banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

Daily Archives: January 16, 2026

 

রোবি তে নিকাব খুলতে বাধ্য করার অভিযোগ

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে অনুষ্ঠিত এক মৌখিক (ভাইভা) পরীক্ষায় নারী শিক্ষার্থীকে নিকাব খুলতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী জানান, ভাইভা রুমে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে এক্সটার্নাল পরীক্ষক তাকে মুখ খুলতে বলেছিলেন। শিক্ষার্থী জানিয়েছিলেন, তিনি নিকাব খুলতে পারবেন না এবং এটি তার ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় স্বাধীনতার অংশ। এরপর পরীক্ষক বলেন, “এটা কোনো নিয়ম না, এটা অভদ্রতা।” উপস্থিত অন্যান্য শিক্ষকও একই রকম মন্তব্য করেন। এক শিক্ষক বলেন, “তুমি তো চাকরি করতে চাইবে? এভাবে গেলে চাকরি দেবে?” আরেকজন বলেন, “এখানে আসার আগে প্রিপারেশন নিতে হবে, নিয়ম মানতে হবে।”

শিক্ষার্থী জানান, তিনি নিকাব খুলতে অস্বীকার করলে পরীক্ষক বিদেশি শিক্ষার্থীদের উদাহরণ দেন এবং বলেন, “তুর্কি, ইরানি, আফগান মেয়েরা কি ইসলাম মানে না? ওরা কি এভাবে থাকে?” এছাড়া, রুম থেকে বের হওয়ার সময় সতর্ক করা হয় যে, পরের বার এভাবে আসবেন না। একই সঙ্গে, একজন শিক্ষক হুমকি দেন যে, তার এই ড্রেসকোডের কারণে ‘শূন্য নম্বর’ দেওয়া হতে পারে।

পরে জানা যায়, ভাইভা শুরুর আগে সেমিনার রুমে মেয়েদের বলা হয়েছিল, কেউ যেন নিকাব পরে ভাইভা রুমে প্রবেশ না করে। তারপরও কয়েকজন শিক্ষার্থী নিকাব পরে প্রবেশ করলে তাদের নিকাব খুলতে বাধ্য করা হয়। যিনি নিকাব খুলতে বাধ্য করেছেন, তিনি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নন, বরং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা এক্সটার্নাল পরীক্ষক নুরুল কাউয়ুম।এ সময় রুমে উপস্থিত ছিলেন বিভাগের অন্যান্য শিক্ষকরা, কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করেননি। হুমকি দেওয়ার দায়িত্ব মূলত বিভাগের শিক্ষক ইউসুফের।

উল্লেখ্য, ভাইভা বোর্ডে কোনো নারী শিক্ষক ছিলেন না, সব শিক্ষকই পুরুষ ছিলেন।
শিক্ষার্থীরা দাবি করেছেন, ভবিষ্যতে নারী শিক্ষার্থীদের পরিচয় যাচাই ও ভাইভা পরীক্ষার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নারী শিক্ষক রাখা উচিত, যাতে তাদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও ধর্মীয় অধিকারে হস্তক্ষেপ না করা যায়।

এই ঘটনার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টি নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে।

 

ব্যাংক খাতে নারী কর্মী হ্রাস: ছয় মাসে কমেছে প্রায় ২ হাজার

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মীর সংখ্যা ক্রমেই কমছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে নারী কর্মীর সংখ্যা কমেছে প্রায় দুই হাজার, যা মোটের ওপর প্রায় পাঁচ শতাংশ হ্রাস নির্দেশ করে। গত বছরের জুলাই-ডিসেম্বরে নারী কর্মীর সংখ্যা ছিল ৩৭ হাজার ৬৪৯ জন, যা এ বছরের জুন শেষে নেমে দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৭৮২ জনে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলোতে নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিতের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে। শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং অফিস-পরবর্তী যাতায়াত সুবিধায় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে অফিস-পরবর্তী যাতায়াত সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে—গত বছরের শেষার্ধে যেখানে ৫২ শতাংশ নারী এই সুবিধা পেতেন, তা কমে বর্তমানে ৩৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকে মোট কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লাখ ১৩ হাজার। এর মধ্যে নারী কর্মীর সংখ্যা মাত্র ১৭ শতাংশ। বাকি ৮৩ শতাংশ পুরুষ কর্মী। আর্থিক প্রতিষ্ঠানে একই চিত্র দেখা যায়—সেখানে প্রতি পাঁচজন পুরুষ কর্মীর বিপরীতে নারী কর্মী প্রায় একজন।

