জানুন।

বাজার গবেষণা অপরিহার্য।

যে পণ্যের উপর কাজ করবেন, তার চাহিদা বোঝা জরুরি।

সঠিক কাঁচামাল নির্বাচন করুন।

উদ্যোগে তার শ্রম ও নিষ্ঠা স্বীকৃতিও পেয়েছে। জয়িতা ২০১৯, পাওয়ার উইমেন পদ্মা ব্যাংক ২০২১, এবং দক্ষিণ এশিয়ার ১০০ সেরা নারী উদ্যোক্তা অ্যাওয়ার্ড ২০২২ এর মত পুরস্কার তার কাজের পরিচায়ক।

কানিজ ফাতেমা ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ ব্যবসা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছেন, যেখানে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং গ্রামের নিম্ন আয়ের নারীরা উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মনির্ভর হবেন। তাঁর এই স্বপ্ন ও পরিকল্পনা প্রমাণ করে, সাহসী পদক্ষেপ এবং দৃঢ় মনোবল দিয়ে যে কেউ নতুন সম্ভাবনার পথে এগোতে পারে।

 

বাংলাদেশের প্রথম ‘কার্বন-নিরপেক্ষ’ শিশু রুহাব

দেশের প্রথম ‘কার্বন-নিরপেক্ষ’ শিশু হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার ছোট্ট আয়ান খান রুহাব। মাত্র আট মাস বয়সেই সে হয়ে উঠেছে পরিবেশবান্ধব জীবনের এক অনন্য প্রতীক।
পরিবেশ বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ICCCAD) আনুষ্ঠানিকভাবে এই স্বীকৃতি প্রদান করে।

রুহাবের বাবা ইমরান রাব্বি, পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রীনম্যান–এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং মা আয়শা আক্তার কিরণ সংগঠনটির সমন্বয়ক। সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য একটি ইতিবাচক উদ্যোগ নিতে গিয়ে তারা রোপণ করেছেন ৫৮০টি গাছের চারা—নিজ বাড়ি ও আত্মীয়দের জমিতে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, এই বৃক্ষগুলোই রুহাবের পুরো জীবনের সম্ভাব্য কার্বন নিঃসরণ ভারসাম্য বজায় রাখবে।

আয়শা কিরণ বলেন, “রুহাবের জন্য আমরা যা করেছি, তা শুধু তার জন্য নয়—এই পৃথিবীর ভবিষ্যতের জন্যও। চাই, প্রতিটি বাবা-মা তাদের সন্তানের জন্য কিছু গাছ লাগান।”

আইসিসিসিএডি এর ইয়ুথ অ্যান্ড জেন্ডার বিষয়ক প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর সুমাইয়া বিনতে সেলিম জানান-
“বিশ্ব ব্যাংকের মানদণ্ড থেকে দেখা হয়েছে কোনো দেশের মানুষ বছরে কতটুকু কার্বন নিঃসরণ করে। সেই হিসাব এবং একটি গাছ বছরে কতটুকু কার্বন শোষণ করতে পারে- এই দুটি বিষয় বিবেচনা করে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ধরে রুহাবকে কার্বন-নিরপেক্ষ শিশু হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।”

প্রতিষ্ঠানটির এক সমন্বয়ক বলেন, “এটি কেবল একটি স্বীকৃতি নয়, এটি পৃথিবী বাঁচানোর এক আন্দোলনের প্রতীক। আমরা চাই, ভবিষ্যতে আরও মানুষ এ ধরনের উদ্যোগে অংশ নিক।”

এদিকে, কার্বন-নিরপেক্ষতা বলতে বোঝায় এমন এক ভারসাম্য, যেখানে একজন মানুষ যতটুকু কার্বন বাতাসে ছড়ায়, প্রকৃতির উদ্যোগে বা প্রযুক্তির মাধ্যমে ততটাই কমিয়ে আনা হয়। এতে পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে ভারতের তামিলনাড়ুর দুই বছর বয়সী আদাভি বিশ্বের প্রথম ‘কার্বন-নিরপেক্ষ’ শিশু হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। তার মা-বাবা মেয়ের জীবদ্দশার কার্বন নিঃসরণ ভারসাম্য রাখতে রোপণ করেছিলেন প্রায় ছয় হাজার গাছ।

 

বাংলাদেশে উদ্বেগজনকভাবে কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে।

বাংলাদেশে কন্যাশিশুরা এখনো নানামুখী সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে— এমন তথ্য উঠে এসেছে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি এই প্রতিবেদনে দেখা যায়, কন্যাশিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মাত্রা এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।

