banner

শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

Daily Archives: January 16, 2026

 

তিন নারী মুক্তিযোদ্ধার জীবন নিয়ে প্রামান্যচিত্র

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। ফারজানা ববির পরিচিত একজন গবেষক গবেষণা করছিলেন যুদ্ধাহত বীর নারী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে। সেই গবেষণার আর্কাইভ তৈরির কাজটি করেন ফারজানা। এ কাজ করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অনেক নথিপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করেন। আবার বিভিন্ন বই ঘেঁটেও মুক্তিযুদ্ধে বীর নারী মুক্তিযোদ্ধাদের নির্যাতিত হওয়ার অজানা তথ্যও জানতে পারেন।
‘আর্কাইভের কাজ করার পর থেকেই মনে হচ্ছিল এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে হবে। এভাবে শুরু করি বিষকাঁটার কাজ।’ বললেন বিষকাঁটা প্রামাণ্যচিত্রের নির্মাতা ফারজানা ববি। ঢাকার স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবে ৬ ডিসেম্বর দেখানো হয় বিষকাঁটা ছবিটি। নির্মাতা ফারজানা এর আগে বেশ কিছু স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র যৌথভাবে পরিচালনা করেছেন। সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন মেহেরজান চলচ্চিত্রে।

তিন বীর নারী মুক্তিযোদ্ধা রঞ্জিতা মল্লিক, রমা চৌধুরী আর হালিমা খাতুনের বর্তমান জীবনের বাস্তবতাকে তুলে ধরা হয়েছে বিষকাঁটায়। নিজের এলাকা খুলনা থেকেই কাজ শুরু করেন ফারজানা ববি। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন মুক্তিযুদ্ধের সময় সেখানকার নির্যাতিত নারীদের। ফারজানা বলেন, ‘খুলনার লেখক বাবর আলীর স্বাধীনতার দুর্জয় অভিযান বইটি থেকে জানতে পারি বীর নারী মুক্তিযোদ্ধা রঞ্জিতা মল্লিকের কথা। এরপর তাঁকে খুঁজতে থাকি। একসময় তাঁকে পেয়েও যাই। রূপসার পাথরঘাটার যে বাড়িতে নির্যাতিত হয়েছিলেন রঞ্জিতা সেই বাড়িতে হয় বিষকাঁটার পুরো শুটিং।’
যুদ্ধ শেষে স্থানীয়রা রঞ্জিতার জায়গাজমি দখল করে সেখান থেকে তাঁকে উচ্ছেদ করে। পুরো সমাজ থেকে আলাদা হয়ে ৪৩ বছর ধরে রঞ্জিতা অসম্মানের জীবন যাপন করলেও মাথা উঁচু করে সসম্মানে বেঁচে আছে সেই স্বাধীনতা বিরোধীরা।

ফারজানা জানান, বীর শব্দের যোগ নিয়ে আপত্তি আছে রমা চৌধুরীর। তিনি সব সময় বলতেন বীর হলে এত অপমান আর পাশবিক অত্যাচারের শিকার হতে হতো না তাঁদের।
এখন বিশেষ দিনগুলোয় বীর নারী মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে প্রদীপ প্রজ্বলন বা পুনর্বাসনের যে কথা বলা হয়, সেটাও একধরনের প্রহসন মনে হয় ফারজানার কাছে। কারণ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের দলিলে যে ২২ জন নারী মুক্তিযোদ্ধার কথা আছে তার মধ্যে মাত্র ছয়জন যুদ্ধাহত বীর নারীর নাম রয়েছে।
যে কারণে দেশের জন্য নিজের সম্মানটুকু হারিয়েও হালিমার মতো মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে তাঁদের। ফারাজনা বললেন, ‘অথচ মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখসমরে অংশ নিয়ে পা হারিয়েছিলেন হালিমা। যুদ্ধে ক্ষত সৃষ্টি হয় তাঁর দুপায়ে। টাকার অভাবে পায়ের চিকিৎসা করাতে পারছেন না। গত ৪৩ বছরে তাঁদের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা উঠে এসেছে এই প্রামাণ্যচিত্রে।’

