banner

শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

Daily Archives: January 16, 2026

ধারাবাহিক উপন্যাস “নিয়ন্ত্রিত পরিণতি” পর্ব-৬

images

নাসরিন সিমা : নাদিম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে সে খ্রিষ্টান হবে, সেদিন রাজিবের মামার কথা খুব ভালো লেগেছে। উনি বলেছেন, “যিশু খ্রিষ্টানদেরকে অঢেল সম্পদ দান করেন।” নাদিমও পর্যবেক্ষণ করে দেখেছে খ্রিষ্টানদের অনেক ধন সমপদ থাকে, আর মুসলমানদের বেশিরভাগই গরীব ভুখা। পৃথিবীতে যার টাকা নেই তার কোন মূল্য নেই এটাই সত্য, এমন একটা দিন নেই যেদিন টাকার প্রয়োজন ছাড়ায় চলা সম্ভব হয়।

রাজিব নাদিমকে মার্কেটে নিয়ে যাবে বলেছে, কনফারেন্সে উপস্থিতির জন্য, এক লাখের মতো নাকী নাদিমের পাওনা, সত্যিই অবাক হয় নাদিম। রাজিবদের রিলিজিওন প্রিষ্টরা সেন্ট্রালভাবে ঐসব নিয়ন্ত্রণ করছেন। নাদিম পাশের গলিতে গাড়ীর হুইসেল শুনে দ্রুত বের হয়, এতোক্ষণ রেডী হয়ে বসে ছিলো। গাড়ীর কাছে গেলো আর রাজিবের স্বাগত কন্ঠ শুনতে পেলো,
-এসো নাদিম, উঠে এসো।
রাজিবের পাশে আনুকে দেখে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসলো নাদিম।
রাজিব মুচকী হেসে,
-নাদিম তোমাকেতো বেশ মানিয়েছে টি শার্টটা।
নাদিমও হাসে,
-থ্যাংকস।
একটু পরে নাদিম,
-পাশের উনি কী তোমার আনু?
-হ্যা নাদিম এই সেই।
আনু লজ্জাজড়িত কন্ঠে,
-রাজিব আপনার কথা খুব বলে, কেমন আছেন আপনি?
-এইতো আছি ভালো, আপনি ভালো আছেন?
-হ্যা আমিও ভালো আছি।

বসুন্ধরা মার্কেটের ভেতরে ঢুকলো ওরা আনু নাদিমের ডানবাহু দুহাতে জড়িয়ে নিলো, নাদিম বিষয়টি খেয়াল করে বিরক্ত হয়,
নাদিমকে লক্ষ্য করে রাজিব,
-কী কিনবে নাদিম?
-অনেক কিছু কিনতে হবে, মায়ের জন্য আগে ভালো কিছু শাড়ী কিনবো, আর একটা টিভি, মা অন্যের বাড়িতে গিয়ে সিরিয়াল দেখে।
অনেক কেনাকাটা করলো ওরা, আনু হঠাৎ রাজিবকে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখলো, রাজিবকে ঝাঁকায় আনু,
-রাজিব কী হলো কী দেখছো তুমি?
-ওটা স্মৃতি না?
আনু তাকায় রাজিবের দৃষ্টি অনুযায়ী,
-হ্যা তাইতো, কন্ঠ উচু করে,
-স্মৃতি, এই, এইযে এদিকে…
স্মৃতি দেখতে পেয়ে এগিয়ে আসে, ওর বাবা সাইমন চৌধুরী মেয়ের সাথে আসেন।
স্মৃতি মৃদু কন্ঠে,
-আনু তুমি ?
স্মৃতি রাজিব বা নাদিমের দিকে একবারও তাকালোনা, তাকানোর সাহস ওর হয়না।
আনু নাদিমকে পরিচয় করিয়ে দিলো, হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত এগিয়ে দিলো নাদিম, কিন্তু স্মৃতি ইতস্তত করলে সাইমন চৌধুরী,
-ইতস্তত কেন মা? হ্যান্ডশেক করো।
স্মৃতি অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকায় তারপরেই কম্পিত হাত এগিয়ে দেয় নাদিমের হাতের দিকে, নাদিম হাত ছেড়ে মুচকী হেসে,
-কেমন আছেন, সেদিন কোচিং সেন্টারে আপনার সাথে কথা হলো তাইনা?
– আলহাদুলিল্লাহ ভালো আছি, হ্যা কোচিংয়ে আমি ছিলাম। আপনি কেমন আছেন?
-ভালো। আমি নাদিম,
ওদিকে সাইমন চৌধুরী রাজিবের সাথে কথা বলছেন, কিছু বিষয় নিয়ে, স্মৃতি বুঝতে পারেনি। নাদিমকে নিজের নামটা বললো।
নাদিম এর হঠাৎ মনে পড়লো সাইমন চৌধুরীকে ও রাজিবদের কনফারেন্সে দেখেছে, উৎসাহিত কন্ঠে,
-উনি আপনার বাবা? সেদিন কনফারেন্সে………
সাইমন চৌধুরী কথা কেড়ে নেন,
-হ্যা হ্যা, ঠিক চিনেছো, তুমি নাদিম না, রাজিবের বন্ধূ?
স্মৃতি অবাক কন্ঠে,
-বাবা তুমি দুজনকেই চেনো? কিভাবে?
-পরে বলছি মা, আমি এবার আসছি রাজিব, সময় নেই।
রাজিবের হাস্সোজ্জ্বল কন্ঠ,
-জি আংকেল, বাই।
স্মৃতি আনুর নির্লজ্জতা খেয়াল করে অনেক আগে থেকে নিজেই লজ্জা পেয়েছে, কারণ সাইমন চৌধুরীর সামনেও রাজিবকে ঠিক সেভাবেই জড়িয়ে ছিলো। আরও একবার পেছনে ফিরে ওর অধপতন অবলোকন করলো।
অজান্তেই সামনে মুখ ফেরানোর ঠিক আগেই নাদিমের সাথে দৃষ্টি বিনিময় হয়ে যাওয়ায় দ্রুত সামনে তাকায় স্মৃতি।
বাবার পাশে গাড়ীতে বসে স্মৃতি মাথা নিচু করলো,
-বাবা তুমি আমাকে হ্যান্ডশেক করতে বললে কেন? এটা তো ঠিক হলোনা বাবা।
-মা তুমি আধুনিকা, একথা বলা কী তোমাকে মানায়? আর কাল থেকে দেখছি মাথা ডেকে বাইরে বের হচ্ছো তোমার কী হলো স্মৃতি? মানুষ তোমাকে ব্যাকডেটেড বলবে মা।
স্মৃতির আশ্চর্য হওয়া সাইমন চৌধুরীর দৃষ্টি এড়ায়না,
-আমি সত্যি বলছি স্মৃতি, দুনিয়াতো দুদিনের এখানে আনন্দ, ফুর্তি করা উচিত, ইচ্ছেমতো ঘোরো, খাও আর যতো পারো ষ্টাইল করো।
-বাবা তুমি একথা বলছো, কিন্তু রুবিনা আপু যে………
রেগে যান সাইমন চৌধুরী,
-ঐ থার্ড ক্লাস মেয়ের সাথে একদম মিশবেনা, কোন কথা শুনবেনা।
বাবাকে রেগে যেতে দেখে চুপ হয়ে যায় স্মৃতি, গাড়ী নিজের গতিতে চলতে থাকে, আর স্মৃতি বাবার বলা কথাগুলো ভাবতে থাকে, খুব আকর্ষণীয় কথাগুলো, কিন্তু বাস্তব সৌন্দর্য যে এর মধ্যে নেই তা স্মৃতি খুব ভালো ভাবে জেনে গেছে। বাবার কর্কশ কন্ঠ শুনে চমকে ওঠে স্মৃতি,
-ড্রাইভার গাড়ী দ্রুত চালাতে পারোনা?
স্মৃতি বাবার এ পরিবর্তন আজই লক্ষ্য করলো ওর বাবা এভাবে অযথা কখনো রাগ করতোনা, কাউকে ভুল করলেও ধমক দিতনা।
মৃদু কন্ঠ স্মৃতির,
-বাবা ডেভিড কে?
-আমার বন্ধু কেন? ও তোমাকে ফোন করেছিলেন তাই বলছো?
-হ্যা বাবা।

বাসায় পৌঁছে শপিং ব্যগ ড্রয়িং রুমের ছোফায় ছুড়ে দিলো স্মৃতি, এরপর ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে মায়ের কাছে গেলো, সন্ধা পেরিয়ে গেছে মায়ের চিন্তত মুখ দেখে অবাক হয়ে,
-মা কী চিন্তা করছো?
-তোমার বাবা আসলোনা?
-না বাবার বিজনেস মিটিং আছে, তুমি জানোনা, বাবা আমাকে গেটে নামিয়ে চলে গছেন।
– অ কী কিনেছো?
-দেখাবো মা?
-না তুমি পড়তে বসো নাস্তা নিয়ে আসছি আর ওগুলো পরে আমি দেখে নেবো।
-আচ্ছা মা ঠিক আছে ।
রুমে ঢোকার আগে ড্রয়িংরুমের বুকসেলফে অর্থসহ কুরআনের দশটি খন্ড দেখে,
-রুবিনা আপু এসেছিলো?
-হ্যা তোমার জন্য কুরআন গিফট করে গেছে, আর প্রতিদিন পড়তে বলেছে।
-হ্যা মা পড়বো, পড়া দরকার, আমার রুমের বুক সেলেফ রাখি মা?
-তাই করো, আমিও তাই ভাবছিলাম।
স্মৃতি নিজের রুমে ঢুকলো।চলবে……

ধারাবাহিক উপন্যাস “নিয়ন্ত্রিত পরিণতি” পর্ব-৫

images

 

নাসরিন সিমা : বাসায় যাওয়ার জন্য একা বের হয় স্মৃতি। মাকে ফোন করলেও হতো কিন্তু স্মৃতির ইচ্ছে করছেনা, মায়ের এই নিয়ে যাওয়া হঠাৎ এই মুহুর্ত থেকে খুবই বিরক্তিকর মনে হতে লাগলো। সমস্ত নিয়মের গন্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে ইচ্ছে করছে স্মৃতির।

বাসায় ঢুকেই বাবার মুখোমুখি হয়, সাইমন চৌধুরীর শংকিত কন্ঠ,
-এ কী তুমি এখন একা?
স্মৃতি ইতস্তত করে,
-না মানে আসলে আজ কোচিং ছিলনা, না ছিলনা নয়, স্যারের বাবা মারা যাওয়ায় কোচিং হয়নি।
সাইমন চৌধুরী,
-ফোন করনি………
স্মৃতি দ্রুত নিজের রুমে ঢুকে যায়, ওর নিজেকে আড়াল করে রাখতে ইচ্ছে করছে এই মুহুর্ত থেকে।

আনমনা স্মৃতি সন্ধার পরে চুপচাপ বসে আছে, আনুর কলের অপেক্ষায়। ঠিকই আনুর কল আসে আগের মতো বিরক্তির সামান্য ছাপও নেই স্মৃতির মধ্যে, রিসিভ করে স্মৃতি কিছু বলতে চেয়েছিল কিন্তু আনুর কথায় থেমে যায়,
-জানো স্মৃতি রাজিব খুব রোমান্টিক, ও খুব ভালোবাসে আমাকে আজ নিজের গাড়ীতে করে মার্কেটে নিয়ে গিয়েছিলে, অনেক দামি একটা ড্রেস কিনে দিয়েছে, কসমেটিক্স গহনা স্মৃতি আমি খুব খুশি খুব খুব……
-তুমিতো তাহলে খুব লাকী আনু, কতোক্ষণ ছিলে?
-এইতো এখুনি ফ্রেশ হয়ে তোমাকে কল করলাম।
-এখন বলো বিয়ে করছো কবে?
-বিয়ে? সে বিষয়ে এখনও কথা হয়নি, বেশী অপেক্ষা করতে হবেনা স্মৃতি যদিও ওর মাষ্টার্স শেষ হয়নি তবুও…
-ভালোতো, তবে আনু তোমার বাবা মা ওনাকে পছন্দ করবেন কী না সেটা লক্ষ্য রাখা উচিত।
-আরে রাখো, ছোট বেলা থেকেই শুনে এসেছি এটা নেই সেটা নেই, বিদঘুটে পরিস্থিতি আর ভালো লাগেনা এখন মুক্তির রাস্তা পেয়ে গেছি, এই পথ থেকে সরার কোন ইচ্ছে আমার নেই।
স্মৃতি কারো আসার শব্দ পেয়ে,
-রাখছি আনু কেউ আসছে পরে কথা বলবো।
ভেতরে ঢুকলো একটা মেয়ে কন্ঠে তার স্নিগ্ধতা,
-আসসালামু আলাইকুম।
-ওয়ালাইকুম আস সালাম…
-আমি রুবিনা বিনতে আব্দুল্লাহ দোতলায় এসেছি আপনার সাথে পরিচিত হতে এসেছি।
-অ আপনি বসুন, আমি তাসনিয়া চৌধুরী স্মৃতি। পড়াশুনা কোন পর্যায়ে?
-অনার্স সেকেন্ড ইয়ার, গণিতে, আপনি?
-মেডিকেলে ভর্তির জন্য কোচিং করছি।
স্মৃতি রুবিনার হাতে একটা বই দেখতে পেলো, বললো,
-আপনার হাতে কী বই ওটা?
-দেখবে? তুমি বললাম, তুমিতো ছোটই হবে।
-ঠিক আছে, দেখি বইটা।
সুফিয়া চৌধুরী ভেতরে ঢোকেন, হাতে নাস্তার ট্রে,
-রুবিনা খাও মা।
স্মৃতি অবাক কন্ঠে,
-তুমি চেনো ওনাকে?
-হ্যা চিনিতো কাল এসেছিলো তুমি ছিলেনা, খেয়ে নাও তোমরা। বেরিয়ে গেলেন সুফিয়া চৌধুরী।
-কী ধরণের বই আমি আসলে পড়তে পারবনা, সামনেই এ্যাডমিশন টেষ্ট।
-খুব ভালো বই, খিলাফতের দায়িত্বভিত্তিক। মানুষ কেন সৃষ্টি হয়েছে? তার দায়িত্ব কী?
-অ নামাজ রোযা নিয়ে?
রুবিনার অবাক হওয়ার প্রয়োজন ছিলো কিন্তু হয়না, সে দেখেছে খিলাফতের দায়িত্ব বলতে বেশিরভাগ মানুষ শুধু নামাজ রোযা বোঝে।

-আমাকে কিছুক্ষণ সময় দেবে? স্মৃতি।
-অবশ্যই।
-আমি তোমাকে একটা ঘটনা বলছি, ইদানিং কিছু খ্রিষ্টান পাদ্রী সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, তাদের উদ্দেশ্য কী জানো?
-কী?
-তারা মুসলমানদেরকে খ্রিষ্টান বানিয়ে ফেলছে, বিভিন্ন্ ধরণের লোভ দেখিয়ে, ট্র্যাপে ফেলে, মোটকথা যেকোন মূল্যে তারা এই কাজটা করছে।
আর যারা ইসলামকে সঠিকভাবে বোঝেনা তারা খ্রিষ্টান হয়ে যাচ্ছে। এজন্য সবচেয়ে আগে ইসলামকে জানা জরুরী।
স্মৃতি মনোযোগী হয়, হতবাক হয়ে যায়।
রুবিনা ওর মনোযোগ দেখে মনে মনে আল্লাহকে ধন্যবাদ জানায়, আর বলে,
– এই বইটাতে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় আছে যেমন মানুষকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে? এর উত্তর হলো, ইবাদাত করার জন্য, এখন প্রশ্ণ আসতে হবে ইবাদাতটা কী? নামাজ রোজা হজ্জ যাকাত এই গুটিকয়েক ফরজ কাজগুলো করলেই ইবাদাতের হক আদায় হয়ে যাবে?
না হবেনা, এই কাজগুলো নিজে করতে হয় অন্যকে করার জন্য আহবান করতে হয়,নামাজ তোমাকে পড়তে হবে অন্যকে পড়ার জন্য বলতে হবে তুমি ভেবে দেখ তুমি একা কতজনকে বলতে পারছো, খুব বেশী পারবেনা তাই সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা প্রয়োজন। আর এই সব ফরজের বড় একটা ফরজ আছে জানো তুমি কী সেটা?
স্মৃতি মৃদু কন্ঠে,
-না আপু জানিনা।
-সেটা হলো কুরআনের বিধানকে রাষ্ট্রিয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠত করা, সংবিধান হিসেবে, মানুষের গড়া আইন বিধান বাদ দিয়ে কুরআনের বিধান প্রতিষ্ঠত করা, তাহলেই মানুষ বাধ্য হবে অন্যায়কে বর্জন করতে, দেখবে সবাই নামাজ পড়ছে, কুরআন পড়ছে, সবসময় সত্য কথা বলছে,পর্দা করছে।
রাসুল (স) বলেছেন সানা থেকে হাজরামাউত পর্যন্ত, এই ধরো আমাদের দেশে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত একজন নারী একাকী পথ চলবে কিন্তু কোন পুরুষ তার দিকে বাজে দৃষ্টিতে তাকাবেনা……
বিস্মত কন্ঠ সমৃতির,
-তাই কি কখনো হবে আপু?
-হ্যা তাই, আসলে এক দিনে বলে বুঝানো কঠিন, তুমি কুরআন পড়তে পারো?
-হ্যা আপু পারি, গ্রামের মক্তবে শিখেছিলাম।
-অর্থসহ কুরআন পড়েছো কখনো?
-না পাওয়া যায়?
-হ্যা, আমার কাছে আছে, দিয়ে যাবো, প্রতিদিন একটা সময় কুরআন পড়লে, অর্থ ব্যাখ্যাসহ, এরপর হাদিস পড়বে, দেখবে কতো কিছু অজানা আমাদের, এভাবেই জানতে হবে, কুরআন সব বিজ্ঞানের মূল উৎস, এটাকে না জানলে দুনিয়াবী শিক্ষার কোন মূল্য নেই স্মৃতি, মৃত্যুর পর শুধু হায় হায় করতে হবে।
এবার রুবিনা মুচকী হাসে,
-ছোট খাটো একটা লেকচার দিয়ে ফললাম তাইনা? তোমার সময় নষ্ট করে…
-না না, আমি তো এসবের কিছুই জানতামনা, তোমাকে বরং ধন্যবাদ দেয়া জরুরী।
-না স্মৃতি ধন্যবাদের কিছু নেই, তুমি পড়ো, একটা সময় নির্দিষ্ট করে পড়তে থাকো জানতে পারবে, আমি তোমাকে আরো বই দেবো এখন আমি আসি।
রুবিনা চলে গেলে, স্মৃতি কিছুক্ষণ ভাবে ওর কথাগুলো নিয়ে, একটু ঘোরের মধ্যে পড়ে থাকলো যেন।
বাবার ডাক শুনে বাস্তবে ফিরে আসে, ডিনার করতে ডেকেছে।
খাবার টেবিলে সাইমন চৌধুরীর গম্ভীর কন্ঠ,
-ঐ মেয়ে কেন এসেছিলো?
-বাবা খুব প্রয়োজনীয় কথা বললো জানোতো?
মুখের খাবার শেষ করে স্মৃতি,
-বাবা তুমি কী নামাজ পড়ো? মাকে পড়তে দেখেছি তোমাকেতো দেখিনা বাবা নামাজ পড়তে। সাইমন চৌধুরী বিমর্ষ হয়ে গেলেন কিন্তু কিছু বললেননা, স্মৃতিও আর কথা বাড়ালোনা বাবাকে পর্যবেক্ষন করলো কিছুক্ষণ।
ডিনার শেষ করে রুমে গিয়ে পড়তে বসলো। চলবে……

ঘাতক

facebook-front_179_2232542b-400x250অপরাজিতাবিডি ডটকম : আগামীকাল অ্যাসা্ইনমেন্টের পেপারস জমা দিতে হবে। এরপর প্রেজেন্টশন এর ঝামেলা গ্রুপের সবাইকে কল করে পাওয়া যাচ্ছে না। এতগুলো চিন্তা মাথার মধ্যে যেন কাকের বাসার মতো জট পাকিয়ে যাচ্ছে। মাথা বো বো করছে। এক কাপ গরম গরম কফি হলে মন্দ হতো না! আক ঝাটকায় আজটগুলো খুলে যেত মেজিকের মতো। মাকে বলি না থাক, চিন্তা ঘুরিয়ে নিল। নিজেই কফি মেকারে বানিয়ে আনল কফি । পিসির সামনে বসলো জুতসই করে।

হ্যা পেপারস রেডি করার আগে ফেসবুকের মাঠটা একটু ঘরেই আসিনা কেন! ওপেন করে দেখি চেটিং এর মাঠে কে কে খেলছে জেনি আর রুমা থাকলে এক হাত বকা ঝকা করা যাবে। গত পরশুদিনের আগের দিন থেকে কল করেও কাউকে পাচ্ছি না কেন?

রিফাত ফেসবুক ওপেন করেই আতকে উঠলো! এ কি ! এ যে অবিশ্বাস্য! এ হতেই পারে না। এটা কি করে হতে পারে কেউ দুষ্টুমি করে এ খবর দিচ্ছে কি নানা অনেকেই সেড হচ্ছে এ কেমন করে হয় নি:শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। হাত পা কাপতে শুরু করেছে। বুকের ভিতরটায় হাড়টবীট বেড়ে গিয়ে মনে হয় মুগুর পিটাচ্ছে কী ঘটলো? ধপ করে বসে  পড়লো চেয়ারটায় তাড়াতাড়ি মাউস্টা চালাতে গেল পারল না। বজ্রাহতর মতো আঙ্গুলগুলো অসাড়, থান্দা। কিুছুতেই যেন কী বোর্ড চালাতে পারছি না।

কী করব? মাকে বলবো? না, এতো রাতে মাকে বলে মায়ের টেনশন বাড়িয়ে মাকে অসুস্থ বানানো ঠিক হবে না। রুমা কী জানে? হ্যা রুমাকে ফোন করি ! কল দিতেই পেয়ে গেল-

রুমা , তুই কি কিছু জানি খবর? ও প্রান্ত থেকে কণ্ঠস্বর ভারী শোনাল , মনে হল কান্না চেপে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা বৃথা হচ্ছে।

রুমা আমি তো বিশ্বাস করতে পারছি না! রিফাতের কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে উঠলো । ওপ্রানইত থেকে অনেক কষে। কথা বের হল।

হ্যা, রিফাত কেমন করে সব এলামেলো হয়ে গেলা! আমি জেনীকে ফোন করে না পেয়ে ওদের বাসায় গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখলাম আর শুনলাম— আমি সহ্য করতে পারলাম না রে!

বলে বুকভাঙ্গা চাপা কান্নার গমকে ভেসে আসলে । কান্না থামিয়ে বলল

হ্যা রিফাত , তুই সকাল বেলা ক্যাম্পাসে আয়, তাড়াতাড়ি আসিস। সব ঘটনা ওখানে বলা যাবে, কেমন!

সারাটা রাত দুচোখের পাতা এক করতে পারলাম না। এসাইনমেন্ট তো চিন্তা থেকে উড়ে গেছে; মাকেও কিছু বলতে পারিনি। মগজের মধ্যে জেনীর চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।

অথচ গত পরশুদিনের আগের দিন গ্রুপের সবাই যখন স্টাডিতে বসে পরবর্তী প্রেজেন্টেশনটা সেট করছিল জেনী তখন আনমনা হয়ে যাচ্ছিল। কোথায় কোন দিগন্তে যেন হারিয়ে যা্চ্ছিল মাঝে মাঝে । রুমা ওর ধ্যান ভঙ্গ করল।

-কি রে কার ধ্যানে মগ্ন হয়েছিস? মন দিয়ে শোন কি করবি!

-অ্যা ! ও হ্যা বল কি বলছিলি?

না তুই মনে হয় অন্য কিছু ভাবছিস? কি হয়েছে তোর?

-না না, তেমন কিছু ভাবছিনাতো?

তাহলে আয় কাজগুলো গুছিয়েনিই! বলে রুমা, রিফাত সবুজ সবাই কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলো।

 

জেনী, শরীর খারাপ লাগছে এই অজুহাতে আগেই বাসায় চলে আসলো । এরপর এই কদিনেই এমন কী ঘটলো যে একটি জীবন এক ইতিহাস রচনা করলো! মানুষের জীবনটা কী এমনই! যে কোন মুহুর্তে রচিত হতে পারে মর্মান্তিক বা সুখকর কোন ইতিহাস যা কোন বইতে লিখা হয় না, কিন্তু কোন কোন হৃদ্বেয় হয় রক্তক্ষরণ।

পরদিন ফজরের নামাজের পর আকাশে সুবহে সাদেকের বিমূর্ত রুপ দেখার সৌভাগ্য হল রিফাতের । আজ রুমার কথামত ক্যাম্পাসে তাড়াতাড়ি যাওয়ার কথা। জেনীর বিষয়ে সব কথা না জানা পর্যন্ত অশান্ত মঙ্গে কিছুতেই বশ মানাতে পারছে না।

 

সকালবেলা ক্যাম্পাসে শুনশান নিরবতা। দু একজন ছাত্রছাত্রীকে দেখা যাচ্ছে কাধে ব্যাগ ঝুলিয়ে যে যার গন্তব্যে দ্রুতলয়ে চলে যাচ্ছে। রিফাত চঞ্চল পায়ে স্টাডিতে ঢুকলো। রুমার হিজাবের রঙ আর ডিজাইন দেখে সহজেই পেয়ে গেছে ওর অবস্থান। সে আগে থেকে স্টাডিতে বসে আছে। জানালার গ্রীলে মাথা ঠেকিয়ে উদাসভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।

রিফাত সন্তর্পনে ওর কাছে এস আস্তে করে ওর কাধে হাত রাখলো। রুমা চমকে যায়নি। ওর দিকে না তাকিয়েই ওর হাতটা চেপে ধরল। বুঝা গেল ওর চোখ দিয়ে অবাধ অশ্রুধারা ঝরছে। রিফাত রুমার পাশে বসলো। ওর চোখও বাধ মানল না। রুমা নিরবতা ভঙ্গ করল-

 

জেনীর জীবনে যে এমনটা ঘটবে, আমি ভাবতেও পারিনি।

রুমা তুই কি জানিস সব বল আমাকে! আমি আর অন্ধকারে থাকতে পারছিনা। আরে আসতে কথা বল সবাই কি ভাববে বলতো?

স্টাডিতে ওরা ছাড়া আরো কয়েকজন পড়াশুনা করছিলো। কেউ কেউ আজকের খবরের কাগজে বড় বড় হেডলাইনে লিখা —‘বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রীর নিখোজ’ এটা প্রায় সবাই খবরের কাগজের উপর হুমড়ি খেয়ে খবরটা গিলছে যেন। আর ফিস ফিস গুঞ্জন —।

রিফাত আমি জেনীর বাসায় ফোন করেছিলাম কে একজন ধরল আমি কথা বললাম

হ্যালো কে আমি রুমা বলছি জেনীকে দেয়া যাবে? আমাকে চিনে ফেলে আলী চাচা। আপা আমি আলী মিয়া কইতাছি! আপা আপনে একটু বাসায় আসবেন তাড়াতাড়ি! আমাদের খুব বিপদ! আপনে আইলে সব বুঝবেন, দয়া কইরা একটু তাড়াতাড়ি আসেন কেমন?

কেনো? কী হয়েছে? আলী চাচা?

 

ফোনে কওন যাইব না আপনে আসেন এক্ষনি!

হ্যা হ্যা আমি আসছি!

 

দ্রুত একটা রিক্সা নিযে চরে আসলাম কলিং বেল টিপতেই আলী চাচা দরজা খুলে ইলারায় জেনীর আব্বু সালাম সাহেবের ঘর দেখিয়ে চুপ থাকতে বললো। তাকে ডাক্তার ওষুধ খাইয়ে ঘুম পড়িয়ে রেখেছেন। নির্ঘুম টেনশন, ইত্যাদি উচ্চরক্তচাপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। আমাকে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে আলী চাচাও বসলো। চাচা কি হয়ছে বলূন, আমার তো খুব ভয় লাগছে।

হ বলি- সেদিনের ঘটনা আলী চাচা বললেন—

জেনির আব্বু অস্থিরভাবে পায়চারী করছেন। হঠাৎ লোডশেডিং। দু্ এক ঘন্টা পর পরই লোডশেডিং। বিরক্ত জনসাধারণ। কিন্তু কোনো প্রতিবাদ নেই। দু হাজার সালের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার  যদি এই দুরবস্থা হয় তাহলে দেশে তো আর আবার তলাহীন ঝুড়িতে পরিণত হবে; এসব ভাবতে ভাবতে পায়চারী করছেন আর জেনীর অপেক্ষা করছেন। হঠাৎ মনে হল কে যেন এসছে। আলো না থাকাতে চিনতে পারলেন না, কে কে ওখানে?

জেনীর নিস্তেজ নিরুত্তাপ জবাব

আমি জেনী, আব্বু

ওহ তুমি এসছো। এতো দেরী করলে কেন মা! আমি যে কী চিন্তায় ছিলাম। প্রেশারটা  বোধ হয় বেড়েছে।

জেনী অবসন্ন শরীরটা টেনে নিযে ঘরৈ গেল। বাথরুম থেকে কাপড় পাল্টে শুয়ে পড়ল। হাসি বুয়া কিছুক্ষণ পর এস ডাকছে।–

 

আপা আসেন, খালু জান খাইতে ডাকে।

হাসু আপা আমি খাব না আপনি আর আব্বু খেয়ে নিন। আব্বুকে বুঝিয়ে বলবেন, আমি খাব না্ আমার ক্ষিদে নই।

আ্চছা যাই

 

পরদিন অনেক বেলা অব্ধি যখন কোন সাড়াশব্দ পাওয়া গেলনা জেনীর অজানা আশঙ্কায় সবাই আতঙ্কিত। দারওয়ান আলি হাসু বুয়া অনেক ডাকাডাকি করল কিন্তু কোন সাড়া নেই ভিতর থেকে সালাম সাহেব কাপতে কাপতে বসে পড়লেন। আলী বলল-

স্যার দরজা ভাইঙ্গা ফালান, স্যার।

আমি কিছু বুঝতে পাছি না , তোমরা যা হয় একটা কিছু করো। বলে তিনি মাটিতে বসে পড়লেন মাথায় হাত দিয়ে।

দরজা ভাঙ্গা হলোন। ভিতেরর অবস্থা দেখে সবাই স্তম্ভিত নিশ্চুপ; সবার শ্বাসপ্রশ্বাসও যেন বন্ধ হয়ে গেছে। কারও মুখে কোন কথা নেই।

খাটের উপর জেনীর সব কাপড় চোপড় পড়ে আছে সিলিং ফ্যানের সাথে শাড়ীর একপ্রান্ত বাধা । কিন্তু জেনী? জেনী কোথায়‍‍? ও ঘরে নেই। ঘরের ভিতরের দিক বন্ধ করে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু যাওয়ার আগে দুটো চিঠি টেবিলে উপর রেখে গেছে।

রুমা চিঠি দুটো রিফাত কে দিল

পড়ে দেখ।

তুই পড়েছিস?

হ্যা। সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়ে চুপ করে রইল। রিফাত দ্রুত হাতে চিঠি খুলে পড়তে শরু করলো। সেলুলয়েডের ফিতায় যেন সিনেমার দৃশ্যের মতো চোখের সামনে চলল ঘটনাগুলো—

একটি সাইবারক্যাফে বসে চ্যাট করছে জেনী-

অনেদকিন হয়ে গেলো আমাদের বন্ধুত্বের । তোমার কি ইচ্ছে করে না দেখা করতে?

কি যে বল? করে না আবার? চাতক পাখির মতো হা করে আছি, কবে এই ফেসবুকের না দেখা বন্ধুকে দেখবো! বলনা কবে দেখা হবে?

আমিও তো তোমাকে ?? এটা তো ঠিক না কি বল?

চলবে…………

 

অপরাজিতাবিডি ডটকম/আরএ/এ/১২ মে ২০১৪