banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

Daily Archives: January 16, 2026

 

৩৫০ বছর পর নারী অ্যাস্ট্রোনমার রয়্যাল নিযুক্ত

গ্রহ-নক্ষত্রের রহস্যভেদ করতে হলে রাজদরবারে একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী থাকা চাই– এই ভাবনা থেকেই ১৬৭৫ সালে ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় চার্লস শুরু করেছিলেন এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা। জন্ম হয়েছিল ‘অ্যাস্ট্রোনমার রয়্যাল’ নামের এক বিশেষ পদ, যা তিন শতাধিক বছর ধরে ছিলেন শুধু পুরুষদের দখলে। অবশেষে সেই লৌহপ্রাচীর ভেঙে প্রথমবারের মতো ব্রিটিশ রাজপরিবার পেয়েছে এক নারী জ্যোতির্বিদ মিশেল ডাউহার্টিকে।

গত ৩০ জুলাই, ব্রিটিশ রাজা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করেন মিশেলের নিয়োগপত্রে। এতদিন এই মর্যাদাসম্পন্ন পদে ছিলেন প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী স্যার মার্টিন রিস। এখন থেকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন প্রফেসর মিশেল, যিনি শুধু একজন গবেষক নন—একজন পথপ্রদর্শক নারীও।

এই পদ এখন আর শুধুই প্রতীকী নয়, বরং বিজ্ঞান ও মহাকাশসংক্রান্ত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে পরামর্শদানের দায়িত্ব বহন করে। বিশেষত ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জন্য সময় ও মহাকাশ নিয়ে নির্দেশনা দেওয়া, যার ঐতিহাসিক গুরুত্ব আজও অটুট।

শুধু ‘প্রথম নারী’—এই পরিচয়ে তাঁকে আটকে রাখলে তা হবে বড় অবিচার। মিশেল ডাউহার্টি নিজ গুণেই পৌঁছেছেন উচ্চ শিখরে। ২০১৪ সালে তিনি পান ‘রয়্যাল সোসাইটি রিসার্চ প্রফেসরশিপ’—একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ গবেষণা পদ। এর আগে ২০০৭ সালে পেয়েছেন ‘ক্রি মেডেল’, গ্রহের চৌম্বকক্ষেত্র ও সৌর বাতাসের ওপর কাজের জন্য। ২০১৭ সালে রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির স্বর্ণপদক ও ২০১৯ সালে আমেরিকান জিওফিজিক্যাল ইউনিয়নের বিশেষ স্বীকৃতি তাঁর নামকে করেছে আরও উজ্জ্বল।

স্যাটার্ন ও বৃহস্পতি গ্রহ ঘিরে পাঠানো মহাকাশযানের ডেটা বিশ্লেষণে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। বর্তমানে তিনি ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনে স্পেস ফিজিক্সের অধ্যাপক এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান। পাশাপাশি ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির একটি গবেষণা প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যার লক্ষ্য—বৃহস্পতির বরফঘেরা উপগ্রহ গ্যানিমিড, ইউরোপা ও ক্যালিস্টোর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ।

গণমাধ্যমে মিশেল ডাউহার্টি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “এই পদে আমি নিযুক্ত হয়েছি আমার জেন্ডারের কারণে নয়, বরং আমার গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবেই।” তবে তাঁর এই অর্জন যে নারীদের বিজ্ঞানচর্চার অনুপ্রেরণা জোগাবে, সেই আশাও প্রকাশ করেছেন তিনি। বিবিসির ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “যখন কেউ নিজের মতো কাউকে এমন জায়গায় দেখতে পায়, তখন তাদের মনে স্বপ্ন জাগে—তারাও পারবে।”

১৯৬২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার এক শহরে জন্ম মিশেলের। তাঁর মহাকাশের প্রতি ভালোবাসা জন্মায় একদম শৈশবে, যখন তিনি দেখতেন তাঁর বাবা বাড়ির উঠানে ১০ ইঞ্চির একটি টেলিস্কোপ বানাচ্ছেন। মজার বিষয়, তাঁর স্কুলে পদার্থবিজ্ঞান বিষয়টি ছিলই না! তবু তাঁর এবিষয়ে আগ্রহ থামেনি।

তিনি পড়াশোনা করেছেন বর্তমান কোয়াজুলু-নাটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রথমে ফলিত গণিতে বিএসসি, পরে পদার্থবিজ্ঞান এবং শেষে পিএইচডি। কর্মজীবনের শুরু জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোনমিতে। পরে ১৯৯১ সালে তিনি যোগ দেন ইম্পেরিয়াল কলেজে। আর সেখানেই তাঁকে জুপিটার মিশনের জন্য চৌম্বকক্ষেত্রের একটি মডেল তৈরি করতে বলা হয়, যা তাঁর মহাকাশ পদার্থবিদ্যার যাত্রা সূচিত করে।