শনিবার (৪ অক্টোবর) বিকেল ৩টার পর রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটির তথ্য প্রকাশ করা হয়। জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছে শিশু অধিকার বিষয়ক সংস্থা এডুকো বাংলাদেশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে দেশে ৩৪ জন শিশু অপহরণ ও পাচারের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৮ জন কন্যাশিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও বাকিদের অবস্থান অজানা। একই সময়ে ৮৩ জন কন্যাশিশু খুনের শিকার হয়েছে এবং ৫০ জন কন্যাশিশুর রহস্যজনক মৃত্যু ঘটেছে, যাদের মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যায়নি।

এ ছাড়া, এই সময়ের মধ্যে ৫৪ জন কন্যাশিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে এবং ৩৯০ জন কন্যাশিশু ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, নানা মানসিক ও সামাজিক চাপের কারণে ১০৪টি শিশু আত্মহত্যা করেছে, যা সমাজে কন্যাশিশুর নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্যের চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেটর সৈয়দা আহসানা জামান এ্যানি। তিনি বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের মধ্য দিয়ে নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এমন একটি সমাজ গঠন করতে হবে যেখানে একজন নারী বা কন্যাশিশু কোনো ধরনের সহিংসতার ভয় ছাড়াই ঘর থেকে বের হতে পারবেন এবং নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবেন। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রেও নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সভাপতি ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, আমাদের সমাজে নারী ও কন্যাশিশুর অবস্থার কিছু পরিবর্তন হলেও তা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। বাল্যকাল থেকেই নারীদের প্রতি বঞ্চনা ও বৈষম্যের অবসান ঘটাতে হবে। তাদের শিক্ষা, পুষ্টি ও দক্ষতায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তিনি আরও বলেন, “নারীর অবস্থার পরিবর্তন মানে পুরো জাতির অবস্থার পরিবর্তন।”

সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংসদে নারীদের সরাসরি নির্বাচনের প্রস্তাব নিয়ে পাঁচবার আলোচনা হয়েছে, কিন্তু ১০০ আসনে নারীদের সরাসরি নির্বাচনের বিষয়ে এখনো ঐকমত্য হয়নি। তিনি মন্তব্য করেন, “এই ঘটনায় নারী রাজনৈতিক অধিকার পরাজিত হয়েছে— জয়ী হয়েছে পুরুষতন্ত্র।”

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, আইনি কাঠামোর কার্যকারিতা নিশ্চিতকরণ এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে শিশুবান্ধব পরিবেশ তৈরির বিকল্প নেই। ফোরামের মতে, কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র— তিন পক্ষকেই আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।

 

সন্তানের আচরণ হঠাৎ বদলে গেলে কী করবেন?

বেশির ভাগ অভিভাবকই হয়তো এমন অভিজ্ঞতার মধ্যে পড়েন-আগে যে সন্তান মা বাবাকে চোখে হারাতো, হঠাৎ একসময় তার মাঝেই দেখা দেয় অস্বাভাবিক রাগ, জেদ কিংবা অবাধ্যতা। অনেক মা বলেন, “আমার ছেলে/মেয়ে হঠাৎ বদলে গেছে।” এমন পরিবর্তন নিছক মুডের ওঠানামা নয়, বরং এটি হতে পারে গভীর মানসিক সংকেত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে কিশোর বয়সীদের মধ্যে প্রায় ১৪% মানসিক সমস্যায় ভুগছে। অথচ এই অঞ্চল, বিশেষ করে বাংলাদেশে, শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা অনেক কম। ফলে খুব স্বাভাবিক পরিবর্তনও অনেক সময় বড় সমস্যায় রূপ নিতে পারে।

একটি ছোট্ট গল্প দিয়ে শুরু করা যাক। তিনা (ছদ্মনাম), বয়স বারো। আগে মা ছাড়া চলত না, মায়ের পেছনেই ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াত। কিন্তু এখন তার চেহারাতেই বিরক্তি, কথা বললেই মুখ গোমড়া, রাগারাগি। মা জানালেন, কিছুদিন আগে তিনার ছোট ভাই জন্মেছে। এরপর থেকেই এমন আচরণ দেখা দিয়েছে। আদর, ভালোবাসা, খেলনা—সব দিয়েও যেন মন গলানো যাচ্ছে না। বরং দিন দিন সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তন দেখে অনেক অভিভাবক চিন্তিত হয়ে পড়েন—“আমার সন্তান কেন এমন করছে?”

