banner

শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

Daily Archives: January 16, 2026

 

অবশেষে পৃথিবীতে ফিরছেন সুনিতা উইলিয়ামস ও তার টীম

দীর্ঘ ১০ মাস মহাকাশে আটকে থাকার পর অবশেষে পৃথিবীতে ফিরছেন মার্কিন নভোচারী সুনিতা উইলিয়ামস ও বুচ উইলমোর। বোয়িংয়ের স্টারলাইনার মহাকাশযানের ত্রুটির কারণে পরিকল্পিত সময়ের আগেই তাঁদের মহাকাশ স্টেশনেই থাকতে হয়েছে। অবশেষে নাসা ও স্পেসএক্সের যৌথ উদ্যোগে তাঁদের ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা নিয়ে ইতিমধ্যেই ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

২০২৩ সালের জুনে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে যান সুনিতা ও বুচ। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল কিছু গবেষণা ও পরীক্ষা চালিয়ে দ্রুত ফিরে আসা। কিন্তু স্টারলাইনার মহাকাশযানে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সেটিকে খালি অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হয়, আর দুই নভোচারী সেখানেই আটকে পড়েন। তাঁদের ফিরিয়ে আনার জন্য নাসা শুরু থেকেই চেষ্টা করলেও বিষয়টি রাজনৈতিক রূপ নেয়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পরিবর্তনের পর।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এই বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। ট্রাম্প প্রশাসন দ্রুত তাঁদের ফিরিয়ে আনার জন্য চাপ দিতে থাকে। স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কও এই বিষয়ে সরব হন এবং দাবি করেন, আগের বাইডেন প্রশাসনের গাফিলতির কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এরপর নাসা স্পেসএক্সের ক্রু ড্রাগন মহাকাশযানের মাধ্যমে তাঁদের ফেরানোর উদ্যোগ নেয়। গত শুক্রবার নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে ক্রু ড্রাগন সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয় এবং ২৯ ঘণ্টা পর এটি মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছে। নতুন করে চার নভোচারী সেখানে যোগ দেন, যাঁরা আগামী ছয় মাস মহাকাশ স্টেশনে থাকবেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন নাসার অ্যান ম্যাকক্লেইন, নিকোল আয়ার্স, জাপানের তাকুয়া অনিশি ও রাশিয়ার কিরিল পেসকভ।

এই অভিযানের মাধ্যমে শুধু সুনিতা ও বুচই নয়, তাঁদের সঙ্গে আরও দুজন নভোচারী পৃথিবীতে ফিরছেন—নাসার নিক হেগ এবং রাশিয়ার আলেকসান্দর গরবুনোভ। গত বছর সেপ্টেম্বরে এই দুজন মহাকাশ স্টেশনে এসেছিলেন এবং তাঁদের ফেরার জন্য আগে থেকেই স্পেসএক্সের ড্রাগন ক্রু ক্যাপসুলে দুটি ফাঁকা আসন রাখা হয়েছিল।

সোমবার থেকে সুনিতাদের ফেরার প্রস্তুতি শুরু হয়। মহাকাশযানের দরজা বন্ধ করা হয়েছে এবং ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে আলাদা হওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে নির্ধারিত সময়েই তাঁরা পৃথিবীতে ফিরবেন। তবে আবহাওয়া, মহাকাশযানের অবস্থা এবং সমুদ্রের পরিস্থিতি তাঁদের ফেরার পথে প্রভাব ফেলতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
পৃথিবীতে ফেরার পর নভোচারীদের বেশ কিছু স্বাস্থ্য পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। দীর্ঘদিন মহাকাশে শূন্য মাধ্যাকর্ষণে থাকার কারণে শরীরে বিভিন্ন পরিবর্তন আসে, যা পুনরায় পৃথিবীর পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য বিশেষ চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে সুনিতা উইলিয়ামস ও তাঁর সহকর্মীরা ঘরে ফিরছেন। সারা বিশ্ব তাঁদের এই সফল প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছে।

 

এপ্রিল মাসে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩৬২টি ঘটনা

২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩৬২টি ঘটনা ঘটেছে, যা মার্চ মাসের তুলনায় ৬৬টি কম। তবে সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি—ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, হত্যা ও আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ ঘটনাগুলো এখনও সমাজে উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়ে গেছে।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) তাদের মাসিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে জানায়, এপ্রিল মাসে ৯৩টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১২ জন শিশু, ৪৩ জন কিশোরী এবং ৮ জন প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের সংখ্যা ছিল ২৫, যার শিকার হয়েছেন ৪ শিশু, ৮ কিশোরী ও ৯ নারী। এছাড়াও ৪ জন নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

