banner

শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

Daily Archives: January 16, 2026

 

মজুরি বৈষম্যের শিকার পঞ্চগড়ের নারী পাথরশ্রমিকরা

মোরগের ডাকে ঘুম থেকে উঠে সংসারে সবার খাবার আয়োজন। ছেলেমেয়েদের খাইয়ে স্কুলে পাঠানো। বাড়ির সব কাজ শেষ করে নিজে অল্প খেয়েই সকাল ৭টায় হাজির হতে হয় কর্মস্থলে। গ্রীষ্মের দুপুরের সূর্য দেবতার সবখানি তেজ লাগে তাদের সারাগায়ে। রোদে পুড়ে পুড়ে শরীরের চামড়া কালো হয়ে গেছে। চোখের নিচে কালো ছায়া পড়েছে। তবু দুচোখ ভরা স্বপ্ন ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাবার। স্বপ্ন একটু ভালভাবে বাঁচবার। দিনের দিনের পর দিন এভাবেই কাটে তাদের। সমান কাজ করেও মজুরি মিলে পুরুষের অর্ধেক। রোজগারের এ চিত্র পঞ্চগড়ের নারী পাথর শ্রমিকদের।

উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সনদে নারী পুরুষ সমঅধিকারের কথা বলে হলেও বাস্তবে তার ভিন্ন চিত্র দেখা মিলে দেশের সর্ব উত্তরের প্রান্তিক জেলা পঞ্চগড় জনপদে। সারাদিন একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষের সমান শ্রম দিয়েও তাদের মজুরি মিলে অর্ধেক। কর্মস্থলে নেই নারীদের কাজ করার তেমন পরিবেশও। তবু জীবন জীবিকার তাগিদে এই কম মজুরিতেই হাজার হাজার নারী কাজ করে যাচ্ছেন এই জনপদে। ধরেছেন সংসার পরিচালনার হালও।

এক হিসাব মতে জানা গেছে পঞ্চগড়ের পাঁচ উপজেলার প্রায় ৫০ হাজার নারী বিভিন্ন শ্রম পেশায় নিয়োজিত। এদের কেউ অবকাঠামো নির্মাণ কাজ, কেউ চা বাগানে, কেউ কৃষি কাজে, কেউ মাটি কাটা কাজে আবার কেউ পাথর শিল্পে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। তবে শুধুমাত্র পাথর শিল্পেই প্রায় ৩০ হাজার নারী শ্রমিক কাজ করে বলে জানা গেছে।

নারীদের এই বিরাট অংশ শ্রম পেশায় একদিনে আসেনি। ধীরে ধীরে নিজেদের প্রয়োজনে সকল বাধা পেরিয়ে তারা আজ নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়েছে।

এক সময় এই জনপদে শ্রম পেশায় নারীদের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। কিন্তু স্বাধীনতার পরে ব্যাপক অভাব অনটন দেখা দেয়ায় নিজেদের প্রয়োজনে তারা কাজে নেমে পড়ে। পঞ্চগড়ের আটোয়ারী, পঞ্চগড় সদর ও তেঁতুলিয়ায় পাথর শিল্পের বিকাশ হলে নারীরাও কাজ করার সুযোগ পায়। এভাবেই একজনের দেখাদেখি আরেকজন কাজে যোগ দেয়। শুরুতে পাথর ব্যবসায়ীরা নারীদের কাজে নিতে চায়নি। এ সময় কাজ করতে লোকজনের নানা গুঞ্জনাও শুনতে হতো। তবু সব বাধা পেরিয়ে পাথর শিল্পে কাজ শুরু করে পঞ্চগড়ের নারীদের এই বিরাট অংশ। ক্রমে ক্রমে পঞ্চগড়ের পাথর শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে হাজার হাজার নারী শ্রমিকের জীবন।

‘কাজে ভাত’ এমন কথার উপর ভিত্তি করেই হাজার হাজার নারীরা আজ নিজেদের খোলস থেকে বের হয়ে কাজে যোগ দিয়েছে। নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি সংসারের হাল ধরেছে নারীরা। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখছে তারা।

স্বাধীনতার ৪৫ বছর পেরিয়ে গেছে। বদলে গেছে লাল সবুজের বাংলাদেশ। তথ্য প্রযুক্তি আর নানা শিল্পে বাংলাদেশ এখন অন্যদের কাছে উদাহরণ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য আজও শ্রমের ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে নারীরা।

সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যে ৭টা পযন্ত ১২ ঘণ্টার রৌদ্রের খরতাপে কাজ করে একজন নারী শ্রমিক মজুরি পান ১৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকা। অন্যদিকে একই সমান কাজ করে পুরুষ শ্রমিকরা মজুরি পান ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।

