banner

শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

Daily Archives: January 16, 2026

 

দেশে দেশে ঈদ উদযাপন

 

ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা, ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটো ধর্মীয় উৎসব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিম সম্প্রদায় ঈদ উদযাপন করে নিজেদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় অভ্যস্ততা অনুযায়ী। যদিও ঈদে কিছু মৌলিক আচার এবং প্রথা পৃথিবীজুড়ে এক থাকে, তবে প্রতিটি দেশের ঈদ উদযাপনের ধরন ও আয়োজন আলাদা। ঈদ সাধারণত আনন্দ, কৃতজ্ঞতা এবং পরিবারের সাথে একত্রিত হওয়ার দিন।
চলুন, জেনে নেওয়া যাক বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে ঈদ কেমনভাবে উদযাপিত হয়।

বাংলাদেশে ঈদ
বাংলাদেশে ঈদ বিশাল উৎসব হিসেবে উদযাপিত হয়। ঈদের সকালে সবাই নতুন পোশাক পরে ঈদগাহে ঈদের নামাজ পড়তে যান। পরিবারের সদস্যরা একে অপরকে কোলাকুলি করে এবং ‘ঈদ মোবারক’ বলে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এ দিনে বাঙালি পরিবারের বাড়িতে নানা ধরণের মজাদার খাবার প্রস্তুত হয়, যার মধ্যে সেমাই, কোরমা, বিরিয়ানি, খিচুড়ি ইত্যাদি জনপ্রিয়। ছোটরা ঈদ সালামি পেয়ে থাকে এবং ঈদের দিনটি পারিবারিক মিলনমেলায় পরিণত হয়।

সৌদি আরবে ঈদ
সৌদি আরবেও ঈদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। সেখানে ঈদের দিন বাড়ি বাড়ি উপহার পাঠানো এবং গরীবদের সহায়তা করা একটি প্রচলিত রীতি। মুসলিমরা সকালে ঈদের নামাজ পড়েন এবং তার পর নানা ধরণের মিষ্টান্ন ও খাবারের আয়োজন হয়। বিশেষ করে, মুগলগাল, ঘুরাইবাহ ও জেরিশ খেতে পছন্দ করেন তারা। সৌদিরা মিষ্টি খাবারের জন্য ‘মিষ্টি ঈদ’ হিসেবেও পরিচিত।

ভারত ও পাকিস্তানে ঈদ
ভারত এবং পাকিস্তানে ঈদ উদযাপনের আচার বাংলাদেশি সংস্কৃতির সাথে অনেকটা মেলে। এখানে সাধারণত ঈদের নামাজের পর পরিবারের সঙ্গে উপহার বিনিময়, মিষ্টি খাবার খাওয়া এবং ঈদ সালামি দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। খাবারের মধ্যে মাংস, পোলাও, রুটি এবং পরোটা থাকে। এই দুই দেশেই ঈদের দিন সরকারি ছুটি থাকে, এবং অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে।

তুরস্কে ঈদ
তুরস্কে ঈদ ‘সেকের বায়রাম’ নামে পরিচিত, যার অর্থ ‘চিনির উৎসব’। এখানে ঈদ সাধারণত পরিবারের মধ্যে সমবেত হয়ে উদযাপিত হয়। তুর্কিরা একে অপরকে ‘বায়রামিনিজ মুবারেক ওলসুন’ বা ‘বায়রামিনিজ কুতলু ওলসুন’ বলে শুভেচ্ছা জানায়। খাবারের মধ্যে মাংস, পোলাও এবং পিঠা প্রধান, এবং সারা দেশজুড়ে অনেক ঐতিহ্যগত আনন্দের আয়োজন থাকে।

নাইজেরিয়ায় ঈদ
নাইজেরিয়ায় ঈদ অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়। ঈদের দিন সবাই সকাল বেলা মসজিদে জামায়াতের মাধ্যমে ঈদের নামাজ আদায় করে। নাইজেরিয়ার মুসলিমরা প্রায়ই একে অপরকে উপহার দেয় এবং ঐতিহ্যবাহী খাবার যেমন ‘জেলা ফ্রাই রাইস’, ‘মাংসের শুয়া’, এবং ‘পটেটো স্যালাড’ খায়। এখানে স্থানীয় ভাষায় ‘ইদুল ফিতর’ বলা হয় এবং দিনটি সপরিবারে ঘর সাজানো আর উৎসবমুখর পরিবেশে পালন করা হয়।