ধর্ষণের চেষ্টা হয়েছে ৩৩টি, যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ২৬ জন, আর শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৪৭টি। এসিড হামলায় আহত হয়েছেন একজন নারী।

আত্মহত্যার দিক থেকেও মাসটি ছিল হতাশাজনক—১২ কিশোরী ও ২৩ নারীসহ ৩৫ জন আত্মহত্যা করেছেন। অপহরণের ঘটনা ১১টি (৪ শিশু ও ৭ কিশোরী), আর নিখোঁজ রয়েছেন ৫ জন (২ শিশু, ২ কিশোরী ও ১ নারী)। অস্বাভাবিক মৃত্যু ও হত্যা মিলিয়ে নিহত হয়েছেন ৬৯ জন নারী, কিশোরী ও শিশু; যাদের মধ্যে ১৮ জন শিশু ও কিশোরী।

এমএসএফের প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, অনেক ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা স্থানীয় সালিশে আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে, যা আইনের দৃষ্টিতে বেআইনি। এই ধরনের সালিশি বিচার বিচারব্যবস্থার প্রতি চরম অবহেলার ইঙ্গিত দেয়।

আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

 

শিশুদের শৈশব হোক নিরাপদ, গৃহশ্রমিকের শ্রম হোক মর্যাদাপূর্ণ

(শ্রম সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ)বাংলাদেশের শ্রমজগতে এক নতুন আলো ফেলেছে শ্রম সংস্কার কমিশনের সর্বশেষ প্রতিবেদন। শিশুদের নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা এবং গৃহ ও সৌন্দর্য সেবাখাতে কর্মরত শ্রমিকদের অধিকারের স্বীকৃতি দিতে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে কমিশন।

কমিশনের সর্বশেষ প্রতিবেদনে গৃহকর্মে নিয়োজিত ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের নিয়োগ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করার জন্য একটি কঠোর আইন প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এবং গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণনীতি ২০১৫ অনুযায়ী এমন নিয়োগ ইতোমধ্যেই অবৈধ হলেও, আইন প্রয়োগের দুর্বলতায় তা নিরবিচারে চলমান।
কমিশন মনে করে, ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণনীতি ২০১৫’-এর যথাযথ প্রয়োগ না হলে শিশুদের অধিকার সুরক্ষিত হবে না।

গৃহশ্রমিকদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিশন। বলা হয়েছে, নিয়োগের ধরন যাই হোক—আবাসিক, অনাবাসিক, খণ্ডকালীন কিংবা স্থায়ী—সবার জন্য নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, ন্যায্য বেতন, ছুটি, নিরাপদ বাসস্থান ও খাবারের নিশ্চয়তা থাকতে হবে। এ জন্য বাধ্যতামূলক কর্মচুক্তি চালুর পরামর্শ দিয়েছে কমিশন।

এছাড়া অভিযোগ দায়েরের পদ্ধতি, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি, এবং সংগঠনের অধিকার নিশ্চিত করাও এই প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ দিক। কমিশন বলেছে, গৃহশ্রমিকদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রকে আরও সক্রিয় এবং দায়িত্বশীল হতে হবে।

শ্রম সংস্কার কমিশনের দৃষ্টিতে সৌন্দর্যসেবাখাতও শ্রমের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বিউটি পারলারে কর্মরত নারীদের স্বাস্থ্যসেবা, ডে কেয়ার সুবিধা এবং ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিতে পৃথক বোর্ড গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। তাঁদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি এবং সামাজিক মর্যাদা রক্ষার বিষয়েও জোর দিয়েছে কমিশন।

পারলার কর্মীদের নিরাপত্তা বিশেষ করে রাতের সময় বাড়ি ফেরা, কর্মস্থলে হয়রানি রোধ, ও কমিউনিটিভিত্তিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টিও উঠে এসেছে সুপারিশে। বলা হয়েছে, এই শ্রমিকরা শুধুই সেবিকা নন তাঁরা অর্থনীতির নীরব যোদ্ধা, যাঁদের অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধ জরুরি।

