banner

বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

Daily Archives: January 16, 2026

 

খেলনার বদলে শিশুর মোবাইল চাই!


নজরুল ইসলাম টিপু


শিশুর সারাদিনের কর্মব্যস্ততার প্রতি নজর রাখুন। দেখবেন সে পুরোদিন কাজ করে চলেছে। এটা হাত থেকে খসিয়ে নিলেন তো অন্যতা হাতে নিচ্ছে! আশ্চর্য হলেও সত্যি যে, একজন সুস্থ-সামর্থ্য মানুষ একটি প্রাণ চঞ্চল শিশুর মত অনবরত কাজ করতে পারবে না…………
মানব শিশু দুনিয়াতে আসার কিছুদিন পরেই সে বুঝতে শিখে যে, তাকে সর্বত্র অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তখন সে খুশিতে আপ্লুত হয়। একপর্যায়ে দেখে, খাদ্য ও খেলনা সামগ্রীর ক্ষেত্রে সে অগ্রাধিকার পেলেও, কিছু ব্যাপারে তাকে সে অধিকার দেওয়া হয় না। বড়দের টস-লাইট, মোবাইল, ছুরি, দা, বটি ধরতে গেলে তাকে বারণ করা হয়। অথচ এটা ধরে দেখা ও কাজে লাগাতে তারও মন চায়। এটা আদায় করতে পরিস্থিতি অনুসারে সে দুটি পদ্ধতি গ্রহণ করতে চায়। একটি হল জেদ করা অন্যটি হল আবদার করা। জেদের বিষয়টিতে পরে আসা হবে। তবে বেশীর ভাগ শিশুই কিন্তু আবদার করে।
শিশুর দুটি পদ্ধতির মধ্যে, আবদার করার পদ্ধতিটি হল মানবিয় পদ্ধতি। এটা শিশু জীবনের বড় ইতিবাচক দিক। সে ভালবাসা অর্জন করেই জিনিষটি হস্তগত করতে চায়। তখন সে বলতে থাকবে, “আমি তোমাদের ছোট না! তুমি আমার আপু না”! ইত্যাদি। এখানে সে স্বার্থ অর্জনের জন্য ভালবাসাকেই পূঁজি বানাতে চায়। দেখা যায় বড় জনেরা এই ধরনের আদরণীয় আবদারে ছাড় দিয়ে জিনিষটা কিছুক্ষণের জন্য হলেও তাকে দেয়। এখান থেকেই শুরু হয় শিশুর প্রথম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ। সে বুদ্ধি খাটিয়ে জিনিষ হস্তগত করার মানবিয় একটি বৈশিষ্ট্য অর্জন করল।
কিছুদিনের মধ্যেই শিশু একটি পরিবর্তন বুঝতে পারে। সে দেখতে পায়, সর্বত্র ছোট বলে বাহানা দিলেও, কিছু জিনিষ হস্তগত হয়না! সে সব জিনিস শুধুমাত্র বড়দের জন্যই নির্ধারিত। সেই পরিস্থিতিতে শিশু ভিন্নভাবে ভাবতে শিখে। তখন সে বড় হবার ভাব নেয় এবং বড়দের আচরণ গুলো অবিকল অনুসরণ, অনুকরণ করে। বড়দের জুতো, স্যান্ডেল, চশমা, বস্ত্র পরিধানের কসরত করে। এটার মাধ্যমে সে বুঝাতে চেষ্টা করে যে, সে এখন বড় হচ্ছে। অতঃপর সে তার কাঙ্ক্ষিত জিনিষে হাত দিতে চাইবে। যখন বলা হবে তুমি এখনও ছোট, বড় হলেই এসব ধরা যাবে। শিশু তৎক্ষণাৎ বলে দিবে আমিতো বড় হয়েছি। ঐ যে স্যান্ডেল পড়া হল, চশমা লাগানো হল এসব তো বড় হবারই আলামত। শিশুর এই চরিত্রও মানবীয় গুণাবলীর অন্তর্ভুক্ত।
আমি-আপনি হয়ত এসব কে তামাশা মনে করছি। সে কিন্তু প্রতিটা ধাপকে খুব সিরিয়াসলি নিয়েই অগ্রসর হচ্ছে। তার মনের আয়নায় ধাপে ধাপে বহু স্বপ্ন গেঁথে পথ পরিক্রমায় ব্যস্ত। কোন একদিন দিয়াশলাই দিয়ে, মোমবাতি ধরানো হয়েছিল। এই স্মৃতিই তাকে পেরেশান করে ছাড়ছে। সে দিয়াশলাই আর মোমবাতির সন্ধানেই ব্যস্ত। সে তার মনের কথা বড়দের বুঝাতে পারছে না। এজন্য অগণিত চিন্তা ও কাজ তাকে সারাদিন কর্মব্যস্ত করে রাখছে। পাখির প্রয়োজনীয় লাফালাফি দেখে মানুষ নাচ বিবেচনা করে আনন্দ পায়। সেভাবে শিশুর এই সমস্ত অপ্রয়োজনীয় কাজকে খেলনা মনে করে; মা-বাবা, দাদা-দাদী আনন্দ পায়। কিন্তু চিন্তাশীল মানুষ দেখতে পায়, শিশু সারাদিন ভেবে চলেছে, কিভাবে নিজেকে বড় হিসেবে জাহির করা যায়, কিভাবে বড় হওয়া যায়।