সূত্র- প্রথম আলো।

 

কমছে সৌদী আরবে নারী শ্রমিক সংখ্যা

রক্ষণশীল মুসলিম রাষ্ট্র সৌদি আরবের সরকার নীরবে সামাজিকভাবে বৈপ্লবিক একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে যার বাস্তবায়নে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের নারীদের সৌদি আরবে গিয়ে কর্ম গ্রহণ করার সুযোগ কমে যাবে। সৌদি সমাজ এখন বিপুল সংখ্যায় বিদেশী পুরুষ ও নারীদের বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত করে নিজেরা আয়েশী জীবন কাটাতে অভ্যস্ত। সৌদি আরবের জনসংখ্যা দুই কোটি দেশজ আরব বা ‘ওয়াতানি’। এদের পাশাপাশি লাখ লাখ বিদেশী পুরুষ ও নারী সৌদি আরবে কর্মরত রয়েছে ‘ওয়ার্ক ভিসা’ ভিত্তিতে। এরা প্রতি মাসে তাদের বেতন থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা নিজ নিজ দেশে পাঠায়। বাংলাদেশ প্রবাসীদের পাঠানো থেকে যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে তার বেশির ভাগ আসে সৌদি আরব থেকে।

 

সৌদি সরকারের পরিসংখ্যান থেকে দেখা গেছে, সৌদি আরবে ৪০ লাখ সৌদি পুরুষ কর্মরত রয়েছে, কিন্তু এর পাশে কর্মরত রয়েছে মাত্র ছয় লাখ ৮০ হাজার সৌদি নারী যারা মোট নারী জনসংখ্যার মাত্র ১১ শতাংশ! কর্মরত সৌদি নারীদের সংখ্যা দ্রুততম সময়ে বৃদ্ধি করার জন্য সৌদি সরকার এই সামাজিকভাবে বৈপ্লবিক প্রকল্প গ্রহণ করেছে।

 

সৌদি সরকারের শ্রম ও জনসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাহা কে তাইবা বলেন, এই প্রকল্প দ্বারা সরকার আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশে কর্মরত সৌদি নারীদের সংখ্যা দ্বিগুণে উন্নীত করার আশা করছে। যেসব খাতে সরকার সৌদি নারীদের কর্ম সুযোগ বাড়ানোর নীতি গ্রহণ করেছে তার মধ্যে আছে স্বাস্থ্য খাত, ম্যানুফ্যাকচারিং খাত এবং তথ্যপ্রযুক্তি। এর পাশাপাশি সৌদি নারীদের কর্মস্থলের পাশেই শিশুদের জন্য ‘ডে কেয়ার’ সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

 

তাইবা বলেন, ‘বর্তমানে সৌদি নারীরা মনে করে গৃহে অবস্থান করাই তাদের জন্য সঠিক কাজ।’ দীর্ঘকাল ধরে ভিনদেশী নারী-পুরুষ কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে জীবনযাপনে অভ্যস্ত সৌদি সমাজে কর্মরত পুরুষ ও নারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি করার জন্য সৌদি সরকার যে ব্যাপক আকারের প্রকল্প গ্রহণ করেছে তারই একটি অংশ সৌদি নারীদের গৃহের বাইরে কর্ম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করার জন্য সৌদি সরকারের শ্রম মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় হার্ভার্ডের ‘কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্ট’কে তালিকাভুক্ত করেছে সৌদি সরকারকে পরামর্শ দানের জন্য।

 

সৌদি সরকারের কাছে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, বহু সৌদি নারী আসলেই গৃহের বাইরে কাজ করতে আগ্রহী। ব্যাচেলর ডিগ্রিপ্রাপ্ত সৌদি নারীদের এক-তৃতীয়াংশ চাকরি খুঁজে পাচ্ছে না। সৌদি সরকারের প্রকল্পের অন্যতম প্রধান রোহিনী পান্ডে বলেন, ‘কেনেডি স্কুল’ এবং সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয় যৌথভাবে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখছে ‘রিটেইল’ চাকরিতে সৌদি নারীদের তাদের যোগ্যতানুযায়ী কর্ম জোগাড়ে যেসব সমস্যা রয়েছে তা কিভাবে অপসারণ করা যায়।