শ্রম সংস্কার কমিশনের এই প্রতিবেদন শুধু আইনি সংশোধনের আহ্বান নয়—এ এক নৈতিক প্রত্যয়: যে শিশুদের খেলাধুলার সময়, তারা যেন নিপীড়নের শিকার না হয়; যে নারীরা অন্যের ঘর সাজায়, তাঁরাও যেন নিজের জীবনে সম্মান ও নিরাপত্তা পান।

তথ্যসুত্র -প্রথম আলো

 

ডা. সায়েবা আক্তার: মাতৃস্বাস্থ্যের নীরব পথিকৃৎ

 

ডা. সায়েবা আক্তার একজন বিশিষ্ট বাংলাদেশি স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, যিনি মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়নে অভূতপূর্ব অবদান রেখেছেন। তার উদ্ভাবন ‘সায়েবা’স মেথড’ বিশ্বের মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, তিনি ব্যক্তি হিসেবে নিজে থেকে গেলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে।

১৯৫৩ সালে চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করা ডা. সায়েবা ছোটবেলা থেকেই ছিলেন বেশ মেধাবী। তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যায় উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি গবেষণা ও চিকিৎসা সেবায় অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দেন।

উদ্ভাবন: ‘সায়েবা’স মেথড’
২০০০ সালে, প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণ (Postpartum Hemorrhage – PPH) প্রতিরোধে তিনি ‘ইউটেরিন বেলুন ট্যাম্পোনেড’ (UBT) নামক একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন, যা ‘সায়েবা’স মেথড’ নামে পরিচিত। উন্নত দেশে এই সমস্যার চিকিৎসা ব্যয়বহুল হলেও, ডা. সায়েবা স্বল্পমূল্যের এই পদ্ধতি আবিষ্কার করেন, যা প্লাস্টিকের ক্যাথেটারের মাধ্যমে জরায়ুর ভেতরে বেলুন তৈরি করে রক্তক্ষরণ বন্ধ করে। তার উদ্ভাবিত এই পদ্ধতি উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রচুর গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে এবং হাজারো মায়ের জীবন বাঁচিয়েছে।

ডা.সায়েবা আক্তার ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে গাইনিকোলজি বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ফিস্টুলা রোগীদের চিকিৎসায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। সুবিধাবঞ্চিত নারীদের চিকিৎসা দিতে তিনি নিরলস পরিশ্রম করেছেন এবং তাদের পুনর্বাসনের জন্য কাজ করেছেন।
এছাড়াও, তিনি সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের শিক্ষায় সহায়তা করতে ঢাকা ও গাইবান্ধায় দুটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। তার উদ্যোগে অনেক দরিদ্র মেয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছে এবং নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২০ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদক প্রদান করে। এছাড়া, তিনি ২০২৪ সালে বাংলা একাডেমি সাম্মানিক ফেলোশিপ অর্জন করেন।
তবে, তার কাজ আন্তর্জাতিকভাবে বিপুল স্বীকৃতি পেলেও, ব্যক্তি হিসেবে তিনি সেই মর্যাদার আসনে আসতে পারেননি,থেকে গেলেন জনমনের আড়ালে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউনিসেফসহ অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা তার উদ্ভাবিত পদ্ধতির প্রশংসা করলেও,ব্যক্তি হিসেবে কাজের জন্য পাননি বিশেষ কোন বিশ্বস্বীকৃতি।
প্রায়শই দেখা যায়, উন্নয়নশীল দেশের গবেষক ও বিজ্ঞানীদের কাজ বৈশ্বিক স্বীকৃতি পেলেও, তারা ব্যক্তিগতভাবে উপেক্ষিত থাকেন। তার উদ্ভাবন নোবেল পুরস্কার কিংবা র‍্যামোন ম্যাগসেসে পুরস্কারের যোগ্য হলেও, তিনি এখনো সে পর্যায়ের আন্তর্জাতিক সম্মাননা পাননি।

ডা. সায়েবা আক্তার কেবল একজন চিকিৎসক নন, তিনি একজন পথিকৃৎ, মানবতার সেবক। তার উদ্ভাবন বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মায়ের জীবন বাঁচিয়েছে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আসুক বা না আসুক, তার কাজের মাধ্যমে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ভবিষ্যতে বিশ্ব তাকে আরও বড় পরিসরে সম্মানিত করবে, এমনটাই প্রত্যাশা।