banner

শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

Daily Archives: January 16, 2026

৭ বছর পর,কেমন আছে সিডরে বিধ্বস্ত পরিবারের শিশুরা?

RTX3H7H1

ঘূর্ণিঝড় সিডরের সাত বছর পেরিয়ে গেলেও বরগুনায় এখনো স্বজনহারা পরিবারের আহাজারি থামেনি। নিহতদের সন্তানেরা লেখাপাড়া শিখে বড় হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তারা মানুষ হতে চায়।

বরগুনার তালতলীর কবিরাজপাড়া গ্রামের বাসিন্দা খলিলুর রহমান তার মেয়ে ডলি (৭) ও কলিকে (১১) নিয়ে বেঁচে আছেন। তার পরিবারের বাকি ১১ জন সদস্যের সবাই মারা গেছেন। বেঁচে থাকা মেয়ে দু’টি মায়ের আদর যত ছাড়াই বড় হয়েছে। ছোট মেয়ে নানার বাড়িতে থেকে কবিরাজপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণীতে লেখাপড়া করছে। তেঁতুলবাড়ীয়া গ্রামের আরেক পরিবারের নয়জন নিহত হন। তাদের পরিবারে বেঁচে থাকা আলমগীর বলেন, পরিবারের সবাইকে হারিয়ে আজ আমি অসহায়। লেখাপড়া করার অদম্য ইচ্ছা থাকলেও পারিনি। পরিবারের অভিভাবক হারিয়ে সংসারের হাল ধরতে বাধ্য হয়েছি। 

বরগুনার আমতলী ঘটখালী গ্রামের ১৪ জন দিনমজুর পানের বরজের ধানশি লতা সংগ্রহের জন্য ট্রলার নিয়ে সাগর কাছে চরনিদ্রা ছকিনা গিয়েছিলেন। সিডরের ভয়াল সেই রাতে সবাই জলোচ্ছ্বাসে হারিয়ে যান। তাদের মধ্যে চারজন ফিরে এলেও ১০ জন আর ফিরে আসেননি। তারা হলেন ইউসুফ (৪০), জব্বার (৫৫), ছোবাহান (৪২), হোসেন (৫০), খলিল (৩৫), রতন (৪০), সোহেল (১৮), মনিরুল (২৫), দেলোয়ার (২৫) ও আলতাফ (২০)।

আমতলীর দিনমজুর ইউসুফ সরদার ছিলেন তার পরিবারের একমাত্র অভিভাবক। তিনি রেখে গেছেন তিন সন্তান ও স্ত্রী আমেনা বেগমকে। আমেনা বেগম জানান, তার বড় মেয়ে সারমিন পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে। সে এ বছর এসএসসি পরীার্থী। ছোট মেয়ে নীল দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী এবং ছেলে শাওন সপ্তম শ্রেণীতে পড়ছে। আমেনা বেগম আরো বলেন, আমি স্বামী হারিয়েছি, এতিম সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যয়ভার বহন করতে পারছি না।

নিহত মনিরুলের স্ত্রী হামিদা বেগম বলেন, আমি দিনমজুরের কাজ করে একমাত্র মেয়ে সাইফাকে (৯) লেখাপাড়া শেখানোর স্বপ্ন নিয়ে সংগ্রাম করে যাচ্ছি। চতুর্থ শ্রেণীতে পড়–য়া সাইফা জানায়, বাবাকে হারিয়েছি। মায়ের মধ্যেই বাবার স্মৃতি খুঁজে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে লেখাপাড়া করছি। নিহত রত্তনের বাবা আবদুর বারেক মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘মোর চাওয়া পাওয়ার কিছুই নাই, মোর পোয়ায় দুই ছেলে রাইখ্যা গেছে, হ্যাগো ল্যাহাপাড়া হরাইতে বড় কষ্ট অইতেছে। সরকার এই এতিম সন্তানদের দিকে তাকাইলে বড় ভালো অইত।’

বৈঠাকাটা গ্রামের একই পরিবারের দুই ছেলে দেলোয়ার ও আলতাফ সিডরে নিহত হয়েছে। তাদের প্রতিবন্ধী বাবা আলী আজম গত বছর মারা গেছেন। দেলোয়ারের দুই ছেলে এখন অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে।