শিশুর সারাদিনের কর্মব্যস্ততার প্রতি নজর রাখুন। দেখবেন সে পুরোদিন কাজ করে চলেছে। এটা হাত থেকে খসিয়ে নিলেন তো অন্যতা হাতে নিচ্ছে! আশ্চর্য হলেও সত্যি যে, একজন সুস্থ-সামর্থ্য মানুষ একটি প্রাণ চঞ্চল শিশুর মত অনবরত কাজ করতে পারবে না! তার অবিরাম কাজের প্রেরণা, নতুন নতুন ইচ্ছা তাকে বড়দের হয়ে কাজ করতে আরো উদ্যমী করে তুলে। তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে, যখনই তার কাঙ্ক্ষিত জিনিষ পেতে বাধা প্রাপ্ত হবে তখনই সে উত্তেজিত ও ক্ষিপ্ত হবে। একটি শিশুর উত্তেজনা ও ক্ষিপ্রতা দুটোই উপরোক্ত জিনিষের আবর্তে ঘুরপাক খেতে থাকে। বাচ্চা দিনে দিনে উত্তেজিত হতে থাকলে এক পর্যায়ে এটা তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। তখন সে জানতে শিখে, আবদার করলে যা পাওয়া যায় না; রুক্ষ ও বাজে আচরণ করলে তা সহজে পাওয়া যায়। শিশুর এই চরিত্র পিতা-মাতা কিংবা তার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে।
শিশুদের সঙ্গ দিলে রুক্ষ খাসিয়ত কম হয় কিংবা হয়ই না। অনেক শিশু এমনিতেই শান্ত থাকে, কর্মে দক্ষ হয়; যাদের ঘরে বেকার দাদা-দাদী থাকে! তারা শিশুদের অদৃশ্যমান অভাব পূরণে অনেক কাজে আসে। যদিও অধুনা অনেক পিতা-মাতা বুঝতে পারে না দাদা-দাদীর উপকারিতা কি? ওদিকে শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য অকাতরে টাকা খরচ করে নিজেরা সুখে থাকার জন্য। শিশুদের এই চিন্তার খোরাক জোগাতে কোম্পানিগুলো, শিশুদের চেনা-জানা জিনিষের বাহারি পণ্য নিয়ে বাজার সয়লাব করে দিচ্ছে। সে সব বস্তুর অনুকরণে প্লাস্টিক সামগ্রীর বিশাল খেলনা বাজার আজ দুনিয়া জোড়া বিস্তৃত হচ্ছে।
অনেক পিতা-মাতা হয়ত আশা করে এসব খেলার সামগ্রী সন্তানের মনোবৃত্তি গঠনে সহায়ক হবে। শিশুর চাহিদা সৃষ্টি কিংবা আবদার হবার আগেই তাদের খেলনা সামগ্রী কিনে দিচ্ছে। শিশুর আগ্রহ আছে কিনা সে বিবেচনাও তারা করছে না। কিন্তু দেখা গেছে প্রচুর খেলার সামগ্রীর বিপরীতে শিশু একটি মোবাইলের জন্য অনেক বেশী আগ্রহী হচ্ছে। এটা জন্য জেদ করা হচ্ছে, সাময়িক সমস্যা দূর করার নিমিত্তে মা-বাবা তার ইচ্ছা পূরণ করছে। এটাতেই শিশুর অভ্যাস বদলাচ্ছে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে জেদি শিশু পিতা-মাতার ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই হয়। শিশুরা বড়দের অনুসরণ করে দেখতে পায়, সবাই মোবাইল নিয়েই বেশী আগ্রহী, তাই তারাও সেটা হাতে নিয়ে দেখতে ও খেলতে চায়! তাকে মূল্যায়ন না করলেই বিপত্তির শুরু হয়।
শিশুকে যদি যথাযথ সঙ্গ দেওয়া হয় এবং সে দেখে, তার পিতা-মাতা, ভাই-বোন, দাদা-দাদী, দা, বটি, থালা-বাসন, মাস্তুল, পেরেক, করাত, পানের বাটি, হামান-দিস্তা দিয়ে একটা সময় পার করছে, তাহলে সেও সে সব সামগ্রীর প্রতি আকৃষ্ট হবে। দাদা-দাদীর সঙ্গ পেলে, শিশুরা কিছুটা হলেও ভিন্ন মাত্রার সঙ্গী পেত। যদিও বর্তমানের গৃহীনীরা দাদা-দাদীকে উপদ্রব কিংবা ঘরের চাকরানীর বিকল্প মনে করে। তাই দিনের একটি বিরাট সময় শিশুরা সঙ্গ বিহীন থাকে। আমরা যেভাবে লুডুর মত তুচ্ছ খেলা খেলতেও দু’জনের সান্নিধ্য চাই, সেভাবে শিশুরাও বড়দের সঙ্গ এবং জীবনোপকরণ দুটোকে একসাথে পেতে আশা করে। এর একটির অভাবেই শিশু একমুখো, জেদি ও বদমেজাজি হয়ে বেড়ে উঠবে। এটা প্রতিকারে তাকে যত টাকার খেলনাই সরবরাহ হউক না কেন, কোন কাজেই আসবেনা।