তিন শতকেরও বেশি সময়ের পুরুষতান্ত্রিক প্রথা ভেঙে মিশেল ডাউহার্টির এই নিযুক্তি শুধু ব্রিটিশ রাজপরিবারের জন্য নয়, বরং সমগ্র বৈজ্ঞানিক জগতের জন্য এক অনন্য মুহূর্ত। তিনি প্রমাণ করেছেন-গ্রহ, নক্ষত্র, সময়, মহাকাশ—এসব বিশাল বিষয়ের বোঝাপড়ার জন্য লিঙ্গ নয়, দরকার অন্তর্দৃষ্টি, মেধা ও অক্লান্ত সাধনা।

 

শিল্পায়নের ধাক্কায় অস্তমিত কুটিরশিল্প, বিপন্ন অসংখ্য গ্রামীণ নারীর জীবিকা

শিল্পায়নের প্রবল স্রোতে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্প। আধুনিকতা ও প্রযুক্তির যুগে একদিকে যেমন জীবন হয়েছে সহজ, অন্যদিকে তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকা গ্রামীণ পেশা ও হস্তশিল্প। এই রূপান্তরের সবচেয়ে বেশি ধাক্কা লাগছে গ্রামীণ নারীদের ওপর, যাঁরা বহু বছর ধরে নিজ বাড়ির উঠোনে বসে তৈরি করতেন বাঁশ, বেত, মাটি, সুতা ও নকশিকাঁথার মতো নানা শিল্পপণ্য।

এই নারীরা সংসার সামলে বিকল্প আয়মাধ্যম হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত ছিলেন কুটিরশিল্পে। বিশেষ করে যে সব পরিবারে পুরুষদের আয় সীমিত বা অনিয়মিত, সেখানে নারীদের এই ঘরোয়া কাজ ছিল সংসার টিকিয়ে রাখার মূল সহায়ক শক্তি। কিন্তু বাজার দখল করে নেওয়া প্লাস্টিক, মেলামাইন বা চাইনিজ মেশিনজাত পণ্যের সহজলভ্যতা এবং কমদামের কারণে এখন এই পণ্যের আর তেমন চাহিদা নেই। ফলে একদিকে যেমন তাদের উপার্জনের পথ সংকুচিত হয়েছে, অন্যদিকে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কুটিরশিল্পে নিয়োজিত নারীরা এখন আর আগের মতো কাজ পান না। অনেকে বাধ্য হয়ে কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। যাঁরা এখনও টিকে থাকার চেষ্টা করছেন, তাঁদের লাভের অঙ্ক এতটাই কম যে তা দিয়ে ন্যূনতম সংসার চালানোও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবও এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

শুধু আর্থিক সংকট নয়, এই শিল্প ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে নারীদের সামাজিক মর্যাদাও কমে যাচ্ছে। আগে যাঁরা কর্মজীবী ছিলেন, পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পারতেন, এখন তাঁরা অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন পুরুষের উপার্জনের ওপর। ফলে আত্মবিশ্বাস কমছে, বাড়ছে পারিবারিক নির্ভরতা ও বৈষম্য।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্থানীয় হস্তশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও আধুনিক বিপণন কৌশল। শুধু সরকার নয়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। গ্রামীণ নারীদের ঘরে বসে উৎপাদিত পণ্যের জন্য ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস তৈরি করা, নতুন নকশা ও উদ্ভাবনী ভাবনার সংযোগ ঘটানো, এবং পণ্যের ব্র্যান্ডিং করে বাজার তৈরি করা গেলে এই শিল্প আবার প্রাণ ফিরে পেতে পারে।

একটি জাতির ঐতিহ্য শুধু তার ভাষা বা পোশাকে নয়, বরং তার হস্তশিল্পেও প্রতিফলিত হয়। কুটিরশিল্প শুধু জীবিকার উৎস নয়, এটি সংস্কৃতি ও নারীর ক্ষমতায়নের প্রতীক। তাই শিল্পায়নের এই গতির মধ্যে ঐতিহ্যকে রক্ষা করাও আমাদের দায়িত্ব—বিশেষ করে সেই নারীদের জন্য, যাঁরা নিঃশব্দে যুগের পর যুগ ধরে গড়ে তুলেছেন আমাদের নিজস্ব শিল্পচর্চার ভিত।