এখানে বিষয়টা বোঝা জরুরি। প্রথমেই যে ব্যাপারটি মাথায় রাখতে হবে, তা হলো—শিশুর আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন কোনো একক ঘটনা নয়, বরং এর পেছনে থাকে একাধিক মনস্তাত্ত্বিক ও পারিবারিক কারণ। ছোট ভাই জন্মের পর তিনার ভেতরে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তা মনোবিদ্যার ভাষায় ‘সিবলিং রাইভালরি’। অর্থাৎ, আগে সে যে গুরুত্ব পেত, এখন সেটি হঠাৎ হারিয়ে গেছে বলে তার মনে হচ্ছে। এতে করে তার মধ্যে অনিরাপত্তা, মনোযোগের ক্ষুধা এবং অভিমান তৈরি হয়েছে, যা বাইরে রাগ বা অবাধ্যতার রূপে প্রকাশ পাচ্ছে।

একজন শিশুর জন্য মা–ই তার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। জন্মের পর থেকেই শিশুর যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ হয় মায়ের হাত ধরে। তাই মায়ের সঙ্গে তার যে আবেগগত বন্ধন তৈরি হয়, সেটি অন্য কারো সঙ্গে হয় না। আর সেই কারণেই, যখন শিশুটি কোনো মানসিক চাপে পড়ে, তখন প্রথমেই সেই অভিব্যক্তি প্রকাশ পায় মায়ের প্রতি। মা-ই হয়ে ওঠেন তার আবদার, অভিমান এমনকি রাগ প্রকাশের ‘নিরাপদ জায়গা’। অনেক সময় সন্তান মায়ের সঙ্গে যতটা অবাধ্য, অন্যদের সঙ্গে ততটা নয়—এটিও সেই মানসিক সংযুক্তির কারণেই হয়।

শিশু থেকে কিশোর বয়সে পা রাখার মধ্যবর্তী সময়টিও বেশ সংকটপূর্ণ। শারীরিক ও মানসিকভাবে তখন তারা নতুন এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। এই বয়সে নিজেদের মতামত প্রকাশের চেষ্টা, স্বাধীনচেতা হয়ে ওঠা এবং নিজের একটা আলাদা পরিচয় তৈরি করার ইচ্ছা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রয়াসটি অনেক সময় রাগ, বিরক্তি বা মা–বাবার কথার বিরুদ্ধাচরণ হিসেবেই প্রকাশ পায়। অনেক সময় এটিকে ভুলভাবে বিশ্লেষণ করে বাবা–মা শাসনের পথ বেছে নেন, যা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে।

এর বাইরেও কিছু মানসিক জটিলতা, যেমন ADHD (Attention Deficit Hyperactivity Disorder), ODD (Oppositional Defiant Disorder), বা বুদ্ধিবিকাশজনিত অন্যান্য সমস্যা শিশুর আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি যদি পারিবারিক পরিবেশ অশান্ত হয়, বাবা–মায়ের মধ্যে কলহ থাকে, অথবা সন্তানের প্রতি অতি শাসন বা অবহেলা করা হয়, তাহলেও তার মনের ওপর চাপ তৈরি হয়। এসব কারণেই আচরণে দেখা দেয় হঠাৎ রাগ, জেদ বা বিরক্তি।

এমন পরিস্থিতিতে অনেক অভিভাবক প্রথমেই যা করেন, তা হলো বকা দেওয়া, মারধর বা আরও কঠোর হওয়া। অথচ, এভাবে সমস্যার সমাধান তো হয়ই না, বরং শিশু আরও দূরে সরে যায়।
বকাঝকা না করে বরং সন্তানের সঙ্গে কথা বলুন, সময় দিন। বোঝার চেষ্টা করুন, তার ভেতরে কী চলছে। হয়তো সে কোনো কষ্ট লুকিয়ে রেখেছে, যা প্রকাশ করার ভাষা সে খুঁজে পাচ্ছে না। তখন তার রাগটাই হয়ে উঠছে সেই ভাষা। এই ভাষাকে ভুল না বুঝে বরং সহানুভূতির সঙ্গে গ্রহণ করুন। ধৈর্য ধরে পাশে থাকুন।