 

শিশুর পুষ্টিতে বুকের দুধের বিকল্প নেই


নারী সংবাদ


আজকের শিশুই আগামীর ভবিষ্যত। সুতরাং সুন্দর আগামীর জন্য প্রতিটি শিশুকে হড়ে তুলতে হবে স্বযতেœ। জন্মের পর থেকে বেড়ে ওঠার জন্য প্রতিটি শিশুকে দিতে হবে সুষম খাদ্য। তবে বিশেষ করে জন্মের পর পরই প্রতিটি শিশুর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মায়ের বুকের দুধ। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় আজ অনেকেই সমাজের নারীরাও ব্যস্ত। তাদেরকেও অনেককেই অফিস কিংবা কর্ম ক্ষেত্রে যেতে হয়। যে কারণে অনেক মা-ই সন্তানকে ঠিক মত বুকের দুধ দিতে পারেন না, নির্ভর করতে হয় বাজারে পাওয়া বিভিন্ন কৌটা কিংবা প্যাকেট দধের ওপড়। তাদেরই একজন নাইমা খাতুন। একটি বেসরকারী অফিসের কর্মকর্তা। দিনের বেশিরভাগ সময় অফিসে থাকেন তাই ‘পুষ্টি নিশ্চিত’ করতে পাঁচ মাসের ছেলেকে গুঁড়োদুধ খাওয়ান নাজমা। বাচ্চাকে যে ব্র্যান্ডের দুধ তিনি খাওয়ান, সেটির নাম নেসলে ল্যাক্টোজেন-১। এর প্যাকেটের গায়ে লেখা আছে ‘জন্ম থেকে দেয়া যায়’! প্লাস্টিকের যে ফিডারে করে নাইমার বাচ্চা দুধ খায়- সেটির গায়ে বড় করে লেখা ‘ফর এ্যাঞ্জেল’ (দেবশিশুর জন্য)! এমন চটকদার বিজ্ঞাপন এবং ভুল তথ্যে বিভ্রান্ত হয়ে নাজমার মতো অনেক অভিভাবকই তাদের আদরের সন্তানদের মুখে তুলে দিচ্ছেন বিকল্প শিশুখাদ্য। বাড়ছে গুঁড়োদুধ খাওয়া শিশুর সংখ্যা। অথচ এই শিশুরা ভুগছে অপুষ্টিতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমছে তাদের। আর অভিভাবকদের অসচেতনতার সুযোগ নিয়ে এ সংক্রান্ত আইনকেও ‘বুড়ো আঙ্গুল’ দেখাচ্ছে সংশ্লিষ্টরা।
মায়ের দুধের বিকল্প হিসেবে শিশুদের জন্য কৌটা বা প্যাকেটজাত গুঁড়োদুধ, অন্যান্য খাদ্য ও সরঞ্জামাদির প্রলুব্ধকর বিজ্ঞাপন বা প্রচারের ক্ষেত্রে আইনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে । ২০১৩ সালের এ সংক্রান্ত আইনে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, প্যাকেট ও কৌটাজাত পণ্যের গায়ে লেখা থাকতে হবে ‘শিশুর জন্য মায়ের দুধের সমতুল্য বা শ্রেষ্ঠতর কোন খাদ্য নেই।’ আরও লেখা থাকতে হবে ‘এই (কৌটা/প্যাকেট) খাদ্য সম্পূূর্ণ রোগজীবাণুমুক্ত নয়। এটা খেলে শিশুর অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি আছে।’ বিকল্প শিশুখাদ্য বিপণন ও ক্রয়ের ক্ষেত্রেও রয়েছে নির্দেশনা। তবে রাজধানীর বিভিন্ন সাধারণ দোকান ও সুপার শপে সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, বিকল্প শিশু খাদ্য ও সরঞ্জামের বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান ও বিক্রেতারা এসব নির্দেশনা মানছেন না। এ বিষয়ক আইন সম্পর্কেও ক্রেতা-বিক্রেতাদের কেউ তেমন কিছু জানেন না। শিশু স্বাস্থ্যের জন্য কল্যাণকর আইনটির প্রচার বিষয়েও নেই কোন সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগ। তাই ‘মাতৃদুগ্ধ বিকল্প শিশুখাদ্য বিক্রয় ও বিপণন’ নামের এ আইন যেন অনেকটা কাগজেই সীমাবদ্ধ হয়ে রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক বছর হয়ে গেলেও বিকল্প শিশুখাদ্য আইনের তেমন প্রচার নেই। তাই না জেনেই দোকানে এসব গুঁড়োদুধ ও অন্যান্য খাদ্য প্রদর্শন ও বিক্রি করছেন সাধারণ দোকানীরা। একই সঙ্গে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন সুপার শপে। শিশুর মা-বাবাসহ অভিভাবকরাও মায়ের দুধের বিকল্প হিসেবে এসব খাদ্যের বিষয়ে সচেতন নন। চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদরা বলছেন, জন্মের পর থেকে দুই বছর পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধই শিশুর জন্য শ্রেষ্ঠ পুষ্টিকর খাদ্য। বিকল্প হিসেবে গুঁড়ে াদুধ শিশুর জন্য খুবই ক্ষতিকর। এ দুধ নবজাতকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। শিশু ঘন ঘন অসুস্থ হয়, শারীরিক বিকাশ ঠিকমতো হয় না। বাজারে সাধারণত দুই ধরনের বিকল্প শিশুখাদ্য পাওয়া যায়। একটি শিশুর জন্মের পর থেকে ছয় মাস, এক বছর বা দুই বছর বয়সী শিশুদের জন্য ‘বিশেষ ফর্মুলায়’ তৈরি গুঁড়োদুধ। অন্যটি ছয় মাসের বেশি বয়সী শিশুদের জন্য মায়ের দুধের পাশাপাশি সম্পূরক খাবার হিসেবে দেয়া ‘ফর্মুলা ফুড’।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডাঃ হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, এমনিতে যে কোন খাদ্যে পুষ্টিগুণ থাকলে তা মানসিক বিকাশে সাহায্য করবে। কিন্তু দুই বছর পর্যন্ত বাচ্চার বিকাশের জন্য বিকল্প শিশুখাদ্যের কোন গুরুত্ব নেই। এজন্য মায়ের বুকের দুধই যথেষ্ট। মায়ের বুকের দুধে যে পুষ্টি আছে, এর কাছাকাছি পুষ্টি অন্য কোন খাবারে নেই। তবে মায়ের অসুস্থতা বা মা এমন কোন ওষুধ খাচ্ছেন, যাতে শিশুকে বুকের দুধ দেয়া যাবে না- এমন ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
জন্মের পর শিশুদের মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো নিশ্চিত করার উদ্যোগ রয়েছে সারাবিশ্বে। ১৯৮১ সালে জেনেভায় বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা মায়ের দুধের বিকল্প খাদ্য বিপণন নিয়ন্ত্রণে একটি নীতিমালা তৈরি করে, যা ‘ইন্টারন্যাশনাল কোড অব মার্কেটিং অব ব্রেস্ট মিল্ক সাবস্টিটিউটস’ নামে পরিচিত। সেই নীতিমালার আলোকে ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশে ‘মাতৃদুগ্ধ বিকল্প খাদ্য (বিপণনের নীতিমালা) আইন’ প্রণয়ন করা হয়। ২০১৩ সালের ২২ অক্টোবর আইনটি সংশোধন করা হয়। পাঁচ বছর পর্যন্ত শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিকল্প খাদ্যের বিপণন নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে আইনে।
বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশন (বিবিএফ) নিজস্ব উদ্যোগ এবং সরকারের সহযোগিতা নিয়ে বিকল্প শিশুখাদ্যের বিপণন কার্যক্রম তদারক করে থাকে। বিবিএফের চেয়ারপার্সন ডাঃ এস কে রায় বলেন, দেশে প্রতিবছর প্রায় ৩০ লাখ শিশু জন্মায়। তাই বছর ঘুরতেই দুই বছর বয়সী বাচ্চার সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৬০ লাখ। এই বিপুল সংখ্যক শিশুর প্রত্যেককে দুই বছর পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো নিশ্চিত করাটা একটা চ্যালেঞ্জ। অভিভাবকদেরই এ বিষয়ে অসচেতনতা রয়েছে। তাছাড়া আইনের প্রচার ও সচেতনতা কার্যক্রম লোকবল ও অর্থ বরাদ্দের ওপর নির্ভর করে। সরকার বরাদ্দ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এ সংক্রান্ত প্রচার বাড়ানোর জন্য বিবিএফ এবং জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান পাঁচ বছর মেয়াদী একটি কর্মকৌশল তৈরি করছে বলে জানান তিনি। সুত্রঃ বাসস।

