banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

Daily Archives: January 16, 2026

 

নারী: অগ্রযাত্রা, অর্জন আর অবমাননার দ্বৈত বাস্তবতা

একবিংশ শতকের বাংলাদেশে নারী আর ঘরের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নেই। তারা এখন শুধু সংসারের দায়িত্ব নয়, রাষ্ট্র ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও কাঁধে নিচ্ছেন। আকাশে বিমান চালাচ্ছেন, সমুদ্রপথে জাহাজ চালাচ্ছেন, পাহাড় জয়ের দুঃসাহস দেখাচ্ছেন, আবার প্রশাসনের কড়িকাঠে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। রাজনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিজ্ঞান গবেষণা কিংবা আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চ—সবখানেই নারীর দৃপ্ত পদচারণা আজ এক বাস্তবতা।

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ অলংকৃত করা থেকে শুরু করে প্রশাসনের প্রতিটি পর্যায়ে, রাজনীতি থেকে কূটনীতি, কৃষি থেকে শিল্প, চিকিৎসা থেকে বিচারব্যবস্থা—সবখানেই সমানতালে এগিয়ে চলেছেন বাংলার নারী। বিমান চালনা, ট্রেন চালনা কিংবা শহরের রাইড শেয়ারিং—যেখানে চ্যালেঞ্জ, সেখানেই নারী নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস পোশাকশিল্পে সবচেয়ে বড় অবদানও তাদেরই। এভারেস্টসহ বিশ্বের সাতটি সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয় করেছেন বাংলার নারী। এমনকি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনেও তাদের অংশগ্রহণ গৌরবময় অধ্যায় রচনা করছে।

বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও নারীর অবস্থান দৃঢ় হচ্ছে। রাজনীতি, গবেষণা ও প্রশাসনে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা নারী উদ্যোক্তা যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পুরস্কার অর্জন করেন, তখন প্রমাণ মেলে—আজকের বাংলার নারী চাইলে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন।

তবু বাস্তবতার আরেকটি মুখ রয়েছে। ঝকঝকে সাফল্যের নিচে লুকিয়ে আছে ঘন অন্ধকার। প্রতিদিন সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমে চোখে পড়ে নারী নির্যাতনের ভয়ংকর চিত্র। ধর্ষণ, গণধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ, অপহরণ, পাচার, যৌতুকের দাবিতে হত্যা কিংবা স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির নির্যাতনে আত্মহত্যা—এ যেন নিত্যদিনের ঘটনাপঞ্জি। ইয়াসমিন, সীমা রানী, তনু, নুসরাত, মিতু, চাঁপা রানীসহ অগণিত নাম সেই তালিকায় রয়ে গেছে। প্রতিটি ঘটনার সাময়িক প্রতিবাদ হলেও বিচারহীনতার দীর্ঘসূত্রতা নারীর বেদনা বাড়িয়ে দেয়।

অথচ নারী নির্যাতন কোনো এক দেশের সমস্যা নয়, এটি বৈশ্বিক সমস্যা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন গড়ে ৫০০জন নারী নির্যাতনের শিকার হন। অস্ট্রেলিয়ার গবেষণা বলছে, প্রতি ছয় নারীর মধ্যে একজন জীবনে শারীরিক বা যৌন সহিংসতার মুখোমুখি হন, যা ভয়াবহতায় সৌদি আরবকেও ছাড়িয়ে গেছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, রাজনীতি কিংবা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার উচ্চস্তর—কোথাও নারী নিরাপদ নন। গির্জার ভেতর থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপ্রধানের নাম পর্যন্ত নারী নির্যাতনের তালিকায় যুক্ত হয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন জাগে—একদিকে নারীর সাফল্য আর অন্যদিকে নির্যাতনের শিকার হওয়ার এই দ্বৈত বাস্তবতা কতদিন চলবে? সমাজ কি সত্যিই নারীর অর্জনকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে শিখেছে? নাকি এখনো গভীরে রয়ে গেছে নারীকে কেবল দুর্বল ও অধীনস্থ ভাবার প্রবণতা?

এই পরিস্থিতি বদলাতে শুধু কঠোর আইন প্রয়োগ নয়, প্রয়োজন সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন। দরকার শিক্ষা, সচেতনতা, মানবিকতা এবং নারী-পুরুষের সত্যিকারের সাম্যচর্চা। কারণ, নারী মর্যাদার লড়াই কোনো একক সংগ্রাম নয়, এটি সমগ্র সমাজের দায়িত্ব।

সেদিনই নারী সত্যিকার অর্থে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হবেন, যেদিন আমরা তাকে নারী বলে নয়, বরং একজন পূর্ণাঙ্গ, স্বাধীন ও স্বাবলম্বী মানুষ হিসেবে সম্মান করতে শিখবো।

 

দুর্যোগ মোকাবিলায় নারী নেতৃত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান

ঢাকা: দুর্যোগ মোকাবিলায় নারী নেতৃত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। ব্র্যাক, জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেন এবং সুইডিশ উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা সিডার সহায়তায় ২ সেপ্টেম্বর ’ ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে নতুন প্রকল্প ‘জেন্ডার রেসপন্সিভ ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন ইন বাংলাদেশ (জিআরডিআরআরআইবি) এর উদ্বোধনী কর্মশালায় সরকারি কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী, সুশীল সমাজের সদস্য, শিক্ষাবিদ ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কে এম আবদুল ওয়াদুদ বলেন, “দুর্যোগে প্রাণহানি কমলেও অর্থনৈতিক ক্ষতি এখনও অনেক বেশি। কার্যকর প্রস্তুতি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দুর্যোগ ঝুঁকি বিমা চালু ও যথাযথ অর্থায়ন অপরিহার্য।”

ইউএন উইমেনের ডেপুটি কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ নবনিতা সিনহা বলেন, “বাংলাদেশকে দুর্যোগ মোকাবিলায় অগ্রণী দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে নারীরা ইতিমধ্যেই সম্মুখসারিতে আছেন। এখন তাদের নেতৃত্বের স্তরে উন্নীত করতে হবে।”

সুইডেন দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি মাতিলদা স্ভেনসন বলেন, “দুর্যোগ মোকাবিলায় জেন্ডার সমতা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, এটি অপরিহার্য। সব পরিকল্পনায় নারীর দৃষ্টিভঙ্গি ও তথ্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।”

মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী গোলাম তৌসিফ বলেন, “নারীদের নেতৃত্ব দক্ষতা উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।” একই সঙ্গে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী—বিশেষত নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

ব্র্যাকের পরিচালক ড. মো. লিয়াকত আলী বলেন, “স্থানীয় প্রেক্ষাপট এবং জনগণের অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে দুর্যোগ প্রস্তুতি শক্তিশালী করা হবে।”

প্রকল্পের মূল লক্ষ্যগুলো হলো:

  1. জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস নীতিমালা ও কার্যক্রমে লিঙ্গভিত্তিক সমতা সংযোজন।
  2. সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনগণের সক্ষমতা বৃদ্ধি।
  3. ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
  4. জেন্ডার ইন হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাকশন (জিআইএচএ) ওয়ার্কিং গ্রুপসহ সমন্বয় কাঠামো শক্তিশালী করা।

এই প্রকল্প ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কুড়িগ্রাম, জামালপুর, সুনামগঞ্জ, সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, ভোলা, চট্টগ্রাম, সিরাজগঞ্জ, খুলনা ও সাতক্ষীরায় বাস্তবায়িত হবে।

 

পিরিয়ডের ব্যথা : হার্ট অ্যাটাকের মতোই যন্ত্রণাদায়ক

পিরিয়ড বা মাসিক নারীর জীবনের একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তীব্র ব্যথা ও অস্বস্তি, যা অনেক সময় স্বাভাবিক জীবনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, কিছু নারীর জন্য এই ব্যথা হার্ট অ্যাটাকের মতোই যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে।

লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক অধ্যাপক জন গুইলেবাউড এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, পিরিয়ডের সময় ব্যথা “হার্ট অ্যাটাকের থেকেও খারাপ হতে পারে।” তাঁর মতে, এই ব্যথাকে অবহেলা করা উচিত নয়; বরং এটিকে নারীর স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে গুরুত্ব দিতে হবে।

আরেক গবেষক অলিভিয়া গোল্ডহিল জানান, মাসিকজনিত যন্ত্রণার সঠিক কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এ বিষয়ে গবেষণার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুবই কম।

পিরিয়ডের সময় যে তলপেটের তীব্র ব্যথা হয়, সেটিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ডিসমেনোরিয়া বলা হয়।
প্রতি পাঁচজন নারীর মধ্যে অন্তত একজন এই সমস্যায় ভোগেন।
তীব্র ব্যথার কারণে অনেক সময় হাঁটা-চলা বা স্বাভাবিক কাজকর্ম করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অনেকেই হটব্যাগ, প্যারাসিটামল বা অন্যান্য ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে ব্যথা কমানোর চেষ্টা করেন, তবে এটি স্থায়ী সমাধান না।

কেন হয় এই ব্যথা?
পিরিয়ডের সময় শরীর প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন নামের একটি রাসায়নিক তৈরি করে। এটি জরায়ুকে সংকুচিত করে এবং রক্ত প্রবাহ কমিয়ে দেয়। এর ফলে জরায়ুর পেশিতে অক্সিজেন সরবরাহ হ্রাস পায়, আর তখনই ব্যথার উদ্ভব হয়।

এছাড়াও, এন্ডোমেট্রিওসিস নামক জটিলতায় অনেকে ভোগেন। এতে জরায়ুর কোষগুলো জরায়ুর বাইরে বেড়ে ওঠে, যা মাসিককে আরও যন্ত্রণাদায়ক করে তোলে। দীর্ঘদিন চিকিৎসাহীন থাকলে এটি বন্ধ্যাত্বের কারণও হতে পারে। তবে গবেষণা বলছে, এন্ডোমেট্রিওসিস একমাত্র কারণ নয়— অন্য শারীরবৃত্তীয় ও হরমোনজনিত কারণেও পিরিয়ডের ব্যথা তীব্র হয়ে ওঠে।

মানসিক প্রভাব
অধ্যাপক জন গুইলেবাউড মনে করেন, এই সময়ে নারীদের শরীরে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে মেজাজ ও মানসিক অবস্থায় ব্যাপক ওঠানামা হয়। ফলে শারীরিক কষ্টের সঙ্গে মানসিক চাপও যুক্ত হয়।

করণীয়
ব্যথা যদি সহনীয় না হয়, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সুষম খাদ্য গ্রহণ ব্যথা কমাতে সহায়ক হতে পারে।

পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের প্রতি সহমর্মিতা ও বাড়তি যত্ন নেওয়া উচিত। কারণ অনেক সময় মানসিক সহায়তাই শারীরিক কষ্ট কমাতে কার্যকর হয়।