মিশরে ঈদ
মিশরের ঈদ উদযাপনটি মূলত পরিবার ও বন্ধুদের সাথে একত্রিত হয়ে খাবার খেয়ে এবং আনন্দ উদযাপন করে। তারা সাধারণত ‘ফাত্তার’ নামক একটি বিশেষ খাবার তৈরি করে, যা ভাত, মাংস এবং রুটি দিয়ে প্রস্তুত করা হয়। মিশরে ‘কুনাফা’ নামক একটি মিষ্টান্ন খাওয়া হয় যা অত্যন্ত জনপ্রিয়। শিশুদের নতুন জামাকাপড় দেওয়া এবং উপহার দেওয়া এই দেশে একটি প্রচলিত রীতি।

ইন্দোনেশিয়ায় ঈদ
ইন্দোনেশিয়ায় ঈদ ‘লেবারান’ নামে পরিচিত। এখানে সবাই ঈদের আগের দিনগুলিতে ঈদের প্রস্তুতিতে নিতে ব্যস্ত থাকে, আর লোকজন শপিং মলগুলিতে ভিড় করে। ইন্দোনেশিয়ার বিশেষ খাবারের মধ্যে ‘ল্যাপিস লেজিট’ কেক এবং ‘এস টেম্বাক’ মাংস থাকে। ঈদের দিন, পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হয়ে উপহার বিনিময় করে, দয়া ও সহানুভূতি পরিপূর্ণ পরিবেশে দিনটি উদযাপন করে।

আরব আমিরাতে ঈদ
আরব আমিরাতে ঈদ অনেকটাই সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে পূর্ণ। ‘ওউজি’ নামে একটি বিশেষ খাবার এ দিনে জনপ্রিয়, যা ছাগলের মাংস ও ভাতের মিশ্রণ দিয়ে তৈরি হয়। অন্যান্য খাবারের মধ্যে পাইন বাদামও রয়েছে। এছাড়াও, আমিরাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ম্যাজিক শো সহ নানা ধরনের বিনোদনমূলক আয়োজন করা হয়।

মালয়েশিয়ায় ঈদ
মালয়েশিয়ায় ঈদ উদযাপনের আগের দিনটি বেশ ব্যস্ত থাকে। পরিবারগুলো ঐতিহ্যবাহী খাবার যেমন কেটুপাট, কুইহ রায়া, লেমাং, এবং রেন্ডিং প্রস্তুত করে। ঈদে ‘উন্মুক্ত ঘর’ নামক একটি ঐতিহ্য প্রচলিত যেখানে সবাই একসাথে খাওয়া-দাওয়া করে এবং আনন্দে মেতে ওঠে।

যুক্তরাষ্ট্রে ঈদ
যুক্তরাষ্ট্রে, যেখানে বহু সংস্কৃতি মিশ্রিত, মুসলিমরা ঈদ উদযাপন করেন মসজিদে নামাজ পড়ে এবং এরপর পরিবার এবং বন্ধুদের সাথে উপহার বিনিময় করে। এখানে অনেক মুসলিম কমিউনিটি সার্ভিস প্রকল্পে অংশ নেয় এবং গরিবদের সাহায্য করে। এই দেশের বড় শহরগুলোতে ঈদ উদযাপন ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, যেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খাবারের স্টল এবং শিশুদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা থাকে।

আইসল্যান্ডে ঈদ
আইসল্যান্ডে মুসলমানরা একটি ছোট সম্প্রদায় হলেও ঈদ উদযাপনটা বেশ আনন্দমুখর হয়। এখানে মসজিদে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয় এবং পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হয়ে বিভিন্ন খাবার উপভোগ করে। শিশুরা নতুন পোশাক পরিধান করে এবং উপহার বিনিময় করে।

ঈদ উদযাপন পৃথিবীজুড়ে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন আঙ্গিকে অনুষ্ঠিত হয়।
ঈদ আমাদের জন্য শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি একে অপরের প্রতি ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং বন্ধন শক্তিশালী করার একটি দিন। আমরা যেখানে থাকি না কেন, ঈদ আমাদের মধ্যে ঐক্য এবং সমবেত আনন্দের এক অনবদ্য অনুভূতি সৃষ্টি করে।
সবার ঈদ আনন্দময় ও সফল হোক, ঈদ মোবারক!

 

ঈদ তো সবার জন্য!