 

প্রতিবেশিনী….৬


আফরোজা হাসান


“একরাশ অভিযোগ ভরা কন্ঠে কাঠকে উদ্দেশ্যে করে পেরেক বলল, তুমি আমাকে অনেক ব্যথা দিচ্ছো, আমাকে আহত করছো। জবাবে পেরেক বলল, তুমি যদি আমার মাথায় হাতুড়ির আঘাত দেখতে তবে আমাকে ক্ষমা করতে।” রুপক হলেও এই উক্তিটিতে পেরেক আর কাঠের কথোপকথনটুকু ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ। অনেক সময়ই প্রিয়জন, কাছের বা দূরের কারো কথা, কাজ ও আচরণ আমাদেরকে কষ্ট দেয়, ব্যথিত করে। তাদের উপর অভিযোগ, অভিমান করার আগে একবার অন্তত তাদের পরিস্থিতি দেখা ও বোঝার চেষ্টা করা উচিত। আমার অভিজ্ঞতা বলে সম্পর্ক কাছের হোক কিংবা দূরের কাউকে কোন ব্যাপারে দোষারোপ কিংবা কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করার আগে একবার অন্তত তার অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করা উচিত। এই চেষ্টা বেশিরভাগ সময়ই সম্পর্কের মাঝে অকারণ কিংবা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কারণে দুরুত্ব ও তিক্ততা তৈরির পথকে রুদ্ধ করে। তোমার কি মনেহয়?

