banner

রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

Daily Archives: January 16, 2026

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের বিশেষ আয়োজন

Udisa_Emon_Bg_801012348

 

অপরাজিতাবিডি ডটকম: আজ ৪৩তম মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস । আমাদের কাছে দিনটি অনন্য সাধারণ । তেতাল্লিশ বছর আগে যে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছিল সেই যুদ্ধে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অংশগ্রহণ ছিলো উল্লেখ করার মতো। এই দিবস উপলক্ষে নারী  মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে অপরাজিতাবিডি ডটকমের বিশেষ আয়োজন ।

মুক্তিযুদ্ধে সাংবাদিক রাশেদা আমিন

111

 

রবিউল ইসলাম আওলাদ:  সাংবাদিক রাশেদা আমিন। বাবা মরহুম মো: হাবিবুল্লাহ। মাতা মরহুমা রাজিয়া বেগম। ছোট বেলা কেটেছে দুড়ন্তপনা আর দুষ্টমির মধ্য দিয়ে। এক পলকে ঘুরে এসেছে গ্রামের এই মাথা থেকে ওই মাথায়। মার্বেল থেকে শুরু করে ক্রিকেট সব ধরনের খেলায় পারদর্শি ছিলেন রাশেদা আমিন। বাবা-মার স্বপ্ন ছিল একজন আদর্শ এবং স্বাধীনচেতা হবেন তাদের আদরের সন্তান রাশেদা । পাঁচ বোন এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়।এতো গেল ছোট বেলার কথা। রাশেদা আমিন ছাত্রজীবনের বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন দায়িত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

 

১৯৬৬ সালে কলেজ জীবনের শুরতেই জড়িয়ে পরেন ছাত্র রাজনীতিতে। তৎকালীন সময় চট্টগ্রাম জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। চট্টগ্রাম কলেজের ক্যাবিনেটের নির্বাচিত সদস্য ছিলেন রাশেদা আমিন। 

 

তিনি মহান স্বাধীনতার একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা । রাজনৈতিক আদর্শ থেকেই মুক্তিযুদ্ধে যোগদান। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা মাধ্যমেই মুলত মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন রাশেদা আমিন।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থাকাকালে রাজনীতির মাঠের আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে ভাবে জড়িয়ে পড়েন। তারই ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে ১০-১৫ জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে অস্ত্র ট্রেনিং করেন। এরপর যুদ্ধের সময় শরিয়তপুরের নিজ এলাকায় মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পরেন। তাদের বাড়িতেই মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ছিল। তার পরিবারের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের সাথে জড়িত ছিলেন। রাশেদা আমিন মহিলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ এর কার্যকরি পরিষদের সদস্য।

 

দেশের জন্য যুদ্ধ করেই তিনি ক্ষান্ত হননি। কর্মজীবন শুরু করেছিলেন সাংবাদিক হিসেবে। একজন নারী হিসেবে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন রাশেদা আমিন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী বার্তা সম্পাদক।

 

শুধু ডেস্কে নয়। রিপোর্টার হিসেবেও কাজ করেছেন। এমনকি দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের সংবাদকর্মী হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তিনি জার্মানী ও ভারতে সাংবাদিকতায় প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এছাড়ও তিনি কমনওয়েলথ প্রেস ইউনিয়ন প্রশিক্ষণ করেছেন। পেশাগত কারনে ভারত,পাকিস্তান,ভুটান,জার্মানী,যুক্তরাজ্য,কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে সফর করেছেন। বর্তমানে রাশেদা আমিন সাউথ এশিয়ান ওমেন ইন মিডিয়ার বাংলাদেশ চ্যাপ্টার এর প্রেসিডেন্ট। এছাড়া তিনি জাতীয় প্রেসক্লাবের কার্যকরী পরিষদের প্রথম নির্বাচিত মহিলা সদস্য ছিলেন। রাশেদা আমিন বাংলাদেশ মহিলা সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি।

 

রাশেদা আমিন মনে করেন, দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের সাথে নারীর উন্নয়ন জড়িত। দেশের বিশিষ্ট সাংবাদিক মরহুম আমিনুল আহমেদ চৌধুরীর সহধর্মিনী রাশেদা আমিন। এক ছেলে এক মেয়ের জননী। তিনি বর্তমানে অবসর জীবন যাপন করছেন। রাশেদা আমিনের ছেলেমেয়ে সবাই থাকেন দেশের বাইরে।

 