সোবাহানের দুই ছেলে। বড় ছেলে রাসেল ঘটখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে জিপিএ ৫ পেয়ে আমতলী ডিগ্রি কলেজে লেখাপাড়া করছে। অর্থের অভাবে ঠিকমতো লেখাপড়া করতে পারছে না। অন্যের বাড়িতে দিনমজুরের কাজ করে। কাজের ফাঁকে লেখাপড়া করে। রাসেল জানান, ‘বাবা ছিলেন দিনমজুর। অর্থের সন্ধানে সাগরে গিয়ে আর ফেরেননি। আমার পরিবারের আর যেন কোনো সদস্যের সাগরের বুকে হারিয়ে যেতে না হয় এ জন্যই লেখাপড়া করছি। কষ্ট হলেও একদিন সমাজের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াব।’

ঘটখালীর সমাজসেবক আলমগীর হোসেন জানান, নিহত পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের লেখাপড়া শেখানোর অদম্য বাসনা নিয়ে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে অনেকে মেধাবী ও প্রতিভাবান। আমার বিশ্বাস তারা উচ্চশিা গ্রহণে সহযোগিতা পেলে দেশের সুনাগরিক হয়ে উঠবে।

ঘটখালী ও বৈঠাকাটা গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে সিডরে হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের আজো তারা ভুলেনি। এখনো মাঝে মধ্যেই তাদের আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে ওঠে।

সূত্র- নয়া দিগন্ত

একটি মৃত্যু- আর প্রশ্নবিদ্ধ সমাজের চির নীরবতা!

86323_sumi with husband

৪দিন আগেও যে মানুষটির সরব পদচারণায় মুখর ছিলো হাসপাতাল,বাড়ির আঙ্গিনা,আজ সে মানুষটির হাসিমুখ কেবলই ছবি হয়ে থাকে দেয়ালে টাকানো ফ্রেমে! নিষ্ঠুর বাস্তবতার কাছে হার মেনে হারিয়ে গিয়েছে আগামীর স্বনামধন্য ডাক্তার,মা হারানো বাবার আদরের একমাত্র মেয়ে,ভাইয়ের কাছের বন্ধু প্রিয় বোন,হাসপাতালের আঙ্গিনার হাস্যজ্জ্বল মুখ ডা.শামারুখ মাহজাবিন সুমি।

গত ১৩ই নভেম্বর দুপুরে শ্বশুড়বাড়ির বাথরুমের গ্রিলে ঝুলানো সুমীর দেহ উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হলে,কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষনা করেন। কিন্তু এটা কি কোন আত্নহত্যা ছিলো?আদৌ কি সুমী নিজ গলায় ফাঁসি নিয়ে নিজের জীবন শেষ করেছিলেন? নাকি কোন এক ভয়ানক সত্য জেনে ফেলার নিষ্ঠুর শাস্তি দেয়া হয়েছিলো তাকে? নাকি সত্য প্রকাশ করে দেবার ভয়েই নির্মম ভাবে খুন করা হয়েছিলো সুমীকে? প্রশ্ন গুলো কোন ভাবেই অযৌক্তিক না,বরং এই প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর খুঁজে পাওয়াই এখন সময়ের দাবী।

কেন এভাবে চলে যতে হলো একজন প্রতিভাবান ডাক্তার কে?কেন বিয়ের বছর ঘুরতে না ঘুরতেই লাশ হতে হলো একজন গৃহবধু কে? আর কেন ই বা তার মৃত্যুর কারণ গুলো অনুসন্ধান করতে যেয়ে কর্তৃপক্ষ কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরোবার ভয় করছে?