আমার মনেহয় আপনি সারাক্ষণ আমাকে অনুসরণ করেন, চোখে চোখে রাখেন।

মাহামের জবাব শুনে হেসে ফেললো আয়ান। হাসতে হাসতে বলল, মেয়েদের এই আরেক সমস্যা। হাজবেন্ড চোখ না রাখলে অভিযোগের শেষ থাকে না। আবার চোখে চোখে রাখলেও সীমাহীন বিরক্তির উদ্রেক হয়।

ভারসাম্য বলেও তো জগতে একটা জিনিস আছে। মধ্যমাবস্থা যাকে বলে। ছেলেদেরও আরেক সমস্যা হলো তাদের মাঝে এই মধ্যমাবস্থা নেই। কেউ কেউ আছে বৌয়ের দিকে চোখ ই রাখেনা। আর কেউ কেউ চোখ মোটে সরায় ই না।

তাহলে এখন করণীয় কি?

করণীয় হচ্ছে চোখ রাখতে হবে, পলক ফেলতে হবে এবং ভাবুক চোখ আকাশ-বাতাস, চাঁদ-তারা, ফুল-পাখী ইত্যাদিও দেখতে হবে।

কিন্তু কেউ কেউ যদি আকাশ-বাতাস, চাঁদ-তারা, ফুল-পাখী সবকিছুই তার স্ত্রীর ভেতর দেখতে পায়। তাহলে?

হেসে ফেললো মাহাম। জবাব না দিয়ে হাসতে হাসতে রান্নাঘরে রওনা দিলো।রান্নাঘরে ঢুকে বাটিতে অনেকগুলো পেঁয়াজ মাঝখান থেকে কেটে ভিজিয়ে রাখা দেখে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তার পেছন পেছন এসে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়ানো আয়ানের দিকে তাকালো।

রান্নাঘরের ভেততে ঢুকতে ঢুকতে আয়ান বলল, অনেক করেছি কিন্তু আর সম্ভব না পেঁয়াজের সাথে তোমাকে শেয়ার করা।

মানে?

মানে আমার জীবনের সবচেয়ে বিমুগ্ধকর মূহুর্তগুলোর একটি যখন আমার ভালোবাসাকে তোমার চোখে প্রাপ্তির অশ্রু রুপে ঝরতে দেখি। তোমাকে কাঁদাতে চাই না কখনোই। কিন্তু যখন আমার কোন কথা বা কাজের ফলশ্রুতিতে তোমার চোখে আনন্দাশ্রু দেখি তখন নিজের প্রাপ্তির ভান্ডারকে আরো সমৃদ্ধ মনেহয়। তোমার চোখের আনন্দাশ্রু শুধু আমার একার। এতে আর কারো কোন অধিকার নেই।

মাহাম হেসে বলল, কিন্তু এরসাথে পেঁয়াজের কি সম্পর্ক?

সম্পর্ক হচ্ছে প্রায় দিনই আমরা দুজন গল্প করতে করতে রান্না করি। তুমি তখন মোটেই ব্যথিত থাকো না। বরং অনেক আনন্দে থাকো। সেইসব আনন্দের মূহুর্তে তোমার চোখ থেকে অশ্রু আমার কারণে ঝরে না। ঝরে পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে। এটা আমার পক্ষে কিছুতেই মেনে নেয়া সম্ভব না। আমার অধিকারহরণের শাস্তি স্বরুপ তাই মাথা কেটে দুই ফালি করে পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়েছে পেঁয়াজকে।

মাঝেমাঝে কিছু কর্মকাণ্ড দেখলে তোমাকে ছোট্ট বাবু মনেহয়। হাসতে হাসতে বললো মাহাম।

মাহামকে কাছে টেনে নিতে নিতে আয়ান বলল, যেসব কর্মকাণ্ড দেখতে আমার বৌ মন খারাপ ভাব ছেড়ে এমন মনের আনন্দে হাসবে। সেসব কর্মকাণ্ড করার জন্য ছোট্ট বাবু হতে আমার কোন আপত্তি নেই।

শাবাবের বাসা থেকে আসার পর থেকেই দেখছি নানান কথা বলে তুমি মন ভালো করার চেষ্টা করছো। আমার মন খারাপ কে বললো?

সে কি তুমি জানো না কে বলেছে? মাহামের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বিস্ময় মাখা কন্ঠে উল্টো প্রশ্ন করলো আয়ান।

শাবাব বলেছে? কিন্তু বাবা মামণির কথা ভেবে হঠাৎ আমার খুব মনখারাপ লাগছে সেকথা তো শাবাবকে বলিনি আমি। বললে শাবাবেরও মন খারাপ হতো।

আমাকেও শাবাব বলেনি।

তাহলে?