নারী কর্মীদের পদোন্নতি ও কর্মমূল্যায়নে বৈষম্যের অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মাতৃত্বকালীন ছয় মাসের ছুটিকে কর্মমূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এ ছাড়া কাজের পরিবেশ, ডে কেয়ার ও নিরাপদ যাতায়াত সুবিধার অভাবে অনেক নারী মাঝপথেই চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন। এক নারী কর্মকর্তা জানান, সন্তান প্রতিপালনের অসুবিধার কারণে গত পাঁচ বছরে তার পরিচিত কয়েকজন নারী সহকর্মী চাকরি ছেড়েছেন।
উচ্চপর্যায়ে নারী কর্মীর উপস্থিতিও সন্তোষজনক নয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর উচ্চপদে নারী অংশগ্রহণের হার ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ। বিদেশি ব্যাংকে এই হার প্রায় ১৪ শতাংশ। আর বেসরকারি ব্যাংকে তা মাত্র ৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ। তবে পরিচালনা পর্ষদে নারী সদস্যের হার সবচেয়ে বেশি বিদেশি ব্যাংকে (১৭ দশমিক ২৪ শতাংশ), আর সবচেয়ে কম রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকে (৪ শতাংশ)।
নারী কর্মীর সংখ্যার দিক থেকে বেসরকারি ব্যাংক শীর্ষে রয়েছে। সেখানে কর্মরত নারী কর্মীর সংখ্যা ২৫ হাজারের বেশি। রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকে কর্মরত আছেন প্রায় ৮ হাজার ৭৫০ জন নারী। বিদেশি ব্যাংকগুলোতে কর্মরত নারী মাত্র এক হাজার ৩২ জন এবং বিশেষায়িত তিন ব্যাংকে কর্মরত আছেন প্রায় ২ হাজার নারী।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবিব মনে করেন, ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকটের কারণে নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানগুলো মনোযোগ দিতে পারছে না। অন্যদিকে, ইস্টার্ন ব্যাংকের নারী ব্যাংকিং প্রধান তানজেরি হক জানান, মধ্যবর্তী পর্যায়ে অনেক নারী পরিবার ও সন্তানের কারণে চাকরি ছেড়ে দেন, ফলে নেতৃত্ব পর্যায়ে পৌঁছানোর মতো নারী কর্মীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

সার্বিকভাবে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের ব্যাংক খাতে নারীর উপস্থিতি থাকলেও নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তারা এখনো পিছিয়ে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মানসিকতা পরিবর্তন এবং নারীবান্ধব নীতি কার্যকর না হলে এ পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।

 

দিবস উদযাপনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সহিংসতা

সে রাজকন্যা নয়, না কোনো রূপকথার চরিত্র। তবু দক্ষিণ এশিয়ার কোটি শিশুর অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে সে। তার কণ্ঠস্বর স্কুলে পাঠিয়েছে মেয়েদের, শিখিয়েছে স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের উপায়, আর সাহস জুগিয়েছে বাল্যবিবাহ ও যৌতুকের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে। তার নাম মিনা—যে কেবল কার্টুনের কাগুজে চরিত্র নয়, বরং কন্যাশিশুর অধিকার নিয়ে কথা বলার প্রতীক।

মীনার বয়স আমরা জানি না, জানি না তার গ্রাম বা স্কুলের নামও। তবু দক্ষিণ এশিয়ার কোটি শিশু তাকে নিজেদের মতো করে চিনে নিয়েছে। কারণ মীনা কেবল একটি কার্টুন চরিত্র নয়, সে শিশুদের অধিকার নিয়ে সমাজকে ভাবিয়েছে, বিশেষ করে মেয়েশিশুদের শিক্ষা ও স্বপ্নের কথাই সে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়ে বলেছে।

১৯৯০ থেকে ২০০০ সালকে দক্ষিণ এশিয়ার কন্যাশিশুর দশক ঘোষণা করা হয়। সেই প্রেক্ষাপটে ইউনিসেফ তৈরি করে মীনা কার্টুন, যা বাংলাদেশসহ একাধিক দেশে শিশুদের সচেতনতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৯৮ সাল থেকে প্রতিবছর ২৪ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে মীনা দিবস।

অন্যদিকে বাংলাদেশে ২০০০ সাল থেকে প্রতি বছর ৩০ সেপ্টেম্বর পালন করা হচ্ছে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস। লক্ষ্য একটাই—কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতা বন্ধ করা, তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

কন্যাশিশু দিবস বা মীনা দিবস—দুটিই আমাদের মনে করিয়ে দেয় রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্বের কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন ছবি দেখায়।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, আইন থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২২-২৪ বছর বয়সী নারীদের অর্ধেকের বেশি ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়।

শুধু বাল্যবিবাহ নয়, নানা নির্যাতন ও সহিংসতার খবরও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৯০১ কন্যাশিশু নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪০০ জন, ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১১৭ জনের ওপর। সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র মার্চ মাসে—এ মাসেই ২৪৮ কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার হয়, যাদের মধ্যে ৭৮ জন প্রাণ হারায়।

তবে প্রকাশিত সংখ্যাগুলো পুরো ছবিটা তুলে ধরে না। অনেক নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনা পরিবার ও সমাজের আড়ালে চাপা পড়ে যায়। ভুক্তভোগী কন্যাশিশুরা নীরবে যন্ত্রণা সয়ে যায়, আর সমাজে তৈরি হয় এক অদৃশ্য ভয় ও অবিশ্বাসের দেয়াল।

মীনা দিবস বা কন্যাশিশু দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। শিশুদের প্রতি সহিংসতা রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ, শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং পরিবারে সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি।

কন্যাশিশুরা কেবল ভবিষ্যৎ নয়, তারা বর্তমানের নাগরিকও। তাদের অধিকার সুরক্ষিত হলে তবেই সমাজ সত্যিকার অর্থে মানবিক হয়ে উঠবে।