সবচেয়ে বড় কথা, সন্তান বড় হওয়ার মানে শুধু তাকে ভালো খাবার, ভালো স্কুল আর ভালো জামাকাপড় দেওয়া নয়। তার মন, তার অনুভূতি, তার বিকাশ—সবই যত্নের দাবি রাখে। আর এই যত্নের বড় অংশ জুড়ে আছে আপনার সহানুভূতি, বোঝার চেষ্টা আর সঠিক সময়ের সঠিক সিদ্ধান্ত।

সন্তান হঠাৎ অবাধ্য হলে বলবেন না—”বাচ্চারা তো এমনই হয়!” বরং ভাবুন—”সে এমন করছে কেন?” তাহলেই আপনি পারবেন তার মন বুঝতে, এবং তাকে ভালোভাবে গড়ে তুলতে।

 

নিউজিল্যান্ডে সম্পূর্ণ ফ্রি পিএইচডি স্কলারশিপ!

University of Otago ঘোষণা দিয়েছে ২০২৫ সালের জন্য পূর্ণ অর্থায়নে PhD Research Scholarship—এই সুযোগটি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত!

ডেডলাইন: আবেদন সারা বছরজুড়েই খোলা থাকবে

বৃত্তির সুবিধাসমূহ:

  • সম্পূর্ণ টিউশন ফি বিশ্ববিদ্যালয় বহন করবে
  • গবেষণার জন্য বার্ষিক স্টাইপেন্ড প্রদান করা হবে
  • অতিরিক্ত গবেষণা সহায়তাও দেওয়া হবে
  • বাংলাদেশসহ বিশ্বের যেকোনো দেশের শিক্ষার্থী আবেদন করতে পারবেন

এখনই আবেদন করুন: https://tinyurl.com/4rvya275

University of Otago PhD Scholarships 2025

 

ক্ষমতার দ্বন্দ্বে বিধ্বস্ত সুদান, মৃত্যুর মিছিলে আফ্রিকা

সুদানে টানা দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ চলছে। সেনাবাহিনী ও আধা-সামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর মধ্যে সংঘাতে আজ দেশটি পরিণত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটের কেন্দ্রে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এই সংঘাতে দেড় লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, প্রায় এক কোটি বিশ লাখ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে, এবং পুরো দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে দুর্ভিক্ষ ও ধ্বংসযজ্ঞ। পশ্চিম দারফুর অঞ্চলের এল-ফাশের শহর সম্প্রতি আরএসএফ বাহিনীর দখলে চলে গেছে, যেখানে তারা গণহত্যা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশ্বের বিবেক আজ সুদানের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু যুদ্ধের আগুন যেন নিভছেই না।

এই গৃহযুদ্ধের সূচনা ২০১৯ সালে, প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরের পতনের মধ্য দিয়ে। তিন দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা বশিরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বৈরাচার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যখন জনরোষ তীব্র হয়, তখন সেনাবাহিনী তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। কিন্তু এতে দেশে স্থিতিশীলতা ফেরেনি। গণতন্ত্রের দাবিতে বিক্ষোভ চলতে থাকে, যার ফলে সেনাবাহিনী ও বেসামরিক প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। কিন্তু দুই বছর না যেতেই, ২০২১ সালের অক্টোবরে আবারও সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। এবার অভ্যুত্থানের পেছনে ছিলেন দুই সেনানায়ক—জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান এবং জেনারেল মোহামেদ হামদান দাগালো, যিনি “হেমেডটি” নামে পরিচিত।

এক সময় ঘনিষ্ঠ এই দুই সামরিক নেতা ক্ষমতা ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। মূল বিরোধ ছিল আরএসএফ বাহিনীর সৈন্যদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা এবং নতুন বাহিনীর নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে—এ নিয়েই। সেনাবাহিনী আশঙ্কা করেছিল, আরএসএফকে একীভূত করা হলে দাগালোর ক্ষমতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে। এই উত্তেজনার মধ্যেই ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল দুই বাহিনীর মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ শুরু হয়। রাজধানী খার্তুমসহ বড় বড় শহরে বন্দুকের গুলি আর বোমার শব্দে কেঁপে ওঠে সুদান।

আরএসএফ বাহিনীর জন্ম ২০১৩ সালে, যার মূল শিকড় দারফুর অঞ্চলের কুখ্যাত জানজাওয়িদ মিলিশিয়ায়। ওমর আল-বশির শাসনামলে এই মিলিশিয়া বিদ্রোহীদের দমন করতে ভয়াবহভাবে নিপীড়ন চালায়—হত্যা, ধর্ষণ ও গণঅগ্নিসংযোগ তাদের নিত্যকার কৌশল ছিল। আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে বশির এই মিলিশিয়াকে বৈধতা দেন এবং তাদের র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস নামে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেন। দাগালো বা হেমেডটির নেতৃত্বে আরএসএফ খুব দ্রুত একটি শক্তিশালী আধা-সামরিক বাহিনীতে পরিণত হয়।