তুমি আর আমি ছাড়াও এই ফ্ল্যাটে যার অস্তিত্ব বিদ্যমান সে বলেছে।

তুমি আর আমি ছাড়া এই ফ্ল্যাটে তো আর কেউই থাকে না।

থাকে থাকে। তুমি হয়তো খেয়াল করোনি।

থাকে? কে থাকে? আমি খেয়াল করিনি মানে? আমার অজ্ঞাতে আমার বাসায় কেউ কিভাবে থাকবে? বিস্মিত কন্ঠে প্রশ্ন করলো মাহাম।

তোমার অজ্ঞাতে তোমার বাসায় কারো থাকাটা অসম্ভব হলেও, সে সম্ভব করে নিয়েছে।

কিন্তু সে কে?

তোমার আচরণ।

এতক্ষণের বিস্ময়, উত্তেজনা মূহুর্তেই মিলিয়ে গেলো মাহামের। হেসে ফেললো। আয়ানও হেসে বলল, কি তুমি আর আমি ছাড়া তার আলাদা অস্তিত্ব নিয়ে এখন নিশ্চয়ই আর দ্বিমত নেই?

দ্বিমতের তো প্রশ্নই আসে না। একইসাথে তোমার রসবোধের অস্তিত্বেও দ্বিমত নেই।

দাম্পত্য জীবনে রসবোধের প্রয়োজনীয়তা কিন্তু অপরিসীম। অনেক কঠিন বিষয়কেও রসে কোট করে সহজ করে তোলা যায়। এটাও একটা আর্ট। লাল মোহন মিষ্টির কথাই ধরো। তেলে ভাজার পর কেমন কালচে আর শক্ত থাকে। অথচ রসে দেয়া মাত্রই কি চমৎকার নরম ও সুস্বাদু হয়ে যায়। দেখতেও কত লোভনীয় লাগে। শুকনো, বিমর্ষ সম্পর্ককেও এমন ভালোবাসা, সমঝদারির রসে ভিজিয়ে আকর্ষণীয় করে তোলা সম্ভব।

আমার বাবা এই শিল্পে খুবই দক্ষ একজন শিল্পী। এই শিল্পে আমার গুরু কিংবা আইডলও বলতে পারো।

সেজন্যই মনেহয় বাবার ছেলেও মাশাআল্লাহ বিরাট দক্ষ এই শিল্পে। হাসতে হাসতে বললো মাহাম।

আয়ানও হেসে বলল, মার রাগ, বিরক্তি, ক্লান্তিকর মূহুর্তগুলোকে বাবা এত চমৎকার করে রাঙিয়ে দিতেন। সেসব দেখে তখন থেকেই আমার শখ ছিল আমিও ওমন সঙ্গী হবো আমার স্ত্রীর তরে।

সন্তানদের উপর বাবা-মার দাম্পত্যজীবনের প্রভাব অনেক বেশি তাই না? সুখী, সমঝদার দম্পতিদের সন্তানরা স্বভাবগত ভাবেই অনেক সমঝদার, হাসিখুশি হয়। অন্যকে সম্মান দিতে জানে, আন্তরিকতা, সহমর্মিতা নিয়ে পাশে এসে দাঁড়াতে জানে অসহায় মূহুর্তে। ভালোবাসতে জানে ভালোবাসার মতো করে। অপরদিকে বাবা-মার নিত্য কলহ দেখতে দেখতে যেসব ছেলেমেয়েরা বড় হয়, তারা নিজেদের অজান্তেই ঐ সমস্ত নেতিবাচক গুণ নিজ চরিত্রে ধারণ করে ফেলে। নাজমুল ভাইয়ের সাথে মনেহয় এমনটাই ঘটেছে। ইলমা একদিন বলেছিল ওর শ্বশুর নাকি এখনো সামান্য কারণেই ওর শ্বাশুড়ির গায়ে হাত তোলেন। নাজমুল ভাই বাবা-মায়ের এসব দ্বন্দ্ব-সংঘাত দেখতে দেখতেই বড় হয়েছে। স্ত্রীর গায়ে হাত তোলা, অসম্মানজনক কথা বলা, মানুষের সামনে স্ত্রীকে হেয় করা ইত্যাদি তাই স্বাভাবিক অবস্থায় উনার কাছে খারাপ কিছু মনেহলেও, রাগের সময় খুব স্বাভাবিক ভাবে নিজেই এই কাজগুলো করতে পারে।