রাশেদা আমিন মনে করেন, ভৌগলিক স্বাধীনতার সাথে সাথে মানুষের মুক্তির প্রয়োজন। স্বাধীনতার ৪৩ বছরেও পুরোপুরি মুক্তি পায়নি বাংলাদেশের মানুষ। তিনি বলেন, সাংবাদিকতা মূলত পুরুষদের পেশা ছিল। তারপরও আমি এই পেশাকে বেছে নিয়েছিলাম দেশ গড়ার ব্রত নিয়ে।

 

অপরাজিতাবিডি ডটকম/আরআই/এ/২৬ মার্চ, ২০১৪

মুক্তিযোদ্ধা ফরিদা খানম সাকী

IMG_0819

 

রবিউল ইসলাম আওলাদ : ফরিদা খানম সাকী। বাবা মরহুম আব্দুল আলীম। মা মরহুমা লুৎফুন্নাহার বেগম। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় মহান স্বাধীনতার মুক্তিযোদ্ধা। জন্ম নোয়াখালী জেলা সদরে। বাবার সরকরি চাকুরী সুবাদে শৈশব কেটেছে তৎতকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন জেলায়। এছাড়া স্কুল জীবন কেটেছে নানার বাড়ি নোয়াখালী শহরে। নানার পরিবার আওয়ামী লীগ রাজনীতির সাথে জাড়িত থাকায় ইন্টারমিডিয়েট থেকেই জড়িয়ে পড়েন ছাত্র রাজনীতিতে। ১৯৬৫ সালে নোয়াখালী কলেজে ভর্তি হন ফরিদা খানম সাকী। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন মাস্টার্সে। ৬৯ এর গণঅভ্যূত্থানের আন্দোলনে জড়িত ছিলেন তিনি।

 

১৯৭০-১৯৭১ সালে যুক্ত হন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে। সে সময় থাকেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম রোকেয়া হলে। তৎকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি নুর-এ আলম সিদ্দিকীর এবং সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজের সাথে রাজনীতি করেন তিনি। ৭০’এর নির্বাচনে কাজ করেছেন সক্রিয় ভাবে। এ ভাবেই এই প্রতিবেদকরে কাছে নিজের স্মৃতি চারণ করেন ফরিদা খানম সাকী।

 

তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মার্চ  মাসে ১০-১৫ জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে অস্ত্র ট্রেনিং শুরু করি । পরে সদস্য সংখ্যা প্রায় ১৫০ জন হয়। পুরো মার্চ মাস আমাদের এই ট্রেনিং চলে। ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শুনার জন্য হলের সবাই সকাল থেকেই রেসকোর্স ময়দানের মঞ্চের সামনে বসে থাকি। 

 

ভাষনের পর থেকেই কেন্দ্র থেকে আমাদের বলা হয় যে কোন সময় যুদ্ধের নির্দেশনা আসতে পারে। গোপনে গোপনে সবার সাথে যোগাযোগ করার নির্দেশনা দেয়া হয়। আমার কাজ ছিল ঢাকা শহরের খিলগাঁও, পুরান ঢাকা, আজিমপুর ও সিদ্ধেশ্বরী এলাকার মেয়েদের ও তাদের অভিবাকদের স্বাধীনতা সম্পর্কে বুঝাতে এবং সহযোগিতার কথা বলতে। ছাত্রলীগের সদস্য ও সমর্থকদের মাঝে সচেনতা ও যোগাযোগ বৃদ্ধি করা। 

 

২৩ মার্চ পল্টন ময়দান থেকে সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে জাতীয় পতাকা নিয়ে ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর হতে পতাকা তুলে দেয়া হয়। ২৫ মার্চের আগে সকল ছাত্রীদের হল থেকে বের করে দেয়া হয়। কিন্তু কেন্দ্র থেকে নির্দেশ দেয়া হয় আমরা যেন হল থেকে না চলে যায়। সেই সময় আমি, মমতা আপা আর অনার্স পরীক্ষার্থী পাঁচ জন হলে ছিলাম। ২৫শে মার্চ রাত ৯টায় মিটিং শেষে হলে ফিরে আসি।

এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর আসতে শুরু করেছে পাক বাহিনীর আক্রমণের। ২৫শে মার্চ রাত ১১টায় হলের ভেতর থেকে গুলির আওয়াজ শুনে বের হয়ে দেখি সার্চলাইটের আলো আর গুলির শব্দ।

 