 

যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কিছু বিশিষ্ট অধ্যাপিকা সৌদি সরকারের সাথে যৌথভাবে একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে সৌদি নারীরা তাদের যোগ্যতানুযায়ী কর্ম গ্রহণ করার পথে যেসব বাধার সম্মুখীন হয় তা অপসারণে তাদের সহায়তা করার জন্য। সৌদি সমাজ অতি রণশীল এবং নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এমন কঠোর যে, সৌদি নারীদের গাড়ি ড্রাইভ করার অনুমতি দেয়া হয় না। সমাজের এমন রণশীলতা এবং নারীদের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের পরিবেশের সাথে কিভাবে মানিয়ে নিয়ে সৌদি নারীদের গৃহের বাইরে কর্মে নিয়োগ করা যায় তার উপায় উদ্ভাবন করছেন এসব পাশ্চাত্যের উচ্চ শিাবিদ এবং বিশেষজ্ঞরা। এদের অন্যতম হার্ভার্ডের অধ্যাপিকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ কডিয়া গোল্ডিন যখন সৌদি সরকারের কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন তখন সৌদি নারীদের রেওয়াজ অনুযায়ী ‘আবায়া’ (শরীর সম্পূর্ণ আবৃত করে সৌদি নারীরা যে পোশাক পরে) পরে তার শরীরকে সম্পূর্ণভাবে আব্র“ আবৃত রাখেন।

 

কিন্তু যে জটিল বাধাটা প্রধান হয়ে উঠেছে তা হলো ‘রিটেইল’ কর্ম গ্রহণে সৌদি নারীদের অনীহা, কারণ তাদের ধারণা, এসব কর্ম শুধু বিদেশ থেকে আগত নারীরাই করে। আরেকটি প্রধান সমস্যা হচ্ছে সৌদি নারীদের কর্মস্থলে আসা-যাওয়ার কী ব্যবস্থা করা যায়।

 

এ সমস্যার সমাধানে সৌদি সরকার রিয়াদের একটি প্রধান শপিং মলে কর্মে যোগদানকারী সৌদি নারীদের আসা-যাওয়ার জন্য ট্যাক্সি ভাড়ায় আংশিক ভর্তুকি দিচ্ছে। কিন্তু এ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করতে গেলে যে বিপুল অঙ্ক ব্যয় হবে তা হিসাব করে সৌদি সরকার পিছু হটেছে। এখন সৌদি সরকার ভাবছে পাবলিক বাস সার্ভিস চালু করবে কি না, অথবা শুধু নারীদের বহন করার জন্য বাস সার্ভিস চালু করা সম্ভব কি না।

 

পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন, কর্মেেত্র সৌদি নারীদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় প্রবেশের ফলে সৌদি সমাজে মৌলিক পরিবর্তন আসতে পারে। কর্মেেত্র প্রভূত সংখ্যায় সৌদি নারীদের উপস্থিতি সৌদি সমাজে নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। পাশাপাশি কর্মেেত্র বিদেশী নারীদের সংখ্যা লণীয়ভাবে কমে যাবে।

 

লেখক : প্রবীণ সাংবাদিক, কানাডা প্রবাসী

 

বিশ্ব অপরিণত শিশু দিবস

শাহনাজ বেগম : আগাম জন্মের কারণে বা অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেয়া শিশুরা সরচেয়ে বেশি মৃত্যু ঝুঁকিতে থাকে। এক গবেষণায় দেখা যায়, সারাবিশ্বে প্রতিদিন তিন হাজারেরও বেশি শিশু মারা যায়।
প্রথমবারের মতো একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, আগাম জন্ম বা মাতৃগর্ভে ৩৭ সপ্তাহ পূর্ণ করার আগে জন্মগ্রহণ করার ফলে শিশুদের শরীরে যেসব জটিলতা তৈরি হয়, তাতে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শিশু মারা যায়। গত ১৭ নভেম্বরকে ‘বিশ্ব অপরিণত শিশু দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।