তুমি এখনো ইলমা আর নাজমুলকে নিয়েই ভাবছো? কারো সমস্যা শুনে নিজেই যদি মন খারাপের চাদর জড়িয়ে বসে যাও, তাহলে সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখবে কি করে? আগামীকাল তো ইনশাআল্লাহ দেখা হচ্ছেই আমাদের সবার। তখন আলোচনা করা যাবে এই বিষয়ে। এখন তাই ইলমা আর নাজমুলের ভাবনা ছেড়ে এমন কিছু ভাবো যাতে তোমার মনে ভালো লাগা গুঞ্জন তুলবে। অনেকদিন তোমার গল্প লেখার বিষয়ে কিছুই বলছো না। নাকি অবসর অন্য কোন ভালো লাগা খুঁজে নিয়েছে লেখালেখির বদলে?

মাহাম হেসে বলল, না অন্য কোন ভালো লাগা খুঁজে নেয়নি অবসর। তাছাড়া নিজের ভাবনাদের শব্দের ফ্রেমে বেঁধে রাখাটা আমার কোন শখ কিংবা শুধুই ভালো লাগা না। লিখতে আমি ভালোবাসি। ঠিক যেমন করে বৃষ্টি ভালোবাসি, জোছনা ভালোবাসি, প্রকৃতির সান্নিধ্য ভালোবাসি। তবে আমিও অনেকদিন থেকেই ভাবছিলাম নতুন কোন গল্প লেখার কথা। জীবনের গল্প। পরিবারের গল্প। পরিবারের সাথে জড়িয়ে থাকা মায়াময় বন্ধনের গল্প। সেইসব মায়াবী বন্ধনের ভাঁজে ভাঁজে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট ঢেউ, চড়াই-উৎরাই, আশা-নিরাশা, তিক্ততা-মিষ্টতার গল্প। যে গল্পে থাকবে জীবনের সমস্ত রঙ, রুপ, আলো-ছায়ায় সংমিশ্রণ। যে গল্প চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে, সরলতা, কোমলতা, স্বিগ্ধতায় ফুল ফোটাবে মন বাগিচায়। যে গল্প অজানতেই ঠোঁটের কোণে ফুটিয়ে তুলবে এক চিলতে হাসি, কখনো ঝরে পড়বে দু’ফোঁটা অশ্রু রূপে। অমাবস্যার ঘোর আঁধার পেরিয়ে, সুবহে সাদিকের সন্ধানে অক্লান্ত পথ চলে সুহাসিনী ভোরের স্বপ্ন দেখাবে যে গল্প। যে গল্প আশা জাগানিয়া গান শুনিয়ে উন্মুক্ত করবে রুদ্ধ মনের আলোকিত বাতায়ন।

তাহলে আর দেরি কেন যতদ্রুত সম্ভব শুরু করে দাও তোমার গল্প লেখা।

ইনশাআল্লাহ শুরু করবো। কিন্তু তারআগে আগামীকাল মেহমান আপ্যায়নের আয়োজন শুরু করি। শাবাবের বাসা থেকে ফোন দিয়েছিলাম ইলমাকে। বলেছে রাত পোহালেই নাকি হাজির হয়ে যাবে। সকালের নাস্তা করবে আমাদের সাথে, দুপুরে খাবে, বিকেলে আবারো নাস্তা করবে, এরপর রাতের খাবার খেয়ে তবেই যাবে। অবশ্য বিকেলের নাস্তা আর রাতের খাবারের আয়োজন শাবাব আর আরিফী ভাইয়া করবে বলেছে। আমাদেরকে শুধু সকাল আর দুপুরের আয়োজন করতে হবে।

ঠিকআছে। চলো তোমাকে সাহায্য করি।

এরপর দুজন মিলে গল্প করতে করতে মেহমান আপ্যায়নের আয়োজনে মনোযোগ দিলো।

পর্ব-৫