পরবর্তীতে আরএসএফ ইয়েমেন ও লিবিয়ার সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এবং সুদানের বিভিন্ন সোনার খনি দখলে নেয়। এই অর্থনৈতিক শক্তি দাগালোর হাতে ব্যাপক প্রভাব এনে দেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরএসএফ সেনাবাহিনীর সমান শক্তি অর্জন করে, এমনকি রাজধানী খার্তুমের একাংশও তারা দখল করে নেয়। বর্তমানে আরএসএফ সুদানের পশ্চিমাঞ্চল দারফুর, কোর্দোফানসহ বিশাল এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের দাবি—এই অঞ্চলগুলো নিয়ে তারা একটি নতুন সরকার গঠন করবে। ফলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, ২০১১ সালে দক্ষিণ সুদানের মতো আবারও দেশটি বিভক্ত হতে পারে।

অন্যদিকে, সেনাবাহিনীর হাতে রয়েছে উত্তর ও পূর্বাঞ্চল। সেনাপ্রধান জেনারেল আল-বুরহান এখন লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত পোর্ট সুদানকে নিজের প্রধান ঘাঁটি ঘোষণা করেছেন। এখান থেকেই জাতিসংঘ সমর্থিত সরকারের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ধারণা করা হয়, সেনাবাহিনীকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন দিচ্ছে মিসর, কারণ নীলনদ ও সীমান্তসংলগ্ন অর্থনৈতিক স্বার্থ দুই দেশের সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ করেছে। তবে যুদ্ধের আগুন এখানেও ছড়িয়ে পড়েছে—২০২৫ সালের মার্চে আরএসএফ ভয়াবহ ড্রোন হামলা চালায় পোর্ট সুদানে, যেখানে অসংখ্য বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়।

দারফুর অঞ্চল আজ পরিণত হয়েছে মৃত্যুর উপত্যকায়। আরএসএফ ও তাদের মিত্র মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে সেখানে গণহত্যা, ধর্ষণ ও জাতিগত নিধনের অভিযোগ উঠেছে। জাতিসংঘ, ইউনিসেফ ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়াবহ সব তথ্য—শিশু, নারী, বৃদ্ধ কেউই রেহাই পাচ্ছে না। এমনকি এক বছর বয়সী শিশুদেরও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। দারফুরের অনারব মাসালিট গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে আরএসএফ সেনারা বলেছে, “তোমাদের গর্ভে আরব সন্তান দেব।” এসব অপরাধে শুধু আরএসএফ নয়, সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধেও যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এখন এল-ফাশের অঞ্চলে থাকা আড়াই লাখের বেশি অনারব নাগরিক বেঁচে থাকার লড়াই চালাচ্ছে।

সুদান উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশ। প্রায় উনিশ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দেশের সীমানা সাতটি আফ্রিকান রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত, এবং লোহিত সাগরের তীরঘেঁষা অবস্থান এটিকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। নীলনদও এই দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। জনসংখ্যার অধিকাংশই মুসলিম, ভাষা আরবি ও ইংরেজি। অথচ প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এই দেশ বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র রাষ্ট্র। গৃহযুদ্ধ শুরুর আগে নাগরিকদের গড় বার্ষিক আয় ছিল মাত্র ৭৫০ ডলার। যুদ্ধের পর তা আরও কমে গেছে, রাষ্ট্রীয় আয় প্রায় ৮০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, লাখ লাখ মানুষ অনাহার ও রোগে ভুগছে।

সুদানের এই সংঘাত এখন শুধু রাজনৈতিক লড়াই নয়; এটি ধর্ম, জাতি, সম্পদ ও ক্ষমতার সংঘর্ষ।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মহল একে “মানবসভ্যতার অন্যতম ভয়াবহ ট্র্যাজেডি” হিসেবে দেখছে।
তবে সেনাবাহিনী ও আরএসএফ—উভয় পক্ষই এখনো সমঝোতায় আসার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না।

এক সময় যে দেশ ইসলামি ঐতিহ্য, সোনার খনি আর নীলনদের জন্য গর্ব করত—
আজ সেই সুদান রক্ত, ধ্বংস আর ক্ষুধার রাজ্যে পরিণত হয়েছে।