banner

শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

Daily Archives: January 16, 2026

বিয়ে যদি আবার করতেই হয়!

164

সঙ্গী হারিয়ে কিংবা জীবনের অন্য কোনো বাস্তবতায় দ্বিতীয়বার যদি বিয়ে করতেই হয়, তখন অবশ্যই সন্তানদের সঙ্গে কথা বলে নিতে হবে। তাদের মন বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

জীবনচিত্র ১: সন্তানের নিষেধাজ্ঞা
ক্যানসারে আক্রান্ত স্ত্রীবিয়োগের পর ১৩ বছরের একমাত্র মেয়ে অহনাকে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে রইলেন নিজাম হোসেন। বুকের নোঙর উপড়ে প্রিয়জনেরা এভাবেই চলে যায়। চলে যেতে হবে সবাইকে—এই সত্য উপলব্ধি করে শোক সামলে ঘুরে দাঁড়ালেন ৩৯ বছরের নিজাম।
মায়ের স্মৃতি বুকে নিয়ে শোকে বিহ্বল অহনাও একসময় আবার শুরু করল স্কুলে আসা-যাওয়া। বাবা ছাড়া কিছুই বোঝে না সে। কোনো বিষয়ে ছাড় দিতে চায় না বাবাকে। একদিন খাবারের টেবিলে খোশমেজাজে বাবার উদ্দেশে বলল, ‘তুমি কিন্তু আর কখনোই বিয়ে করতে পারবে না। বিয়ের জন্য আমার অনুমতিও পাবে না, জানিয়ে রাখলাম। মায়ের আসনে আর কাউকে বসতে দেব না আমি, বুঝেছ?’
‘বুঝেছি।’ বললেন নিজাম।

জীবনচিত্র ২: বাপের বাড়ির চাপ
জীবনের বাঁধ ভেঙে গেছে। আচমকা সড়ক দুর্ঘটনায় একেবারেই চলে গেছেন প্রতিষ্ঠিত আস্থাবান স্বামী। কষ্ট সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। তবু চলে জীবন। সময় যায়, শোক স্থিত হতে না হতেই ১০ বছরের মেয়ে আর ১২ বছরের ছেলেকে লালন-পালনের দায়িত্বের শৃঙ্খলে আটকে পড়েন ৩৫ বছরের সানজানা। ধানমন্ডিতে ফ্ল্যাট আছে নিজের নামেই। ব্যাংকে পর্যাপ্ত টাকাসহ আর্থিক নিরাপত্তাও রয়েছে তাঁর। রয়েছে বিত্তশালী বাবা-মায়ের নিঃশর্ত সহায়তা। বেঁচে থাকার জন্য, সন্তানদের মানুষ করার জন্য কোনো বেগ পাওয়ার কথা নয় তাঁর। তবু সানজানার চলার পথে তৈরি হতে লাগল জীবনের নতুন ঘূর্ণি।

স্বামী মারা যাওয়ার দুই বছর পর ঘনিষ্ঠজনেরা আবার বিয়ে করার জন্য ‘স্কাড’ ছুড়তে লাগলেন সানজানার দিকে। আশপাশের পুরুষেরাও নানা কৌশলে ফাঁদ পাততে লাগলেন, প্রলোভিত করতে লাগলেন সানজানাকে। পুরুষদের পাতা ফাঁদ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারলেও স্বজনদের পীড়াপীড়ি থেকে রেহাই পেলেন না তিনি। বিপত্নীক এক প্রকৌশলীকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেলেন। সন্তানদের অনুমতি চাইলেন। নীরব হয়ে গেল তারা। হ্যাঁ-না কিছুই না—কোনো প্রতিক্রিয়াও দেখাল না আচরণে।

জীবনচিত্র ৩: চেনা-অচেনা পুরুষের লোভ-লালসা
শ্বশুরবাড়িতে পা দেওয়ার পরই স্বপ্নের পতন ঘটল রাহার। কানকথা ভেসে এল কানে, ‘কেবল চেহারা ফরসা হলে হয়? উচ্চশিক্ষিত হলেই চলবে? মেয়ে তো দেখছি খাটো!’ নতুন জীবনের উচ্ছ্বসিত আনন্দময় মুহূর্তগুলো আচমকা থেমে গেল কানকথার বিষবাণে। জীবনের নোঙর গেড়ে বসেনি আর শ্বশুরবাড়িতে। নিজের বাড়িতে ফিরে আসার পর আর যাননি ওই বাড়ি। আরও নানা তিক্ত কাহিনির পর তালাকনামা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ডিভোর্সের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই টের পেতে লাগলেন চারপাশের চাপ। মুঠোফোন, ফেসবুক প্রযুক্তির অশুভ আক্রমণসহ চেনা-অচেনা মানুষের আনাগোনা, লোভ-লালসা যেন অরক্ষিত করে তুলল তাঁকে। একই সঙ্গে যুক্ত হলো নিজের বাড়িতে একমাত্র ভাইয়ের বউয়ের নানা কূটচাল। দুর্বিষহ হয়ে উঠল রাহার জীবন।

মনোবিশ্লেষণ
মেয়ে অহনাকে দেওয়া কথা রাখতে পারেননি নিজাম হোসেন। নৈতিকভাবে পুরুষ সত্তার জৈবিক চাহিদা মেটানো, সামাজিকতা রক্ষা করতে গিয়ে বিয়ে করে ফেললেন অবিবাহিত এক তরুণীকে।
আরেকবার জখমপ্রাপ্ত হলো অহনার আবেগ। তার চিন্তার জগৎ ছেয়ে গেল অনিশ্চয়তার কালো মেঘে। মাকে সে হারিয়েছে রোগের কারণে। আর বাবা আবার বিয়ের করার পর তার মনে হতে লাগল, বাবাকে হারাচ্ছে অন্য নারীর কারণে। নিজেকে জখমের পর জখম করে ভুল উপায়ে উপশম ঘটাতে চাইল রক্তাক্ত মনের।
নিজাম কি ভুল করেছেন?
না, বিয়ে করে ভুল করেননি—এই বয়সে আবার বিয়ে করে শরীর-মন, সমাজের দৃষ্টিমতে ঠিক কাজটিই করেছেন তিনি। কিন্তু একটি বড় ভুল করে ফেলেছেন তিনি। বিয়ের আগে অবশ্যই অহনাকে রাজি করিয়ে নেওয়া উচিত ছিল তাঁর। নিজে না পারলে, স্বজনদের উদ্যোগও ব্যর্থ হলে তাঁদের উচিত ছিল অহনাকে মনোচিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসা। তবে নানা জীবনযন্ত্রণা ভোগ করে একসময় অহনা মেনে নেয় সৎমাকে। কিন্তু বাবাকে গোপনে এক শর্ত দেয় সে—যেন নতুন মায়ের কোলে কোনো সন্তান না আসে।
কথা দিয়েও সেই শর্ত রাখতে পারেননি নিজাম। নতুন স্ত্রী গর্ভবতী হয়ে পড়লে বিষয়টি জেনে যায় অহনা। এবার সে আত্মহননের জন্য চূড়ান্ত চেষ্টা করে। হাসপাতাল থেকে জান নিয়ে ফেরত আসে অহনা। উন্নতির একপর্যায়ে মনোচিকিৎসার একটি ধাপে মনোবিদ তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার সবচেয়ে আপন কে?’
‘বাবা ছাড়া কেউ নেই আর।’ সহজ উত্তর অহনার।
‘বাবা কেন তোমার অতি আপন?’
এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারেনি সে। উত্তরটা দিলেন মনোবিদই, ‘তোমার দেহমন জুড়ে রয়েছে তোমার বাবা-মায়ের জিনগত অস্তিত্ব। জিনের তীব্র টানেই বাবার প্রতি তুমি মমত্ববোধ অনুভব করো। তুমিই বলো, বাবা কি চিরকাল বেঁচে থাকবে?’
উত্তর না দিয়ে মাথা নত করে থাকে অহনা।
মনোবিদ আবার বললেন, ‘যে নতুন শিশু তোমার সৎমায়ের পেটে বেড়ে উঠছে, সেও কিন্তু ধারণ করছে তোমার বাবার জিন। মায়ের অংশ না থাকলেও সেই শিশুর মধ্যে জিনগতভাবে তোমার মতোই একই বাবার অস্তিত্ব প্রবহমান থাকবে না? সেই অস্তিত্ব কি তোমার আপন হবে না? কেউ নেইয়ের জগতে কেউ একজন কি আপন হয়ে তোমার পাশে দাঁড়াবে না জেনেটিক কোডের টানের কারণে, কী বলো তুমি?’
এবারও উত্তর দেয়নি অহনা। মনোবিদের দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছিল কেবল। চোখ থেকে ছিটকে বেরোচ্ছিল নতুন আলো, মুখ থেকে নেমে গেল অনিশ্চয়তার কালো মেঘ। আনন্দে মন ভরে না উঠলেও নতুন অতিথিকে মেনে নিয়েছিল সে।
দ্বিতীয় জীবনচিত্রের সানজানাও ভুল করেননি। তবে ভুল করেছিলেন সন্তানের মনোজগৎ যথাযথভাবে বুঝতে না পেরে। ফলে দুই সন্তান মায়ের বিয়ের পর নিরুদ্দেশে বেরিয়ে পড়েছিল। অনেক ভোগান্তির পর তাদের পাওয়া গেলেও ক্ষতি হয়ে গিয়েছিল ব্যাপক। সেই ক্ষতি পূরণের জন্য এখনো কেঁদে বেড়ান সানজানা। বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ান মনোচিকিৎসকদের চেম্বারে।
তৃতীয় জীবনচিত্রের রাহা পুনরায় বিয়ে না করে বাবা-মায়ের আকুতি-মিনতি উপেক্ষা করে একা চলতে থাকার কারণে জড়িয়ে যান অশুভ জালে—অনৈতিক যৌনতা, মাদক ও অপরাধজগতের জালে জড়িয়ে যান নিজেরই অজান্তে।

তাড়াহুড়া নয়
বিপত্নীক কিংবা বিধবা হলে, ডিভোর্স হলে ঠিক বয়সে, ঠিক সময়ে আবার বিয়ে করা মনস্তাত্ত্বিকভাবে একটা দরকারি পদক্ষেপ। জোর করে বিয়ে টিকিয়ে রাখার প্রবণতা অনেক সময় ভয়াবহ ক্ষতি ডেকে আনে। ডিভোর্স অনিবার্য হলে তা মেনে নিয়ে পরিণতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা চিন্তা করে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আবার ঠিক সময়ে পুনরায় বিয়ে না হলে নানা সংকটে জড়িয়ে যেতে থাকেন ভুক্তভোগী—এটিও মাথায় রাখতে হবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী না ঘটলে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, বিষণ্নতাসহ আত্মহননের মতো প্রবণতা ঘনীভূত হতে থাকে মনে। দৈহিক সমস্যা এবং দৈহিক রোগও চক্রবৃদ্ধি হারে জটিল হতে থাকে। সন্তান না থাকলে ডিভোর্সি, বিধবা বা বিপত্নীকদের অবশ্যই দেখেশুনে পুনরায় বিয়ে করা উচিত। শুধু চাপে পড়ে আবেগের বশে যেনতেনভাবে বিয়ে করা বা কারও সঙ্গে তাড়াহুড়া করে জড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। সময় নিয়ে ধীরেসুস্থে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর মোটামুটি বোঝার বয়সী সন্তান থাকলে তাদের রাজি করিয়ে বা অনুমতি নিয়ে আবার বিয়ের জন্য এগোনো উচিত। এ ক্ষেত্রেও সময় নেওয়া জরুরি। অবুঝ সন্তান থাকলে আবার বিয়ে করা বা না-করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে সচেতন হতে হবে অবশ্যই। এ ক্ষেত্রে সামাজিকতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও আর্থিক নিরাপত্তার কথা মাথায় রাখতে হবে। বিয়ে না করে থাকলে যেমন ভেতরের জৈবিক তাড়না বা চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তেমনিভাবে বাইরের জগতের চাপও আবেগে তৈরি করে অনিয়ন্ত্রিত ঘূর্ণি। এ অবস্থায় যখন-তখন মেজাজের বিস্ফোরণ ঘটে, রাগ-ক্রোধ উসকে ওঠে, চারপাশের সম্পর্কগুলো তখন জটিল থেকে জটিলতর হতে থাকে।

সন্তান অধিকৃত সম্পত্তি নয়
অনেকে দৃঢ়ভাবে সন্তানকে বুকে নিয়ে পার করে দিতে চান পুরো জীবন। তাঁরা সন্তানকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চান, অধিকৃত সম্পত্তি হিসেবে ভাবতে চান নিজেদের অজান্তে। কিন্তু সন্তান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের আবেগ ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তার কারণে প্রকৃতিগতভাবে জড়িয়ে যায় অন্য তরুণ-তরুণীর সঙ্গে। অনেক ক্ষেত্রে মা আরও বেশি একা হয়ে পড়েন এ সময়। এই একাকিত্ব তখন তাঁদের কুরে কুরে খায়। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে ভুক্তভোগীদের আর কিছুই করার থাকে না। হতাশা ও বিষণ্নতা হয় তাদের জীবনের নিত্য সঙ্গী। মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক রীতিনীতির কারণে নর-নারী আবার বিয়ের কথা ভাবতেই পারেন।
*লেখায় উল্লেখ করা সব চরিত্রে ছদ্মনাম দেওয়া হয়েছে।
লেখক: অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও কথাসাহিত্যিক।
drmohitkamal@yahoo.com

যে গল্প অংকুরেই শেষ হতে চায়!!

8432ae2233db91de2e505fef35253341-Untitled-2

‘ভেবেছিলাম একটু থিতু হয়ে জীবনটাকে উপভোগ করব। বিয়ের বয়স এক বছর পাঁচ মাস। হানিমুনে যাওয়া হয়নি। টাকা জমিয়ে রেখেছিলাম। কোথায় যাব, তা নিয়ে চলছিল আলাপ-আলোচনা। তবে দেশের বাইরে যাব বলে ঠিক করেছিলাম। হানিমুনের সেই টাকা দিয়ে স্ত্রীর চিকিৎসা করেছি।’

এ কথা বলার সময় গভীর হতাশা ফুটে ওঠে চিকিৎসক মুনতাহিদ আহসানের মধ্যে। তাঁর স্ত্রী চিকিৎসক সানজানা জেরিনের চিকিৎসার কথাই বলছিলেন তিনি। বিয়ের পর স্ত্রীর সঙ্গে হানিমুনে যাবেন বলে যে টাকা জমিয়েছিলেন, সবই খরচ হয়ে গেছে তাঁর চিকিৎসায়।

জেরিন এখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন। গত ২৪ আগস্টের ছিনতাইয়ের ঘটনা শুধু জেরিনের নয়, তাঁর স্বামীর জীবনটাকেও তছনছ করে দিয়েছে। হারিয়ে গেছে নববিবাহিত দম্পতির ঘরবাঁধার সুখ।

সেদিন ভোর ছয়টার দিকে রিকশায় করে স্বামীর সঙ্গে জেরিন তাঁর কর্মস্থল ফেনীর পরশুরামে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। রাজধানীর কমলাপুর ফুটবল স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সাদা রঙের একটি ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে জেরিনের হাতব্যাগে হেঁচকা টান দেওয়া হয়। এতে জেরিন ১০-১৫ ফিট দূরে গিয়ে পড়ে মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পান।

মুনতাহিদের ভাষ্য, ‘আমার মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা, আমার মাথার সিটিস্ক্যান করাও’—এ কথা বলেই জ্ঞান হারান জেরিন। এটাই ছিল জেরিনের মুখ থেকে শোনা শেষ কথা। এরপর থেকে তিনি নির্বাক, নিথর। জেরিনের মাথায় এর মধ্যে দুবার অস্ত্রোপচার হয়েছে। কিন্তু এতে কোনো লাভ হয়নি।

জেরিন এখনো চোখ মেলে তাঁর প্রিয়জনদের দেখেন বটে, কিন্তু সেই চোখের কোনো ভাষা নেই। এক মাস লাইফ সাপোর্টে ছিলেন জেরিন। এখন অবশ্য সে ব্যবস্থা খুলে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু জেরিনের যন্ত্রণা কমেনি। মাঝেমধ্যে তাঁর এতটাই জ্বর ওঠে, ছটফট শুরু করেন জেরিন।

বিএসএমএমইউর অ্যানেসথেসিয়া, অ্যানালজেসিয়া অ্যান্ড ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল হাই প্রথম আলো অনলাইনকে বলেন, ‘মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত পাওয়া এমন রোগীর সুস্থতার বিষয়ে কিছুই বলা যায় না। রোগীকে চোখ মেলে তাকাতে দেখে সুস্থ মনে হলেও ভালো বলার উপায় নেই। আবার অসুস্থ মনে হওয়ার পরও অনেকে সুস্থ হন। এমন পরিস্থিতিতে এক রোগীর ৪২ বছর বেঁচে থাকার নজিরও আছে। আমরা চিকিৎসা সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি। কত দিন চিকিৎসা চালাতে হবে, তা বলাও সম্ভব নয়।’

৩৩তম বিসিএস উত্তীর্ণ এ এই দম্পতি চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। ঘটনার দিনই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আরেক সংশোধিত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী জেরিনকে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়োগ করা হয়। মুনতাহিদকে ফেনীতে নিয়োগ করা হয়।

ঘটনার পর মুনতাহিদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর স্বামী ও স্ত্রীকে একই জায়গায় দিতে আবেদন করেন।

ঘটনার পর জেরিনকে প্রথমে আগারগাঁও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সে ভর্তি করা হয়। পরে নেওয়া হয় কাকরাইলের ইসলামিয়া ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে। তারপর বিএসএমএমইউতে ভর্তি করা হয়। আবেদন করার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিশেষ বিবেচনায় আইসিইউর ভাড়া নিচ্ছে না। এর পরও এ পর্যন্ত জেরিনের চিকিৎসার পেছনে খরচ হয়ে গেছে প্রায় ১৫ লাখ টাকা। প্রতিদিনই ওষুধসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক খাতে খরচ হচ্ছে প্রায় ১৫ হাজার টাকা।

মুনতাহিদ ও জেরিনের দুজনের পরিবারই মধ্যবিত্ত। এই দম্পতি পড়াশোনা করেছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। তাঁরা ছিলেন একই ব্যাচের শিক্ষার্থী। সেখানকার শিক্ষক, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজনরাই জেরিনের চিকিৎসার জন্য সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তাঁরাই বা আর কত দেবেন? মুনতাহিদ বুঝতে পারছেন না
স্ত্রীর চিকিৎসা খরচ আর কত দিন চালাতে পারবেন।

মুনতাহিদ বলেন, ‘জেরিন মাত্র ১০ বছর বয়সে তার মাকে হারায়। ছেলেমেয়ের সুখ-শান্তির কথা চিন্তা করে বাবা আর বিয়ে করেননি। জেরিনের চাহিদা খুবই কম। সময়ের কাজ সময়ে করতে ভালোবাসে। গোছানো জীবনে অভ্যস্ত। আমার অগোছালো জীবনটাকেও গোছাতে চেয়েছিল। তবে সেই মেয়ের জীবনটাই এখন অগোছালো হয়ে গেল।’

জেরিনের বাবার স্বপ্ন ছিল একটাই—তা হলো জেরিন চিকিৎসক হয়ে মানুষকে সেবা করবেন। জীবনের প্রতিটি পরীক্ষায় ভালো ফল করা জেরিনের বাবার সেই আশা পূরণ করতে চলেছিলেন। কিন্তু শুধু একটি ঘটনায় সব শেষ হতে চলেছে।

ঘটনার পর মুগদা থানায় অজ্ঞাতনামা আসামি উল্লেখ করে মামলা করেছেন মুনতাহিদ। থানা থেকে সন্দেহভাজন ধরে মুনতাহিদকে ফোন দেওয়া হয়। মুনতাহিদ বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি শুধু একটি হাত দেখেছি। তা দেখে তো আর কাউকে দোষী বলা যায় না।’

মুনতাহিদ বলেন, ‘মাত্র কয়েকদিন আগে রাজধানীতে আরেকজন নারী ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে মারাই গেলেন। আমার স্ত্রী মারা যাননি তফাৎ শুধু এইটুকু। নগরীর কোন কোন জায়গায় এ ধরনের ঘটনা ঘটে, তা পুলিশ প্রশাসন জানে। তারা একটু তৎপর হলেই আমাদের আর এ ধরনের ঘটনার শিকার হতে হয় না। এখন ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা তো দূরের কথা, স্ত্রী বাঁচবে কি না, এটাই তো অনিশ্চিত।’

ছিনতাইকারীদের উদ্দেশে মুনতাহিদ বলেন, ‘ছিনতাইকারীরা কী মানুষ না?’

জেরিন আর মুনতাহিদের জীবনের গল্পের এমন অজস্র গল্প অংকুরেই শেষ হয়ে যাচ্ছে!প্রতিদিন ছিনতাই-দুর্ঘটনা এমন অনেক দম্পতির জীবনটা কে নিঃশ্ব করে দিচ্ছি! কিন্তু আমরা এভাবে জেরিনের গল্প টা কে ফুরিয়ে যেতে দিতে পারিনা…
 
জেরিনের সহায়তায় কেউ এগিয়ে আসতে চাইলে মোহাম্মদ মুনতাহিদ আহসান ভূঞা, ব্র্যাক ব্যাংক, মতিঝিল শাখা, হিসাব নম্বর-১৫১৩২০২৫০৬৬৮১০০১ এই ঠিকানায় আর্থিক সহায়তা করতে পারেন।

চা শ্রমিক- মানুষ হলেও যাদের জীবন ক্রীতদাসের ন্যায়!

3103

চা বাগান। সবুজের মোহন দৃশ্য চোখ জুড়িয়ে দেয়। একই মাপের চা-গাছ ঢেউ খেলে পাহাড়-টিলার বুকে। ২৬ ইঞ্চির বেশি বাড়তে দেয়া হয় না সবুজের এ ঢেউকে। বাড়লেই ছেঁটে ফেলা হয়। গাছগুলোর মতোই যেন চা শ্রমিকদের জীবনও ছেঁটে ফেলা। যেখানে প্রশ্রয় নেই হাসি-আনন্দের। বেঁচে থাকা শুধু বেঁচে থাকার জন্যই। সমাজের মূল স্রোতে তারা মিশতে পারেননি কখনওই।

প্রায় ১৭৫ বছর ধরে পুরুষানুক্রমে গ্লানিমাখা জীবনের ঘানি টানছেন তারা। কোন মূল্যই যেন নেই তাদের জীবনের। প্রতি ঘণ্টা হাড়ভাঙা খাটনির দাম মাত্র সাড়ে আট টাকা। তাও অনেক আন্দোলন, অনেক তপস্যার পর শ্রমের এ মূল্য নির্ধারিত হয়েছে। এর মাঝেও কিন্তু আছে। আট ঘণ্টায় যদি নিরিখ (প্রতিদিন যে পরিমাণ পাতা তুলতেই হবে) পূর্ণ হয় তবেই পড়ে ঘণ্টার এ দাম। নিরিখ পূর্ণ না হলে ঘণ্টার মূল্য কমে আরও। 

চা শ্রমিকরা দীর্ঘ দিন ধরেই মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। হাড়ভাঙা খাটুনির বিপরীতে নামমাত্র মজুরি জুটে চা শ্রমিকদের ভাগ্যে। কোন রকমে বেঁচে থাকার হিসাব কষে তাদের উপলব্ধি দৈনিক ৩শ’ টাকার কম মজুরি হলে বেঁচে থাকাই দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। অথচ বর্তমানে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৬৯ টাকা। অনেক আন্দোলন-সংগ্রামের পথ পেরিয়ে দফায় দফায় বেড়ে মজুরি এ পর্যন্ত এসেছে। এর আগে ২০১৩ সালের মে পর্যন্ত দৈনিক মজুরি ছিল ৬২ টাকা। তার আগে ৫৫ টাকা। এরও আগে ছিল ৪৮ টাকা। অর্থাৎ যতই আন্দোলন হোক এক দফায় ৭ টাকার বেশি মজুরি বাড়ছে না। ২০০৯ থেকে ৫ বছরে চার দফায় মজুরি বেড়েছে ২১ টাকা। সে হিসেবে ৩০০ টাকা মজুরি পেতে হলে চ শ্রমিকদের অপেক্ষা করতে হবে আর ৫৭ বছর।
শ্রমিকদের কম মজুরির বিষয়টি সামনে এলেই বাগান মালিকরা বরাবর ‘রেশন সিস্টেম’কে ঢাল হিসেবে নিয়ে আসেন। তবে তারা এ ‘রেশন সিস্টেমে’র বিস্তারিত কখনওই কারও সামনে তুলে ধরেন না- শুভঙ্করের ফাঁকি ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে। চা শ্রমিকদের তথ্যমতে, রেশন ব্যবস্থায় একজন শ্রমিক সপ্তাহে ৩ কেজি চাল বা আটা বরাদ্দ পান। সেগুলো খাওয়ার উপযোগী নয়। তবে বেঁচে থাকার তাগিদে তা-ও গিলতে হয় তাদের। এ বরাদ্দ দিয়েই দৈনিক ৬৯ টাকায় বাঁধা জীবনের হিসাব মেলাতে হয় তাদের।

হিসাবের তিনটি রুটি নিয়ে কাজে বের হন তারা। এর একটি সকালে নাশতা  হিসাবে খান, সঙ্গে থাকে কাঁচা চায়ের পাতার সঙ্গে  মরিচ মেখে তৈরি করা ভর্তা। বাকি রুটিগুলো জমা থাকে দুপুরের খাবারের জন্য। ৬৯ টাকার হিসাবে ফাঁক আছে আরও। এ ৬৯ টাকা থেকেই বাঁচিয়ে রাখতে হয় ছুটির দিনের খরচ। বাংলাদেশে একমাত্র চা শ্রমিকরাই ছুটির দিনে কোন মজুরি পান না। ছুটির দিনের মজুরি যাতে না দিতে হয় তাই ‘হপ্তা’ (সাপ্তাহিক বেতন) সিস্টেম ভাঙতে চান না বাগানের কর্ণধাররা। তাই কোনভাবেই জীবনের হিসাব মেলাতে পারেন না চা শ্রমিকরা। অন্যান্য এলাকার চেয়ে চা বাগানগুলোতে শীতের আধিক্য বেশি থাকলেও সাধ্য না থাকায় শীতের পোশাক কেনারও সামর্থ্য থাকে না তাদের। পুরনো ছেঁড়া-ফাটা পোশাক কিনে বা সংগ্রহ করে শীতের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয় তাদের।

চা শ্রমিকদের থাকার ঘরগুলোর বেশির ভাগেরই মাটির দেয়াল। দেয়াল গলে সহজেই ঢুকে পড়ে শীত। আর বর্ষায় থাকে দেয়াল ধসে মৃত্যুর ঝুঁকি। ঘরের মতো বাইরেও একই অবস্থা। চা শ্রমিকদের এমন সংগ্রামী জীবনের গল্প প্রায় ১৭৫ বছরের পুরনো। সময়টা উনিশ শতকের মাঝামাঝি। উপমহাদেশ জুড়ে তখন বৃটিশ রাজত্ব। বাংলায় রেল লাইন বসবে। নিজেদের স্বার্থেই গ্রামের পথ চিরে রেলের লাইন টানছে বৃটিশ শাসক। লাইন বসানোর জন্য বাংলার বাইরে থেকে মূলত বিহার, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ ও অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে শ্রমিক আনা হয়। 
রেল লাইনের কাজ শেষ হলেও সেই শ্রমিকদের একটি বিশাল অংশ বাংলাতেই থেকে যায়। এমনই সময় চা বাগানের ভাবনা আসে বৃটিশদের মাথায়। নেপালিসহ আরও কিছু অবাঙালি শ্রমিক পাঠানো হয়। থেকে যাওয়া অবাঙালি শ্রমিকদের সঙ্গে তাদের পাঠানো হয় সিলেট-আসাম অঞ্চলে। উদ্দেশ্য, জঙ্গল সাফ করে পাহাড়ি টিলায় চায়ের বাগান তৈরী। শুধু বাগান নয় জনবসতি বিস্তারের লক্ষ্যেও বৃটিশদের এ চিন্তা। পাহাড়-টিলায় জায়গা করে নেয়া সেসব অবাঙালির পরিচয় হয় চা-শ্রমিক হিসেবে। আর তাদের খাটনির শুরুও সেই থেকেই।

১৭৫ বছর আগে যে জীবনের সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়েছিল সে জীবনের ঘানি আজও টানছেন তারা। এ সময়ে বাইরের জীবনে যুগান্তকারী পরিবর্তন এলেও তার কোন ছোঁয়া লাগেনি চা শ্রমিকদের জীবনে।  
এখনও তাদের পথ চলতে হয় সামনের জঙ্গল কেটে কেটে। রোদে জ্বলে, বৃষ্টিতে ভিজে কেবলই কাজ করতে হয় তাদের। কাজের ফাঁকে বিশ্রামের জন্য একটু ছায়ারও ব্যবস্থা থাকে না তাদের জন্য। বৃটিশ তাড়িয়ে, পাকিস্তানের পতাকা সরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হলেও স্বাধীনতার পরশ পড়েনি চা শ্রমিকদের খেটে খাওয়া দেহে। 
চা শ্রমিকদের জীবন এখনও চলছে বৃটিশদের বেঁধে দেয়া নিয়মেই। তারা এখনও শ্রমদাস হয়ে আছেন। চেয়ে চেয়ে দেখেছেন শুধু মালিকানার পরিবর্তন, ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি এতটুকুও। বৃটিশ বিদায়ের পর চা বাগানের দখল নেন পাকিস্তানি পুঁজিপতিরা। এরপর দেশ স্বাধীন হলে ইস্পাহানি, বাওয়ানি, কাশ্মীরি পরিবারের হাতে থাকা বাগানের মালিকানা আসে বাংলাদেশী মালিকদের কাছে। তবে চা শ্রমিকদের ভাগ্য রয়ে গেছে একই। সাদা চামড়ার বৃটিশ মালিকদের চেয়ে কম নন বাদামি রঙের বাংলাদেশী মালিকরাও। বৃটিশদের বাবুয়ানা ষোলো আনাই ধরে রেখেছেন বাবু নামে পরিচিত এ কালের ম্যানেজাররাও। বড় বাবু, ছোট বাবুুদের সামনে বসার অধিকার চা শ্রমিকদের নেই। ডাক পড়লে তবেই কেবল ঘরে ঢোকা যায়। তা-ও ঢুকতে হয় খালি পায়ে। 
বাবুরা বিলাসিতার চরমে ভাসলেও চা শ্রমিকদের জীবনে তার সামান্য ছিটেফোঁটাও পড়ে না। এমনকি নিজেদের পরিশ্রমের ফসল চায়ের পূর্ণ স্বাদও তারা পান না কখনও। চা শ্রমিকরা পরম মমতায় সন্তানের মতো আগলে রেখে কুঁড়ি থেকে বড় করে তোলেন চায়ের পাতা। প্রক্রিয়াজাত হয়ে বাহারি মোড়কে ঢাকা সে চা পৌঁছে যায় ঘরে ঘরে। শুধু পৌঁছে না শ্রমিকদের ঘরে। তাদের কাছে চা বলতে চায়ের কাঁচা পাতাই। বাগান থেকে ছিঁড়ে আনা চায়ের কাঁচা পাতা লবণ-পানিতে গুলে তাই পান করেন তারা। চা শ্রমিকরা যাতে বাইরের ভুবনের সঙ্গে পরিচিত হয়ে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সজাগ হতে না পারেন সে পথ বৃটিশরাই তৈরি করে রেখেছিল। শ্রমিকদের বাগানের মাঝে বন্দি করে রাখার কৌশল হিসেবে প্রতিটি বাগানের ভেতর মদের দোকান গড়ে তোলা হয়। হাড়ভাঙা খাটুনির পর জীবনের যেটুকু উদ্যম বেঁচে থাকে তা-ও নিংড়ে নেয় স্থানীয়ভাবে পাট্টা নামে পরিচিত এসব মদের দোকান। চা বাগানের বর্তমান মালিকরাও নিজেদের স্বার্থে বাঁচিয়ে রাখছেন এসব পাট্টা।
চা শ্রমিকদের জীবনে আলোর পরশ যাতে না লাগে বৃটিশদের দেখিয়ে দেয়া পথ অনুসরণ করে তার সব রকম যোগানই করে রাখছেন বাগান মালিকরা। তাদের অনাগ্রহের কারণেই পর্যাপ্ত স্কুলের অভাব রয়েছে বাগান এলাকায়। যদিও এখন অনেক এনজিও বাগানের ভেতরে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেছে তবে তা-ও চলে অনেক তদারকের ভেতর দিয়ে। বাগান মালিকরা কখনই চান না আলো পড়ুক শ্রমিকদের নগ্ন ‘কালো’ গায়ে।

সূত্র- মানবজমিন