কম মজুরিতে নারী শ্রমিকদের দ্বারা বেশি কাজ আদায় করা যায় বলে পাথর ব্যবসায়ীরাও নারী শ্রমিকদের নিয়ে আগ্রহ দেখায়। মজুরি বেশি দাবি করলে তাদের আর কাজে নেয়া হয় না বলেও অভিযোগ করেন অনেকে। তাই ঘরে বসে থাকার চেয়ে কম মজুরিতেই কাজ করেন তারা। খাবার সময় শুধু একটু বিশ্রাম মিলে তাদের। সেই সময়ে সবাই বাড়ি থেকে রান্না করে আনা খাবার খায়।

অন্যদিকে, নারীদের কাজ করার মতো এখনো তেমন পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়নি অধিকাংশ পাথরের কর্মস্থলে। নেই কোনো ল্যাট্রিন ও বিশ্রামাগার। তাই দুপুরের খাবারের পর গাছের ছায়ায় পাথরের উপরই শুয়ে বসে একটু বিশ্রাম করে তারা। কোনো কারণে নারী শ্রমিকরা অসুস্থ বা আহত হলে তারা পায় না কোনো বিশেষ ভাতা ও মালিকদের সহায়তা। কিন্তু তারপরও চলে জীবিকার সংগ্রাম।

পঞ্চগড় জেলা সদরের ১০ মাইল পতিপাড়া এলাকার নারী পাথর শ্রমিক রাশিদা খাতুন (৬৫) জানান, তার আয় দিয়েই ৬ জনের সংসারের খরচের জোগান হয়। স্বামী বৃদ্ধ তাই তেমন রোজগার করতে পারেন না। মায়ের পাথর ভাঙার কাজের মজুরি দিয়েই বড় দুই ছেলে মানিক ও রাসেলকে হাফেজি মাদরাসায় ও মেয়ে জেসমিন আরা দশম শ্রেণিতে এবং সবার ছোট ছেলে তারেক কিন্ডার গার্টেন স্কুলে কেজি শ্রেণিতে লেখাপড়া করছে। ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ দিয়ে যে সামান্য টাকা থাকে তাই দিয়েই কোনোমতে চলে সংসার। এদিকে ঋণের টাকাও শোধ করতে হয় রাশিদাকেই। প্রতি সপ্তাহে আশা এনজিওকে তার ৭০০ টাকা করে পরিশোধ করতে হয়।

তার মতো আরেক নারী পাথর শ্রমিক আমেনা খাতুন (৬২)। বাড়ি পঞ্চগড় জেলা সদরের ভিতরগড়। স্বামী মারা গেছেন বিশ বছর আগে। ১ ছেলে ১ মেয়েকে বড় করে বিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আমেনাকে খাওয়ানোর ভার কেউ নেয়নি। তাই বেঁচে থাকতে বৃদ্ধ বয়সেও তাকে পাথর ভাঙার কাজ করতে হয়।

শুধু রাশিদা, আমেনা নয় এমন চিত্র হাজার হাজার পাথর শ্রমিকদেরই। নিজে রোদে পুড়ে পুড়ে হাসিমুখে তাদের সংসার বাঁচানোর সংগ্রাম সত্যিই সকল উদাহরণ হার মানিয়ে দেয়।

পাথর ব্যবসায়ী মোশারফ হোসেন জানান, এ এলাকার নারীরা তেমন অন্য কোনো কাজ পায় না তাই পাথর ভাঙার কাজ করতে আসে। আমরা সাধ্যমতো তাদের মজুরি দেয়ার চেষ্টা করি।

জেলা নারী বিষয়ক কর্মকর্তা রুখশানা মমতাজ জানান, আমরা কোনো দিবস আসলেই কেবল নারীদের সমঅধিকারের কথা বলি। কিন্তু বাস্তবে নারীরা সমঅধিকার পাচ্ছে না। নারী পাথরশ্রমিকরা পাচ্ছে না তাদের ন্যায্য অধিকার। আমরা আমাদের পক্ষ থেকে নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমাদের একার পক্ষে এই আন্দোলন সফল করা সম্ভব নয়।  নারীদের অধিকার আদায়ে আমাদের সকলকেই এগিয়ে আসতে হবে।

নারী পাথরশ্রমিকদের স্পর্শে এ অঞ্চলের পাথর শিল্প পৌঁছে গেছে দেশের সর্বত্র। তাই নারীদের কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে তাদের অধিকার ও ন্যায্য মজুরি এমনটাই প্রত্যাশা জেলার সচেতন মহলের।

 

ঢাকা বিভাগের শ্রেষ্ঠ ১০ জয়িতাকে সংবর্ধনা

পাঁচটি ক্যাটাগরিতে ঢাকা বিভাগের শ্রেষ্ঠ ১০ জয়িতাকে সংবর্ধনা দিয়েছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

বুধবার দুপুরে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের আয়োজনে এ সংবধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি।