ডা শামারুখ মাহজাবীন যশোরের পুরাতন কসবা এলাকার প্রকৌশলী নূরুল ইসলামের মেয়ে। রাজধানীর হলি ফ্যামিলি মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেছেন,মৃত্যুর আগে সদ্য ইন্টার্নী শেষ করে,এফসিপিএস ডিগ্রী নেয়ার জন্য পড়াশুনা শুরু করেছিলেন। সুমী তার মেডিকেল কলেজের ডিবেট ক্লাবের প্রেসিডেন্টও ছিলেন। ন্যাশনাল ডিবেট ফাউন্ডেশনের কো-অর্ডিনেটর হিসেবেও কাজ করেছেন। শালীন ও ভদ্র ব্যবহারের জন্য পুরো কলেজে সুনাম ছিল তার। সুমীর মেধা আর ব্যবহার দৃষ্টি আকর্ষন করেছিলো তারই কলেজের শিক্ষিকা ডা জেসমিন আরা ম্যাডামের। ডা জেসমিন আরা যশোরের-৫ আসনের সাবেক এমপি টিপু সুলতান সাহেবের স্ত্রী। ডা জেসমিন আরা সুমী কে তার ছেলে হুমায়ন সুলতান সাদাব এর জন্য বউ করে আনেন। উচ্চ শিক্ষিত,প্রভাবশালী পরিবারের ব্যারিষ্টার ছেলের কাছে একমাত্র মেয়েকে অনেক আশা আর নির্ভরতার সাথেই বিয়ে দিয়েছেল নুরুল ইসলাম সাহেব। কিন্তু কে জানতো,এতো সব ভালো পরিচয়ের আড়ালে রয়েছে এদের কি নিষ্ঠুর আর ভয়ানক পরিচয়!!

বিয়ের পর সুমীর পরিবার জানতে পারে,হুমায়ন সুলতান কোন ব্যারিষ্টার নন,তিনি ঢাকার একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে ল’পাশ করেছেন মাত্র!এবং তিনি পুরোদস্তর একজন মাদকাসক্ত! সব কিছু জানার পরেও সুমী আপ্রান চেষ্টা করছিলো স্বামীকে মাদকের পথ থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য,একটা সুন্দর সংসার সাজানোর জন্য কিন্তু গাছের গোড়াতেই যখন গলদ তখন আগাছা ছেঁটে কি আর ফল পাওয়া যায়? 

আর তাই নির্মম ভাবে হারিয়ে গেলেন সুমী!বিয়ের পর থেকেই শুরু হয়েছিলো সুমীর নরক বাস! দুর্নীতিবাজ শ্বশুড়-শ্বাশুড়ি আর মাদকাসক্ত স্বামীর অত্যাচারে জীবন অতিষ্ট হয়েছিলো শামারুখের!পড়াশুনা করতে বাঁধা দেয়া থেকে শুরু করে কাজের মেয়ের মতো খাঁটুনী করিয়েও স্বস্তি পেতেন না তারা,আর তাই চলতো মানুষিকের পাশাপাশি শারিরিক অত্যাচারও! বাবার কাছে ফোন করে প্রায়ই কান্নাকাটি করত মা-হারা ডা. শামারুখ মাহজাবীন সুমী। মৃত্যুর আগের দিনও ফোনে বাবা নুরুল ইসলামকে বলেছিলেন, আব্বু, এটা আমার শ্বশুর বাড়ি নয় টর্চার সেল, তোমরা ঢাকায় চলে আসো। আমাকে টর্চার সেল থেকে নিয়ে যাও। আমি তোমাদের কাছে থেকে এফসিপিএস করব।
ডা. শামারুখ তার বাবাকে বলতেন, তারা (শ্বশুরবাড়ির লোকজন) আমাকে বাসায় চাকরানীর মতো সব কাজ করায়। সকালে নাস্তা বানানো, দুপুর ও রাতের খাবার সব রান্না করায়। পান থেকে চুন খসলেই গালিগালাজ আর চড়-থাপ্পড় দেয়।
শামারুখের বাবা প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম বলেন, এসব শোনার পরও মানসম্মান আর লোকলজ্জার ভয়ে সব মুখ বুঝে সহ্য করে যাওয়ার পরামর্শ দিতাম। কিন্তু সেই মুখ বুঝে থাকার পরিণতি এত ভয়াবহ হবে সেটা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারিনি। শ্বশুরবাড়িতে প্রায়ই নির্যাতন করত শামারুখের স্বামী হুমায়ুন সুলতান সাদাব, শ্বশুর খান টিপু সুলতান ও শাশুড়ি ডা. জেসমিন আরা। সব নির্যাতন মুখ বুঝে সহ্য করত শামারুখ। সম্প্রতি নির্যাতনের মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ায় তা আর নিজের মধ্যে চেপে রাখতে পারছিল না। তখন আমাকে জানায়, তার লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়েছে। শ্বশুরবাড়ি তার জন্য টর্চার সেল-এ পরিণত হয়েছে।
বাবা নুরুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, আমি যদি আমার মেয়েকে নিয়ে আসতাম, তাহলে তাকে আজ এই নির্মম ঘটনার শিকার হতে হতো না।

এমন অনেক আফসোস ই আজ চারপাশে সবার মুখে মুখে! এখনো পর্যন্ত শামারুখের শ্বশুড়-শ্বাশুরি কে গ্রেফতার করা হয়নি,কারন তারা অনেক শক্তিশালী!লোক দেখানোর জন্য স্বামীকে গ্রেফতার করা হলেও মামলায় নেই কোন অগ্রগতি

শামারুখের মৃত্যুর কারণ উদঘাটন করতে যেয়ে জানা যায়,ক্ষমতাশীল শ্বশুড় টিপু সুলতানের গোপন দুর্নীতির তথ্য জেনে ফেলাটাই কাল হয়েছিলো,শামারুখ যাতে সে সব তথ্য বাইরে ফাঁস করে দিতে না পারে,সে কারণেই মেরে ফেলা হয় তাকে! সুমীর বাবা নুরুল ইসলাম জানান, যে দিন সুমিকে হত্যা করা হয় সে দিন তার সাথে ফোনে ৩৫ মিনিট তার কথা হয়। ওই সময় মেয়ে তাকে জানায়, বাসার কাগজপত্রের মাঝে খান টিপু সুলতানের দুর্নীতিসংক্রান্ত কিছু তথ্য-উপাত্ত সুমি দেখে ফেলে। এর পর থেকে তার ওপর অত্যাচারের খড়গ নেমে আসে। সুমি ফোনে কাঁদতে কাঁদতে বারবার বাবাকে অনুরোধ করেন তাকে দ্রুত সেখান থেকে না সরালে ওরা তাকে মেরে ফেলবে। সুমির আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত সত্য হয়েছে।

নুরুল ইসলাম আরো জানান, একজন সাবেক সংসদ সদস্য ও আইনজীবী হওয়া সত্ত্বেও খান টিপু সুলতান যে কত নিচু প্রকৃতির মানুষ তা সুমির বিয়ের পর তিনি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। তিনি বিয়ের পর মেয়েকে ১২ ভরি সোনার অলঙ্কার দিয়েছেন। এই সোনাকে টিপু সুলতান পিতল বলে আখ্যায়িত করতে দ্বিধা করেননি।সম্প্রতি সুমির স্বামী হুমায়ুন সুলতান সাদাব নুরুল ইসলামকে জানান, তারা নতুন ফ্যাটে উঠবেন, এ জন্য ফার্নিচার দিতে হবে। নুরুল ইসলাম বিয়ের পর মেয়ে-জামাইয়ের জন্য ফার্নিচার তৈরি করেছিলেন। সেই ফার্নিচার নিয়ে যাওয়ার কথা বললে টিপু সুলতান ক্ষেপে অগ্নিমূর্তি ধারণ করেন। তিনি ফোনে নুরুল ইসলামকে বলেন, নতুন ফ্যাটের জন্য নতুন ফার্নিচার দিতে হবে। আর নিজের দোষ ঢাকতে সুমিকে শাসিয়ে বলে দেন তার বাবার কাছে বলতে হবে সেই (সুমি) নতুন ফার্নিচার দাবি করেছে। মেয়ের সুখের কথা ভেবে নিরুপায় হয়ে তিনি নতুন ফার্নিচার তৈরি করে দেন। যার চার হাজার টাকা এখনো দোকানে বাকি রয়েছে। অল্প কিছু দিন হলো এক লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে ফ্রিজও কিনে দিয়েছেন বলে নুরুল ইসলাম জানান।

ডা শামারুখের মৃত্যু অনেক গুলো প্রশ্নের জন্ম দিয়ে গেছে,চোখে আঙ্গুল দিয়ে আরেকবার দেখিয়ে দিয়ে গেলো,আমাদের সমাজে নারীর অসহায় অবস্থানের কথা! শিক্ষিত-অশিক্ষিত ভেদে আজো নারীর অবস্থান কতোটা অমানুষিক পর্যায়ে রয়েছে তা আরেকটা বার আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে!

হয়তো ক্ষমতা-টাকার দাপটে শামারুখের স্বামী-শ্বশুড়বাড়ির লোকেরা পার পেয়ে যাবে,যুগের পর যুগ কেঁদে যাবে শামারুখের আত্না,কিন্তু আমাদের সমাজ কি বন্ধ করতে পারবে জীবিত শামারুখদের কান্না? পারবে কি সমাজের অসহায় সেই বাবা-মায়েদের বুকের জ্বালা কমাতে? আজো অনেক আশা নিয়ে বাব-মায়েরা মেয়েকে শ্বশুড়বাড়ি পাঠান,মেয়ের ঝুলন্ত লাশ দেখার জন্যে নয়,কিন্তু যে সমাজে টিপু সুলতান-জেসমিন আরাদের মতো শ্বশুড়-শ্বাশুড়িদের নামে নরপশুদের বাস সেখানে কি করে থামবে সুমীদের বাবাদের আর্তনাদ?

আমরা বিচার চাই ডা সুমীর হত্যাকারীদের,এবং আমরা পরিবর্তন চাই এই সমাজের।

বখাটেদের উত্ত্যক্তের শিকার হয়ে স্কুল ছাত্রীর আত্নহত্যা

মুন্সিগঞ্জ পৌরসভার কাটাখালী এলাকায় গতকাল রোববার নবম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী আত্মহত্যা করেছে। শারমিন সুলতানা নামের ওই ছাত্রীর পরিবারের অভিযোগ, বখাটের উত্ত্যক্তের শিকার হয়ে সে আত্মহত্যা করেছে।
শারমিন সুলতানা (১৪) মুন্সিগঞ্জ পৌরসভার কাটাখালী এলাকার আবদুর রবের মেয়ে এবং স্থানীয় এ ভি জে এম সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে ছাত্রী ছিল।
শারমিনের পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বিদ্যালয়ে যাওয়ার সময় শারমিনকে প্রায়ই উত্ত্যক্ত করত এলাকার বখাটে অনিক। অন্যদের দিয়েও সে শারমিনকে উত্ত্যক্ত করাত। গতকাল সকালেও বিদ্যালয়ে যাওয়ার সময় কাটাখালী সড়কে শারমিনকে উত্ত্যক্ত করে অনিক। এর প্রতিবাদ করলে শারমিনকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে অনিক। বেলা ১১টার দিকে বাড়ি ফিরে গোসলখানার ঝরনার সঙ্গে ওড়না প্যাঁচিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে শারমিন। একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যরা গোসলখানায় ঝুলতে দেখে শারমিনকে উদ্ধার করে দ্রুত মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। এ সময় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। খবর পেয়ে পুলিশ হাসপাতালে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। ময়নাতদন্ত শেষে বিকেলে লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়ের ফকির জানান, এ ঘটনায় শারমিনের মা অনিককে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন। অনিককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

মানুষের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা সে নিজে!

Maria-Sharapova-img20981_668

মারিয়া শারাপোভা বিশ্বের অন্যতম আলোচিত টেনিস খেলোয়াড়। শারাপোভার জন্ম রাশিয়ায়, ১৯৮৭ সালের ১৯ এপ্রিল। এ যাবৎ তিনি টেনিসের পাঁচটি গ্র্যান্ড স্লাম জয় করেছেন। ২০০৭ সাল থেকে মারিয়া জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করছেন।