২০১৩ সালে সারা পৃথিবীতে পাঁচ বছরের কমবয়সী প্রায় ৬৩ লাখ শিশু মারা গেছে, যাদের মধ্যে ১১ লাখ আগাম জন্ম সংক্রান্ত জটিলতায় মারা গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন এবং জন্সহপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের একটি গবেষণা দল যৌথভাবে গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন। নতুন এই গবেষণায় বলা হচ্ছে, ২০১৩ সালে সারা পৃথিবীতে আগাম জন্মের ফলে সৃষ্ট জটিলতায় মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক শিশুমৃত্যু ঘটে জন্মের প্রথম আটাশ দিনের মধ্যেই।
ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিওনাটলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশে মোট শিশুমৃত্যুর শতকরা ৪৫ শতাংশই হয় এ সংক্রান্ত জটিলতায়। কয়েকটি উন্নত দেশেও আগাম জন্ম সংক্রান্ত জটিলতাই শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। অনুন্নত দেশগুলোতে জীবাণু সংক্রমণসহ নানা কারণে শিশুমৃত্যু হলেও উন্নত দেশগুলোতে শিশুমৃত্যু হয় মূলত আগাম জন্মের কারণেই।
গবেষকরা শিশু মৃত্যুর অন্যান্য প্রধান কারণগুলোর মধ্যে নিউমোনিয়া, জন্মের সময়ে এবং তার পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট বিভিন্ন জটিলতাকে চিহ্নিত করেছেন। আগাম জন্ম জটিলতায় প্রতিবছর পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশুমৃত্যু সবচেয়ে বেশি হয় ভারতে। দেশটিতে বছরে গড়ে সাড়ে তিন লাখেরও বেশি এমন শিশু মারা যায়। এর পরের অবস্থানেই রয়েছে নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, এবং ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো। বাংলাদেশেও আগাম জন্ম সংক্রান্ত জটিলতাই এখন শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ।
এ সংক্রান্ত জটিলতার ফলে শিশুমৃত্যুর শতকরা হারের দিক দিয়ে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে মেসিডোনিয়া, যেখানে শিশুমৃত্যুর অর্ধেকেরও বেশি ঘটে আগাম জন্ম নেয়া শিশুদের ক্ষেত্রে। এর পরের অবস্থানেই রয়েছে স্লোভেনিয়া, ডেনমার্ক, সার্বিয়া, যুক্তরাজ্য এবং হাঙ্গেরি।

-সূত্রঃ ইনকিলাব।

 

মায়েদের সচেতনতাই পারে শিশুকে সুন্দর জীবনের হাসি হাসতে

 