অনুষ্ঠানে প্রথম শ্রেষ্ঠ ৫ জয়িতা নির্বাচিত হলেন- অর্থনীতেতে রাজিয়া বেগম, শিক্ষা ও চাকরিতে ড. শাহিদা আক্তার, সফল জননী সেলিনা আমিন, নির্যাতিতা হয়েও নতুন উদ্যোগে জীবন গড়ার পুরস্কৃত হয়েছেন মর্জিনা বেগম, সমাজসেবায় আরিফা ইয়াসমিন ময়ূরী।

এছাড়া দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ ৫ জয়িতা নির্বাচিত হয়েছেন-  মমতাজ বেগম, প্রফেসর ড. শিরীন বেগম, মনোয়ারা বেগম, আমেনা বেগম ও মাজেদা বেগম।

ঢাকা বিভাগের ১৭টি জেলার মধ্যে থেকে এই শ্রেষ্ঠ ১০ জন জয়িতাকে বাছাই করা হয়েছিল বলে জানান ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার হেলালুদ্দীন আহমদ।

এর আগে ঢাকা বিভাগের ১৭টি জেলার ৭৩ জন নির্বাচিত সাধারণ জয়িতাকে ক্রেস্ট ও সনদপত্র দেয়া হয়।

এসময় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, ‘জয়িতা মানে বিজয়ী। শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও যে সব নারী নিজেদের মেধা, শ্রম ও যোগ্যতা দিয়ে নিজেকে  এবং দেশকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে নিয়ে গেছেন তাদের সংবর্ধনা দেয়ার  জন্যই আজকের এই অনুষ্ঠান।’

তিনি বলেন, ‘আমরা পিছিয়ে পড়া নারীদের এগিয়ে নিতে চাই। এজন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে তাদের ক্ষমতায়নের প্রয়োজন। আজকে যারা পুরস্কৃত হচ্ছে তারা দৃষ্টান্ত। তাদের দেখে অন্যদের এগিয়ে আসতে হবে।’

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাপতি রেবেকা মোমেন বলেন, ‘সরকার থেকে নারীদের সহযোগিতা করা হয়। কিন্তু সাহায্য পেলেই নারীরা ওপরে উঠতে পারে না। তাদের দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়। আমি আশা করি, আপনারা সবাই সমাজের জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন। দৃঢ়তার সাথে আরো সাফল্যমণ্ডিতভাবে এগিয়ে যাবেন।’

ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার হেলালুদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে এসময় আরো বক্তব্য দেন- মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসিমা বেগম এনডিসি, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সাহিন আহমেদ চৌধুরী প্রমুখ।

 

নারী উন্নয়নে বাজেট বরাদ্দের দাবি

আসন্ন জাতীয় বাজেটে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১ বাস্তবায়নকল্পে গৃহীত জাতীয়  কর্মপরিকল্পনার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন এবং শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিতকরণে বরাদ্দ রাখার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ।

বুধবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে মূল বিষয়ের ওপর প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ।

তিনি বলেন, জাতীয় নারীনীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় কর্মপরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নে প্রয়োজন নেতৃত্ব ও দক্ষতার সঙ্গে কার্যক্রম সম্পাদন, সমন্বয় ও সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার।

তিনি আরো বলেন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরের মোট বাজেটের মাত্র ২৬ দশমিক ৮০ ভাগ নারীদের জন্য বরাদ্দ ছিল। এভাবে বাজেটে উপেক্ষিত থাকলে নারীদের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।

এ সময় তিনি নারী ও কিশোরী নির্যাতন বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে মেয়ে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন থেকে আত্মরক্ষায় সক্ষম করে তুলতে বিদ্যালয়ে ও কমিউনিটিতে দক্ষতা বৃদ্ধি প্রশিক্ষণের জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখাসহ বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইমা হক বিদিশা বলেন, শহরে ও বিদ্যালয়ে মেয়ে শিক্ষার্থীদের চলাফেরা করতে হিমশিম খেতে হয়। তাই সবক্ষেত্রে মেয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত রাখতে সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিআইডিএসর  সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. প্রতিমা পাল মজুমদার বলেন, সঠিক মনিটরিং না থাকার কারণে নারী ও পুরুষের মজুরি সমান হচ্ছে না। কমিউনিটি ক্লিনিকে নারী চিকিৎসক না থাকায় নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। আমরা এখনো মাতৃ মৃত্যুহার কমাতে পারছি না। তাই এসব সেবা বৃদ্ধি করতে বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে।

সভায় বক্তারা বলেন, বাজেটে নারীর গুরুত্ব তুলে ধরে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখতে হবে। তবেই নারীরা আরও গতি নিয়ে কাজ করতে পারবেন। নারীদের নিরাপত্তা বজায় রাখতে অবশ্যই বাজেটে বিশেষ কিছু রাখতে হবে এবং বরাদ্দগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন আয়োজক সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবির।