banner

রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

Daily Archives: January 16, 2026

বাংলা নববর্ষ

 

রবিউল ইসলাম আওলাদ : নতুন উদ্দীপনা নিয়ে প্রতিবছর আসে বাংলা নববর্ষ। বাংলা নববর্ষ আমাদের আশা-আকাক্সক্ষা আর চেতনার প্রতীক। পহেলা বৈশাখের হাত ধরে নতুন বছরের যে আগমন ঘটে তা সমগ্র জাতিকে নতুন অঙ্গীকার ও চেতনায় জাগিয়ে তোলে। এদিন জেগে উঠে দেশ, জাগে বাংলাদেশের মানুষ। পুরনো বছরকে বিদায় দিয়ে বৈশাখের প্রথম দিনটাকে আমরা হাসিমুখে বরণ করি। দেশের মানুষ নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটিকে পালন করে। আবহমান কালথেকেই এ দেশের বাঙলা নববর্ষ উদযাপন করার রেওয়াজ চালু আছে।

 

বৈশাখের এই দিনটিতে সারা দেশের মানুষ ফিরে পায় নতুন আস্থা ও বিশ্বাস। ফেলে আসা একটি বছরের কমতি, অপ্রাপ্তিকে দূরে ঠেলে নতুন বছরে এগিয়ে যাবার চেতনা প্রত্যয় সবাইকে উজ্জীবিত করে। এ জন্য পহেলা বৈশাখ আমাদের কাছে অনেক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন।

 

 

নববর্ষ নিয়ে আমাদের আগ্রহের শেষ নেই। এই নববর্ষের আগমন কিভাবে হলো তা নিয়ে কিছু জানা থাকা ভালো। বাংলা নববর্ষের প্রচলন কিন্তু হঠাৎ করে শুরু হয়নি। এর পেছনে রয়েছে একটি দীর্ঘ ইতিহাস। তবে সংক্ষেপে বলতে গেলে বাংলা সনের শরু হয় ৯৬৩ হিজরি, ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১১ এপ্রিল থেকে। আরবি হিজরি সালের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে জন্ম হয় বাংলা সনের।

 

মোগল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালের আগে এখানে হিজরি সনের প্রচলন ছিল। সম্রাট আকবর হিজরি বছরকে সৌর বছরে পরিণত করে নতুন ভাবে গণনা শুরু করেন। তিনি ফসল বোনা ও খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে এই নতুন সনটি চালু করেন। এই বাংলা সনের উদগাতা ছিলেন আকবরের ‘নওরতন’ সভার সদস্য আমীর ফতেহউল্লাহ সিরাজী।

 

নতুন বছরের উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্টীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগ। কয়েকটি গ্রামের মানুষ একত্রে মিলিত হয়। কোন খোলা মাঠে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। মেলাতে থাকে নানা রকম কুঠির শিল্পজাত সামগ্রীর বিপণন, থাকে নানারকম পিঠা পুলির আয়োজন।

 

এই দিনের একটি পুরনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন। এর মধ্যে থাকে নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা কিংবা কুস্তির।

 

 

পহেলা বৈশাখ আমাদের গ্রামীণ পরিবেশের এক পুরনো ঐতিহ্য হলেও যুগের আবর্তনে এতে এসেছে বেশ পরিবর্তন। ঐতিহ্যবাহী নাগরদোলা ঘুরণচরকি, সার্কাস , বায়োস্কোপ ইত্যাদির স্থলে এখন যন্ত্র ও বিদ্যুৎচালিত দোলা, চরকির প্রতিস্থাপন হয়েছে। সার্কাসের স্থলে যাদুপ্রদর্শন , টেলিভিশনে নাটক সিনেমা ইত্যাদি দেখানোর আয়োজন করা হচ্ছে।

 

শহরে নগরে বাংলা নববর্ষ এখন একটি বড় উৎসবে পরিণত হয়েছে। এদিনে শহরের লোকজন বিশেষ করে ছেলেমেয়েরা নববর্ষের জন্য নানা আঙ্গিকের তৈরি পোশাক পরিধান করে। রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরে সরকার ও নানা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে বের করা হয় শোভাযাত্রার। এতে হাজার হাজার মানুষ বিশেষ করে কিশোরকিশোরীরা অংশগ্রহণ করে। এসব মিছিলের বড় একটি বিষয় হলো নানা রঙের পোস্টার ও বিচিত্র মুখোষ। এই মুখোশগুলো সাধারণত মাছ, কুকুর বিড়াল, হাতি সাপ, বাঘ সিংহ মহিষ, বানর ইত্যাদি জন্তু জানোয়ারের মুখোচ্ছবি অনুকরণের তৈরি । তা ছাড়া যুবক যুবতীরা অনেকে মুখে ছাই-কালি মেখে অদ্ভুদ পোশাকে সজ্জিত হয়ে জঙ্গিরুপ ধারণ করে। নববর্ষে শহরের মানুষের অন্যতম আকর্ষন পান্তা আর ইলিশ মাছ।

 

সাম্প্রতিককালে পান্তা-ইলিশ পহেলা বৈশাখের উৎসবের প্রধান অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। এ নিয়ে এখন শহুরে নব্যধনিক ও উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের মাতামাতির শেষ নেই। ফলে পহেলা বৈশাখের দিন এখন শহরের অলিগলি, রাজপথ, পার্ক, রেস্তোরা, সর্বত্রই বিক্রি হয় পান্তা-ইলিশ।

 

এমনকি এখন অভিজাত হোটেলগুলোতেও শুরু হয়েছে পান্তা-ইলিশ বিক্রি এবং এই পান্তা -ইলিশ খাওয়া এখন এক শ্রেণির মানুষের বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু আবহমানকাল থেকেই পহেলা বৈশাখের সঙ্গে এই পান্তা-ইলিশের কোনো সম্পর্ক নেই। এটা শহুরে নব্য বাঙালিদের আবিষ্কার। এর মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতিকে সম্মান জানানোর পরিবর্তে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক এবং সাহিত্যিকরা।

 

 

বলা দরকার পহেলা বৈশাখ এদেশের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য আনন্দঘন একটি দিন। এটি খুশির উৎসব প্রাণের মেলা। নতুন দিনের শপথে আগামীর পথ চলার একটি বিশেষ চেতনার দিন পহেলা বৈশাখ।

 

অথচ আজকাল এদিনটি উৎসবের অনুষ্ঠানের আধিক্য নীতি-নৈতিকতার বিপরীতে বাড়াবাড়ি, অশ্লীলতা ও নগ্নতা পর্যবসিত হয়েছে। নববর্ষের উৎসব এক সময় হৃদয় আবেগের যে উচ্ছ্বাস ও প্রীতিময় আন্তরিকতা ছিল তা এখন কৃত্রিমতা ও হৃদয়হীন আচার অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। নাগরিক সভ্যতার যান্ত্রিক আগ্রাসন চাকচিক্য ও বাড়াবাড়ি নববর্ষের মুল চেতনাকে উদ্দেশ্যহীন করে তুলেছে। নববর্ষ আমাদের জাতীয় ঐক্য ও ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবির দিন হলেও এখন তা হিন্দি কনসার্ট ও বিজাতীয় আদলে সাজানো এক দিকশুন্য মেলায় পরিণত হয়েছে। এসব ব্যত্যয় ও নীতিভ্রষ্টতা বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতিকে পতনের দিকে পরিচালিত করছে বলে সুশীল সমাজের আশঙ্কা। এ বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। আমরা আশা করি, আমাদের নতুন প্রজন্ম এমন কোন কাজে গা ভাসিয়ে দেবে না, যার কারণে এই জাতির সৌন্দর্য , রীতি ও ঐতিহ্য হারিয়ে যাবার আশঙ্কা তৈরি হয়।

 

বৈশাখ যেমন আনন্দ বয়ে আনে তেমনি বৈশাখের রয়েছে আরেকটি ভয়ঙ্কর রুপ। এ সময় প্রকৃতি রুদ্ররুপ পরিগ্রহ করে। কালবৈশাখীর ঝড় অনেক সময় দেশের জন্য বয়ে আনে সীমাহীন কষ্ট। ঝড়ের তা-ব দেশের অনেক এলাকায় ধ্বংসলীলা ডেকে আনে।

 

আমরা পহেলা বৈশাখকে প্রাণঢালা অভিবাদন জানাই। আমরা চাই এই বৈশাখ আমাদের নতুনভাবে জাগিয়ে তুলুক। একটি গৌরবান্বিত স্বাধীন জাতি হিসেবে মাথা উচু করে দাড়াবার সাহস ও শক্তির উৎস হোক-এই নববর্ষ। পহেলা বেশাখ হোক প্রেমের গৌরব ও মহত্বের সৌরভে তাৎপর্যময়। নববর্ষ নির্ভিক চিত্তের গৌরবে উদ্ভাসিত হোক এটাই আমাদের কামনা। বাংলা নববর্ষ তোমাকে জানাই শুভেচ্ছা। শুভ নববর্ষ।

 

অপরাজিতাবিডি ডটকম/আরআই/এ/১৮এপ্রিল, ২০১৪

রসনায় পয়লা বৈশাখ

 

সা বি রা সু ল তা না : কয়েক দশক আগ থেকে পয়লা বৈশাখে পান্তাভাত, ইলিশ ভাজা ও বিভিন্ন ভর্তাসহযোগে খাওয়ার প্রচলন ব্যাপকভাবে শুরু হয়। এর আগেও বিভিন্ন ধরনের খাবারের ব্যবস্থা করা হতো।

 

সব খাবারের মধ্যে মূলত মিষ্টি ও মিষ্টিজাতীয় খাবার খাওয়া ও আপ্যায়নে ব্যবহার করা হতো। বিভিন্ন জায়গার নামকরা মিষ্টি অনেকেই আনাতেন অতিথি আপ্যায়নের জন্য। যেমন জামতলার রসগোল্লা, টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচম, মুক্তাগাছার মণ্ডা এরকমের দেশের বিভিন্ন জায়গার প্রসিদ্ধ মিষ্টি অনেকেই ব্যবস্থা করতেন। মূলত হালখাতা অনুষ্ঠানে আগত অতিথিদের জন্য ব্যবসায়ীরা এসব মিষ্টির ব্যবস্থা করতেন। অতিথি আপ্যায়ন ছাড়াও আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীদের মধ্যেও মিষ্টি বিতরণ করার রীতি ছিল।

 

এ ছাড়া বাড়িতে রান্না করা হতো বিভিন্ন ধরনের পায়েস, পিঠা, নাড়–, হালুয়া প্রভৃতি।

 

 

বৈশাখের প্রথম দিনে মেলা বসত। সেই মেলায় মাটির তৈরি অনেক খেলনা বিক্রি হতো। তার সাথে দেশীয় খাবার, খই, মুড়ি, মুড়কি, জিলেপি, তিলের খাজা, মুরালি, চিঁড়ার মোয়া, মুড়ির মোয়া থেকে শুরু করে আরো অনেক ধরনের খাবার বিক্রয় হতো, যেগুলো একেবারে আমাদের গ্রামবাংলার নিজস্ব খাবার হিসেবে পরিচিত ছিল।

 

এই মেলায় আরো একটি খাবার বেশ উল্লেখযোগ্য ছিল। সেটি হলো চিনির খেলনা। অর্থাৎ চিনি দিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় বানানো হতো হাতি, ঘোড়া, ময়ূর, পাখি, শাপলা প্রভৃতি। এগুলো এ মেলার একটা বৈশিষ্ট্য হিসেবে পরিচিত ছিল।

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলা নববর্ষ উদযাপন শুরু হয়েছে নতুন উদ্যোমে। পান্তাভাত আর ইলিশ ভাজার প্রচলনও শুরু হয়েছে তখন থেকেই। সময়ের সাথে সাথে এই রেওয়াজ এখন বেশ পাকাপোক্ত হয়ে গেছে। এখন পয়লা বৈশাখ মানেই পান্তাভাত আর ইলিশ ভাজা থাকতে হবে। সেই সাথে যোগ হয়েছে নানা রকম ভর্তা। শুঁটকি ভর্তা, মরিচ ভর্তা, কাঁচকলা ভর্তা, লাউপাতা ভর্তা, টমেটো ভর্তা, বেগুন, সর্ষে ভর্তা, কালোজিরার ভর্তার এভাবে ভর্তার একটা দীর্ঘ তালিকা তৈরি করাই যায়। বছরের অন্য সময়গুলোতে ভর্তা তেমন খাওয়া না হলেও এ দিনটিতে বাঙালি বেশ উৎসাহ নিয়েই ভর্তা খেয়ে থাকে।

 

তবে পয়লা বৈশাখে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ইলিশ মাছ। ইলিশ ছাড়া যেন এখন আর পয়লা বৈশাখ উদযাপন ভাবাই যায় না। সময়ের সাথে সাথে ইলিশ খাওয়ায়ও এসেছে বৈচিত্র্য। শুধু ভাজা দিয়ে এখন আর না। সেই সাথে যোগ হয়েছে সর্ষে ইলিশ, ইলিশ পাতুরি, ভাপা ইলিশ, ইলিশ পোলাও আরো কত কী। ইলিশের এত পদ বাঙালির রসনাকে নতুনা করে পরিতৃপ্ত করে।

 

আধুনিক সময়ে পয়লা বৈশাখে খাবারের তালিকা বেশ দীর্ঘ হয়েছে। বাঙালির প্রাচীন রান্নার অনেক খাবার নতুন করে এখন বেশ প্রচলিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আমডাল, আম-তেঁতুলের শরবত, আমের ভর্তা, চিঁড়ার নাড়–, তিলের নাড়–, গুড়ের সন্দেশ, পায়েস, তরমুজের ঠাণ্ডা, সবজি নিরামিষ, সর্ষে ইলিশ, আমের লাচ্ছি, কাঁচা আমের সালাদ, লাউপাতার ভর্তা, কাঁচা আম, বাতাসি চচ্চড়ি, চালের চচ্চড়ি, সজনে ডাল, লাউয়ের খাট্টা আরো অনেক কিছু। পয়লা বৈশাখ আরেক আকর্ষণ কাঁচা আম। কাঁচা আম দিয়ে নানা রকমের খাবার খাওয়া হয় বৈশাখের প্রথম দিনটিতে।

 

সেই সাথে নানা রকম মিষ্টি ও মিষ্টি খাবারও যোগ হয় নববর্ষে উদযাপনের খাবারের তালিকায়। বাংলার প্রাচীন খাবারের ঐতিহ্য নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার মধ্য দিয়েই উদযাপিত হয় আমাদের বাংলা নববর্ষ, পয়লা বৈশাখ।

 

অপরাজিতিবিডি ডটকম/আরএ/এ/১৮এপ্রিল,২০১৪