যশোর থেকে হাসান সোহেল : পাপিয়া আক্তারের (৩০) দ্বিতীয় সন্তান রীতার বয়স ৫ মাস। এ পর্যন্ত তিনি রীতাকে বুকের দুধ ব্যতীত পানিও খাওয়াননি। পাপিয়া জানান, তার প্রথম সন্তান ঋত্মিকের জন্মের পর এ সব নিয়ম মানেননি। বুকের দুধও ঠিক মত হয়নি। তাই জন্মের কয়েকমাসের মধ্যেই গরুর দুধ খাওয়াতেন। এতে তার প্রথম সন্তানের সব সময়ই অসুখ লেগে থাকতো। ওজনও তেমনি বাড়েনি। স্বাস্থ্য কর্মীদের সহায়তায় রীতা গর্ভে থাকা অবস্থা থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত সব ধরনের নিয়ম মেনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলছেন। শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোয় অনেক খুশি বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, অন্যান্য শিশুদের চেয়ে তার শিশু অনেক সুস্থ। কীভাবে সুস্থতা বোঝা যায়, জানতে চাইলে তিনি জানান, দিনে ৬ বারের বেশি প্রসাব, হাসি-খুশি এবং শান্ত থাকা। একই সঙ্গে শিশু জন্মের কিছু সময় পর শাল দুধ খাওয়ানোসহ কিছু নিয়ম মেনে চলায়ই স্বাভাবিকভাবে বুকের দুধ আসে। যা তাকে প্রথম সন্তান জন্মের পর পর করানো হয়নি।
কথা হয় একই এলাকার গর্ভবতী সাবিনা ইয়াসমিনের (৩২) সঙ্গে। তিনি জানান, বর্তমানে গর্ভকালীন শিশুর ৭ মাস চলছে। তিনি চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ অনুযায়ী খাবার, দুপুরে খাবারের পর বিশ্রামসহ নিয়মিত যা করা দরকার অনাগত সন্তানের জন্য তার সবই করছেন। একই সঙ্গে শারীরিকভাবে তিনি সুস্থ আছেন বলে উল্লেখ করেন।
১১ দিন বয়সের শিশু আহ্নিকার মা কুলসুম বেগম (২৫) জানান, দ্বিতীয় সন্তান আহ্নিকার জন্মের পর থেকে এ পর্যন্ত বুকের দুধ সঠিকভাবে খাওয়াচ্ছেন। শিশুও সুস্থ।
বিউটি আক্তার ও ফারুক হোসেন দম্পতির সন্তান সাইম ফারদিনের বয়স ১০ মাস। বর্তমানে শিশুকে দিনে ৩ বার বুকের দুধের পাশাপাশি ভাত, মাছ, মাংস, ডিমসহ প্রাণীজ খাবার খাওয়ানো হয়। বাইরের কোন খাবার খাওয়ান না বলে জানান। তিনি জানান, জন্মের পর থেকে ৬ মাস পর্যন্ত শিশুকে বুকের দুধ খাইয়েছেন। এখন পর্যন্ত শিশু সুস্থ। ওজনও স্বাভাবিক।

এভাবেই পুরো শার্শা উপজেলায় শিশুদের পুষ্টির ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। এলাকায় ব্র্যাকের স্বাস্থ্যকর্মী এবং সেবিকাদের সহায়তায় গর্ভবতী নারী এবং মায়েরা জানেন শিশু জন্মের আগে এবং পরে শিশুর পুষ্টি নিশ্চিতে ও শিশুর সুস্থ সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণে নিজেরাই ভূমিকা পালন করছেন। শুধু শার্মা নয়; সরকারি, বেসরকারি ও অন্যান্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশ থেকে অপুষ্টি নিরসনে সমন্বিতভাবে বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। জানা যায়, মা ও নবজাতকের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে ২০১৫ সালের মধ্যে ১০০ শতাংশ গর্ভবতী মা’কে কমপক্ষে একবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা এবং এ সময়ে মায়েদেরকে চারবার স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে এক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে।
শার্শা উপজেলায় পুষ্টি কার্যক্রম পরিচালনাকারী ব্র্যাকের পুষ্টি প্রকল্পের কর্মসূচি সমন্বয়ক ফায়জুল হাসান বলেন, এই উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে পুষ্টি উন্নয়ন কার্যক্রম বেশ ভালো। একসময়ে এই এলাকায় বিকল্প শিশুখাদ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর অপতৎপরতা বিদ্যমান ছিল। ওদের প্ররোচনায় শিশুর জন্মের পর বুকের দুধ খাওয়ানোর বিষয়ে কোন ধরনের নিয়ম মানা হত না। মায়ের দুধের পরিবর্তে বিকল্প শিশুখাদ্য খাওয়ানো হতো। ৩ লাখ ৩০ হাজার জনসংখ্যার এই উপজেলায় ব্র্যাকের ৩২ জন স্বাস্থ্য কর্মী, ২৬৩ জন সেবিকা এবং সরকারি পর্যায়ে অনেক স্বাস্থ্যকর্মী কাজ করছেন। যাদের নির্দেশনায় এখন শিশুদের পুষ্টির ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। এলাকার মায়েরাও অনেক সচেতন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

image_153486
পুষ্টি সম্পর্কিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর পুষ্টিমান ধরে রাখতে গর্ভাবস্থায় মায়ের প্রয়োজন অত্যাবশ্যকীয় ভিটামিন ও খনিজ উপাদান যা শিশুর ভ্রুণের মস্তিষ্ক, হাড় ও অঙ্গ-প্রতঙ্গ গঠন ও বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। একই সঙ্গে জন্মের পর একটি শিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতের অন্যতম মাধ্যম ৬ মাস পর্যন্ত শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো। পরে শিশুর বয়স ৬মাস পূর্ণ হলে শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে উঠার জন্য মায়ের দুধের পাশাপাশি সুষম বাড়তি খাবার প্রদান করা। গবেষণায় আরও ওঠে এসেছে, অপুষ্টির কারণে শিশুর জীবনের প্রথম ১০০ দিনের যে ক্ষতি হয় তা অপূরণীয়। এর ফলে মস্তিষ্কের বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে শিশুর বুদ্ধি কম হয়, লেখাপড়ায় পিছিয়ে পড়ে। শারীরিক গঠন দুর্বল ও অপরিণত এবং পরবর্তী জীবনে বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই শিশুর এই সময়কে গুরুত্ব দিতে হবে।
জাতীয় পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. মো. শাহ নেওয়াজ বলেন, মা ও শিশুদের অপুষ্টি  থেকে রক্ষায় পুষ্টিকে মূল ধারায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং পুষ্টি কার্যক্রমকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ১৩টি মন্ত্রণালয় পুষ্টি কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এদের একত্র করে সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে একটি ব্যাপকভিত্তিক পুষ্টি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এদিকে পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক প্রতিবেদনে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর অপুষ্টি, প্রসবপূর্ব স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রসব পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবার উন্নতির তথ্য ওঠে এসেছে। একই সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জাতিসংঘ শিশু তহবিলসহ (ইউনিসেফ) বেশ কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বলছে, স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশ উল্লেযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বিশেষ করে শিশু ও মাতৃমৃত্যু কমানোর ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২০ বছরে বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার ৬৭ শতাংশ কমেছে।
যশোর জেলার সিভিল সার্জন ডা. আতিকুর রহমান খান বলেন, শিশুদের অপুষ্টির বিষয়ে গ্রামে গ্রামে বৈঠক করে দীর্ঘদিন থেকে স্বাস্থ্যকর্মীরা সচেতন কার্যক্রম চালাচ্ছেন। একই সঙ্গে শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিতে বিভিন্ন পরামর্শ দিচ্ছেন। তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে এখনো অনেক সচেতনতার অভাব রয়েছে। আমরা যতই মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করি শিশু খাদ্য প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো ততই চাতুর্য্যপূর্ণ কৌশল অবলম্বন করছে। তাই এই সব কোম্পানির বিরুদ্ধে আরও সোচ্চার হতে হবে।
বুকের দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে সচেতনতা আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম কিউ কে তালুকদার মা ও শিশু অপুষ্টি রোধে প্রাথমিক ও দীর্ঘস্থায়ী কার্যক্রমের ওপর জোর দিয়ে বলেন, প্রাথমিকভাবে শিশুদের ৬ মাস বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। পরবর্তীতে দীর্ঘস্থায়ীভাবে ৬ মাস পর থেকে শিশুদের ঘরে তৈরি সুষম খাবার দিতে হবে। একই সঙ্গে মা ও শিশুদের জন্য ক্ষতিকর খাবারের ব্যাপারে নজরদারি রাখতে হবে। এটা করতে পারলেই সুস্থ-সুন্দর প্রজন্ম তৈরি হবে। তিনি বলেন, মায়ের দুধ শিশুদের সুন্দরভাবে, সুস্থ হিসেবে গড়ে তোলার একমাত্র খাবার। মায়ের দুধের বিকল্প আল্লাহ সৃষ্টি করেননি। তাই এর গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে বেশি করে বোঝাতে হবে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের হেলথ নিউট্রিশন অ্যান্ড পপুলেশন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক রাইসুল হক বলেন, পুষ্টি কার্যক্রমে অনেক সফলতা এসেছে। এরপরও এ কার্যক্রম আরও জোরদার করতে মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে হবে। এছাড়াও তিনি কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে মা’দের পৃথকভাবে কাউন্সিলিং করানোর বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে বলে উল্লেখ করেন।