একবিংশ শতকের বাংলাদেশে নারী আর ঘরের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নেই। তারা এখন শুধু সংসারের দায়িত্ব নয়, রাষ্ট্র ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও কাঁধে নিচ্ছেন। আকাশে বিমান চালাচ্ছেন, সমুদ্রপথে জাহাজ চালাচ্ছেন, পাহাড় জয়ের দুঃসাহস দেখাচ্ছেন, আবার প্রশাসনের কড়িকাঠে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। রাজনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিজ্ঞান গবেষণা কিংবা আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চ—সবখানেই নারীর দৃপ্ত পদচারণা আজ এক বাস্তবতা।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ অলংকৃত করা থেকে শুরু করে প্রশাসনের প্রতিটি পর্যায়ে, রাজনীতি থেকে কূটনীতি, কৃষি থেকে শিল্প, চিকিৎসা থেকে বিচারব্যবস্থা—সবখানেই সমানতালে এগিয়ে চলেছেন বাংলার নারী। বিমান চালনা, ট্রেন চালনা কিংবা শহরের রাইড শেয়ারিং—যেখানে চ্যালেঞ্জ, সেখানেই নারী নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস পোশাকশিল্পে সবচেয়ে বড় অবদানও তাদেরই। এভারেস্টসহ বিশ্বের সাতটি সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয় করেছেন বাংলার নারী। এমনকি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনেও তাদের অংশগ্রহণ গৌরবময় অধ্যায় রচনা করছে।
বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও নারীর অবস্থান দৃঢ় হচ্ছে। রাজনীতি, গবেষণা ও প্রশাসনে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা নারী উদ্যোক্তা যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পুরস্কার অর্জন করেন, তখন প্রমাণ মেলে—আজকের বাংলার নারী চাইলে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন।
তবু বাস্তবতার আরেকটি মুখ রয়েছে। ঝকঝকে সাফল্যের নিচে লুকিয়ে আছে ঘন অন্ধকার। প্রতিদিন সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমে চোখে পড়ে নারী নির্যাতনের ভয়ংকর চিত্র। ধর্ষণ, গণধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ, অপহরণ, পাচার, যৌতুকের দাবিতে হত্যা কিংবা স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির নির্যাতনে আত্মহত্যা—এ যেন নিত্যদিনের ঘটনাপঞ্জি। ইয়াসমিন, সীমা রানী, তনু, নুসরাত, মিতু, চাঁপা রানীসহ অগণিত নাম সেই তালিকায় রয়ে গেছে। প্রতিটি ঘটনার সাময়িক প্রতিবাদ হলেও বিচারহীনতার দীর্ঘসূত্রতা নারীর বেদনা বাড়িয়ে দেয়।
অথচ নারী নির্যাতন কোনো এক দেশের সমস্যা নয়, এটি বৈশ্বিক সমস্যা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন গড়ে ৫০০জন নারী নির্যাতনের শিকার হন। অস্ট্রেলিয়ার গবেষণা বলছে, প্রতি ছয় নারীর মধ্যে একজন জীবনে শারীরিক বা যৌন সহিংসতার মুখোমুখি হন, যা ভয়াবহতায় সৌদি আরবকেও ছাড়িয়ে গেছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, রাজনীতি কিংবা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার উচ্চস্তর—কোথাও নারী নিরাপদ নন। গির্জার ভেতর থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপ্রধানের নাম পর্যন্ত নারী নির্যাতনের তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন জাগে—একদিকে নারীর সাফল্য আর অন্যদিকে নির্যাতনের শিকার হওয়ার এই দ্বৈত বাস্তবতা কতদিন চলবে? সমাজ কি সত্যিই নারীর অর্জনকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে শিখেছে? নাকি এখনো গভীরে রয়ে গেছে নারীকে কেবল দুর্বল ও অধীনস্থ ভাবার প্রবণতা?
এই পরিস্থিতি বদলাতে শুধু কঠোর আইন প্রয়োগ নয়, প্রয়োজন সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন। দরকার শিক্ষা, সচেতনতা, মানবিকতা এবং নারী-পুরুষের সত্যিকারের সাম্যচর্চা। কারণ, নারী মর্যাদার লড়াই কোনো একক সংগ্রাম নয়, এটি সমগ্র সমাজের দায়িত্ব।
সেদিনই নারী সত্যিকার অর্থে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হবেন, যেদিন আমরা তাকে নারী বলে নয়, বরং একজন পূর্ণাঙ্গ, স্বাধীন ও স্বাবলম্বী মানুষ হিসেবে সম্মান করতে শিখবো।