 

ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই খুশি। এক মাস রোজার পর আসে পবিত্র ঈদুল ফিতর, যে দিনটিতে সবাই নতুন জামা পরে, সুস্বাদু খাবার খায়, পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেয়। কিন্তু সমাজের এক শ্রেণির মানুষের জন্য ঈদ যেন আরেক রকম কষ্টের নাম। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীরা, যারা দিনরাত পরিশ্রম করেও নিজেদের আর পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে পারেন না। তাদের কাছে ঈদ মানেই নতুন দুশ্চিন্তা—কীভাবে একটু ভালো খাবারের ব্যবস্থা করবেন, কীভাবে ছেলেমেয়েদের ছোট্ট একটা চাহিদা পূরণ করবেন।

“সারাদিন কষ্ট করি, তবু ঈদে নতুন শাড়ি জোটে না”
কল্পিত চরিত্র: সন্ধ্যা বেগম(পোশাক কারখানার কর্মী)
সন্ধ্যা বেগম শহরের এক পোশাক কারখানায় কাজ করেন। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে ছোট ছেলেকে পাশের বাসায় রেখে কাজে যান, ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়। সামান্য বেতনের এই চাকরিটাই তার সংসারের একমাত্র ভরসা। ঈদ আসছে, সবাই কেনাকাটায় ব্যস্ত, অথচ সন্ধ্যা জানেন, এবারও তার নিজের জন্য নতুন শাড়ি কেনার সামর্থ্য হবে না।
‘সারাদিন কষ্ট করি, কিন্তু নিজের জন্য কিছু রাখতে পারি না। মাইয়ারে একটা জামা কিনে দিছি, এইটাই শান্তি। নিজের কথা ভাবার সময় কই!’—বলতে বলতে তার চোখে পানি এসে যায়।

“ঈদে ছেলেটারে ভালো কিছু খাওয়াইতে পারমু কিনা জানি না”
কল্পিত চরিত্র: রোকেয়া খাতুন (গৃহপরিচারিকা)
রোকেয়া খাতুন মানুষের বাসায় কাজ করেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রান্না-বান্না, কাপড় ধোয়া, ঘর মোছা—এভাবেই তার দিন কাটে। তিনি জানেন, যাদের বাসায় কাজ করেন, তারা ঈদের দিন ভালো খাবার খাবেন, নতুন জামা পরবেন। কিন্তু তার নিজের ছেলের জন্য ভালো কিছু রান্না করতে পারবেন কি না, সেটা নিয়েই তার চিন্তা।
‘ঈদের দিন আমার ছেলেটা আশা করে ভালো কিছু খাবো, কিন্তু কয়দিন ধইরা হিসাব কইরা দেখতাছি, পারমু কিনা জানি না। নিজের জন্য তো ভাবি না, শুধু ওর মুখের দিকে তাকাই।’

“ঘরের চাল ঠিক করার টাকা নাই, ঈদ কেমনে করমু?”
কল্পিত চরিত্র: শাহিদা বেগম (ইটভাটার শ্রমিক)
শাহিদা বেগম কাজ করেন ইটভাটায়। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে টাকা পান, তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলে। তার ঘরের চাল ফুটো হয়ে গেছে, বৃষ্টি হলেই ভিজতে হয়। ঈদের দিন নতুন কাপড় কেনার স্বপ্ন তার নেই, বরং চিন্তা একটাই—ঘরের চালটা মেরামত করতে পারবেন কি না।
‘আমাগো ঘরে হুরকা বাতাস আইলেই পানি পড়ে, এইটা ঠিক করার টাকা জমাইতে পারি না। আবার ঈদ নিয়া ভাবমু কেমনে! ঈদ তো কেবল পয়সাওয়ালাদের জন্য।’

আমরা কি পারি না তাদের মুখে হাসি ফোটাতে?
ঈদ মানে শুধু নিজের আনন্দ না, বরং সবার মাঝে সেই আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। কিন্তু আমাদের আশেপাশের এসব সুবিধা বঞ্চিত নারীরা বছরের পর বছর পরিশ্রম করেও ঈদের দিনে একটু সুখের মুখ দেখেন না। তাদের কাছে ঈদ আসে, কিন্তু আনন্দ নিয়ে আসে না।
আমরা যদি একটু সহমর্মিতা দেখাই, তবে তাদের ঈদটাও আনন্দময় হতে পারে। কেউ যদি একজোড়া নতুন জামা কিনে দেয়, কেউ যদি এক প্লেট ভালো খাবার ভাগ করে নেয়, তবেই হয়তো তাদের মুখে একটু হাসি ফুটবে। ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণ হবে, যখন এই শ্রমজীবী নারীরাও বলবেন—‘আমাগোও ঈদ আছে!’