১৭ বছর বয়সে আমি উইম্বলডন জয় করি। এর কয়েক বছরের মধ্যেই মারাত্মকভাবে কাঁধের ইনজুরিতে পড়ে আমার খেলা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। আমার সামনে অনেক কারণ ছিল, যার জন্য টেনিস খেলাই ছেড়ে দেওয়ার কথা তুলেছিল অনেকে। ইচ্ছা করলেই তখন খেলা ছেড়ে দিতে পারতাম, কিন্তু হাল না ছেড়ে আবার কোর্টে নামার সাহস করি।
সত্যিকার অর্থে, আমার বেড়ে ওঠা ছিল ছাই থেকে। আবর্জনা থেকে আমার পরিবার মাথা তুলে দাঁড়ায়। আমার শিকড় কোথায়, সেটা আমি জানি। আমার শুরুর সেই কষ্টের দিনগুলো আমি কখনোই ভুলতে পারব না। আমার বাবা-মা দুজনেই বেলারুশ থেকে আসেন। আমি যখন মায়ের পেটে, তখন চেরনোবিল দুর্যোগ ঘটে। বাবা আর মায়ের কাজ চলে যায়। তাঁদের বাকি জীবনটা অনেক সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে গেছে। আমি তাঁদের মেয়ে। বাবা চার বছর বয়সে আমার হাতে টেনিস র্যাকেট তুলে দেন। বাবাই ছিলেন আমার প্রথম কোচ। স্কুলে পড়াশোনা আর বাড়ির কাজ শেষ করে প্রতিদিন টেনিস অনুশীলনে নামতাম।

maria-sharapova1
আমি কোনো কিছু ধরলে তা ছাড়ি না। আমার বিখ্যাত কোনো বন্ধু ছিল না, যার মাধ্যমে আমি খ্যাতি অর্জন করতে পারি। কিংবা আমি ফ্যাশন মডেল নই, যাকে কোনো লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন বিখ্যাত করেছে। মূল কথা হচ্ছে, টেনিসই আমাকে সব দিয়েছে। ইনজুরিতে থাকার সময় যখন ম্যাগাজিন আর পত্রিকায় আমার ছবি দেখতাম, তখন ঠিক থাকতে পারতাম না। হাসপাতালে বসে কোর্টে দৌড়ানোর শব্দ পেতাম। আর দৌড়াব বলেই টেনিস কোর্টে ফিরে আসি।
আমি সব সময় মাঠে থাকতে চাই। প্রতিদিন। জয়-পরাজয় নিয়ে ভাবি না। মাঠে থাকাই সব। খেলা শেষে ঘেমে একাকার হয়ে বাড়ি ফিরতে চাই।
আমার বেড়ে ওঠা ছিল রাশিয়ার সোচি শহরে। যুক্তরাষ্ট্রে সবাইকে সোচি নামের বানান করে বলতে হতো। কেউ জানত না সোচি মানচিত্রের কোথায়। এখন আমার জন্য অনেকেই মানচিত্রে সোচি শহরকে চেনে। এটা অনেক আনন্দের। আমি যখন রাশিয়ার পতাকা নিয়ে কোথাও দাঁড়াই, তখন আমার চেয়ে গর্বিত আর কে হয় বলুন?
খেলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এক টেনিস একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিতে এসেছিলাম। যার জন্য মায়ের সঙ্গে প্রায় দুই বছর দেখা হয়নি। তখন আমাদের মুঠোফোন ছিল না, কোনো ই-মেইলও ছিল না। একটা কলম আর এক টুকরা কাগজই ছিল আমার সব। মাকে চিঠি লিখতাম। চিঠি যখন মায়ের কাছে যেত, তখন আমার যে অনুভূতি হতো, তা এখনো শিহরিত করে।
টেনিস খেলার একাডেমিতে অন্য মেয়েরা আমাকে নিয়ে হাসত। বেশি ছোট ছিলাম বলে র্যাগিংয়ের শিকার হতাম। আমাকে টিজ করা হতো। তখন আমি হতাশ হয়ে একা একা কাঁদতাম, কিন্তু আমার লক্ষ্য আমি জানতাম। রেগে দেশে ফিরে গেলে আমি হয়তো আজকের আমি হতাম না। সব সময় আশাবাদী হয়ে থাকলে বিপদে পড়লেও নিজেকে নিজে উদ্ধার করা যায়। কষ্ট করে লেগে থাকতে হয় স্বপ্নের পেছনে।
২০০৪ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে উইম্বলডন জেতা ছিল আমার জন্য বিস্ময়। এটা স্বপ্নের চেয়েও বেশি কিছু ছিল। কখনোই চিন্তা করিনি মাত্র দুই সপ্তাহে পৃথিবীর সেরা সব টেনিস খেলোয়াড়কে হারিয়ে দেব! ফাইনালে আমি সেরেনা উইলিয়ামসকে হারিয়ে দিই। আমি কতটা দুর্ধর্ষ টেনিস খেলোয়াড় হয়ে উঠেছিলাম, তা ভাবলে এখনো গায়ে কাঁটা দেয়। কোনো দিকে মন না দিয়ে টেনিস বলেই আঘাতের পর আঘাত করে গিয়েছি। ফলে ফাইনালে আমার হাতেই ছিল সেরার পদকটি।
বেঁচে থাকার জন্য আমি টেনিস বলকে আঘাত করি, পরিশ্রম করি। আমি সব সময় সবার কাছ থেকে শেখার আগ্রহ নিয়ে বসে থাকি। বাবা আর মায়ের কাছ থেকেই আমি কৌতূহলী হয়ে ওঠার নেশাটি পেয়েছি। আমার কাছে সবচেয়ে বড় আর গুরুত্বের বিষয় হলো, প্রথমে ভালো মানুষ হওয়া, তারপর পেশাদার ক্রীড়াবিদ হতে হবে। এটা সত্যি অনন্য এক চ্যালেঞ্জ।
বেঁচে থাকার জন্য বন্ধুর বিকল্প নেই। আমি সুযোগ পেলেই বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে যাই, গান গাই। টেনিস নিয়ে পড়ে থাকলেও পরিবারকে সময় দিই। যখন খুব হতাশায় ভুগি, তখন নিজেই নিজেকে সান্ত্বনা দিই। নেইলপলিশ হাতে গ্র্যান্ড স্লামের ট্রফিগুলো তোলার স্মৃতি বারবার মনে করে নিজেকে সাহস দিই। আর হতাশার মাত্রা চরমে উঠলে গলা ছেড়ে গান গাই। প্রতিদিন সকালে আমি গান শুনে বাড়ি থেকে বের হই। আমার দুনিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো মায়ের হাতের রান্না। মায়ের হাতের বৈচিত্র্যময় রান্নার জন্য বাড়ি ফেরার তাড়া থাকে আমার। আমি সময় পেলেই বইয়ের পাতায় হারিয়ে যাই। একই বই কয়েকবার পড়ার বাতিক আছে আমার।
আমাকে কেউ কেউ ‘সুগারপোভা’ নামে ডাকে। অনেক ছোটবেলা থেকে আমি চকলেটের ভক্ত। আমার দাঁতে সব সময় চিনি লেগে থাকত। আমি চাইতাম বড় হয়ে আমি চকলেটের দোকান দেব। বড় হয়ে ব্যবসায়ী হব। সত্যি সত্যি টেনিস খেলার ক্যারিয়ার শেষ করে ব্যবসা করতে নামব।

মানুষের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা সে নিজেই। নিজেকে সাফল্যের চূড়ায় দেখতে চাইলে মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। যখন যা করো, তা-ই উপভোগ করো। বাড়িতে থাকলে টিভি দেখো, সিনেমা উপভোগ করো। হাসো। কিন্তু যখন কাজ করবে, তখন তাকে উপভোগ করো। নিজের প্রতিভা আর বুদ্ধি দিয়ে কঠিন সব কাজকে আয়ত্তে আনাই সফল ব্যক্তিদের কাজ। নিজের জীবনকে নিজেকেই আকর্ষণীয় করে তুলতে হয়। গণ্ডির মধ্যে না থেকে মাঝেমধ্যে পাগলামি করো। পাগলামি করা শেখো। সামান্য কিছুতেই হাসতে শেখো। হাসিই সবচেয়ে বড় ওষুধ। ঝুঁকি নিতে শেখো। দাঁতে পোকা ধরার ঝুঁকি থাকলেও মাঝেমধ্যে চকলেট খাও। নিজেকে নিয়ে খুশি থাকো!
কিশোর বয়সে যারা টেনিস খেলতে চায়, তাদের জন্য আমার পরামর্শ, লেগে থাকতে হবে। পড়তে হবে, জানতে হবে, খেলতে হবে। সবকিছুর জন্য চাই কঠিন অনুশীলন। ব্যর্থ হলেও লেগে থাকতেই হবে। সফল হলেও লেগে থাকতে হবে।

তথ্যসূত্র: টেলিগ্রাফকে দেওয়া সাক্ষাৎকার অবলম্বনে লিখেছেন
জাহিদ হোসাইন খান