আমরা ভিতু হয়ে হলের ভেতরের গেট দিয়ে হল প্রোভোস্ট আক্তার ইমাম আপার বাসায় যায়। তাকে না পেয়ে আমরা হাউজ টিউটর সাইমা আপার বাসায় যাই। ততক্ষনে রোকেয়া হলের গেট ভেঙ্গে পাক বাহিনী ঢুকে মেয়েদের খুজতে শুরু করেছে। আমরা সাইমা আপার স্টোর রুমে কোন রকমে রাত পার করি। সকালে আরেক হাউজ টিউটর মেহেরুন্নেছা আপার বাসায় নিয়ে যায় আমাদের। ২৭ মার্চ কিছুক্ষণের জন্য কারফিউ প্রত্যাহার করা হয়। সেই সুযোগে ওয়ারিতে আমার ফুফা খান বাহাদুর নুরুল হকের বাসায় চলে আসি। বাবাও চিকিৎসার জন্য তার বাসায় এসেছিলেন। ১লা এপ্রিলে আমরা নোয়াখালী রওনা দেই। অনেক কষ্টে ৩ এপ্রিল আমরা নোয়াখালীতে পৌছাই।

 

এসে দেখি আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীলা কাজ শুরু করেছে। আমিও তাদেরকে সহযোগিতা করতে শুরু করলাম। ট্রেনিংয়ে পাঠানো জন্য লোকদের সংগঠিত করি। তখনও পাক বাহিনীর ওই এলাকাতে ঢুকেনি। ঠিক এক সপ্তাহ পরে পাক বাহিনী আমাদের এলাকায় ঢুকে পড়ে। প্রথমে পাক বাহিনী আমার নানার বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। আমরা নানার গ্রামের বাড়ি চলে যায়। এই বাড়িটা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের যোগাযোগস্থল। আমার মেজো মামা শাহাবুদ্দিন ইস্কান্দার বুলু মুক্তিযোদ্ধাদের সব রকম সহযোগিতা করতেন। একদিন রাতে নানার বাড়ির সামনে পাক বাহিনীরা আমার মামার হাত বেধে গুলি করে মেরে ফেলে।

 

আমরা ওই বাড়ি ছেড়ে বড় মামির বাবার বাড়ি চলে আসি। সেখানে দুই সপ্তাহ থাকার পরে মনি ভাই ও রব ভাইয়ের লেখা একটি চিঠি পাই। চিঠিতে লেখা ছিল আমরা যেন কোন গ্র“পের সাথে ভারতে চলে যাই।

 

তখন কুতুব নামে এক রাজাকার বাহিনীর কমান্ডারের সহযোগিতায় আমি, আমার ছোট বোন ও ভাই বর্ডার পার হয়ে আগরতালায় চলে যাই। সেখানে চিদোর ভিলা নামের এক বাড়িতে উঠি। বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএফএল) এর হয়ে সার্জেন্ট জহুরুল হকের ভাই আমিনুল হকের নেতৃত্বে মেজর কেবি শিং এবং মেজর শরমার কাছে প্রশিক্ষণ করি। আমি ব্যাকি আর গ্রেনেড ছোড়ার কাজ শিখি। ৭ ডিসেম্বর নোয়াখালী পাক বাহিনীর মুক্ত হওয়ার পর দেশে ফিরে আসি।

 

ফরিদা খানম সাকী বলেন, যে উদ্দেশ্যে ৪২ বছর আগে দেশ স্বাধীনের আন্দোলন করেছি। আজ স্বাধীনতার ৪২ বছরেও তা পূর্ণ হয়নি। যেদিন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে রাজনৈকিক নেতারা দুর্নীতি মুক্ত হবে। দেশের সৎ আদর্শবান লোকেরা দেশ নেতৃত্বে আসবে সেই দিন বঙ্গবন্ধুর সোনারবাংলা গড়ে উঠবে।

 

অপরাজিতাবিডি ডটকম/আরআই/এ/২৬ মার্চ,২০১৪

খালেদা খানম থেকে মুক্তি আপা

khaleda khanam

 

অপরাজিতাবিডি ডটকম,ঢাকা: শরীয়তপুরের সাহসী নারী খালেদা খানম৷ জন্ম ১৯৪৯ সালে। পিতা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ এবং মা রাজিয়া বেগম৷ শরীয়তপুরে জন্ম হলেও পিতার চাকুরির সুবাদে ছোট্ট থেকেই তিনি চট্টগ্রামে৷ নন্দন কানন স্কুল, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ এবং পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কেটেছে তাঁর শিক্ষা জীবন৷ ১৯৬৬ সাল থেকেই ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত৷ এরপর চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে পড়ার সময় তিনি আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে সামনের সারিতে চলে আসেন৷ দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য তিনি এতোটাই সক্রিয়ভাবে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে কাজ করতেন যে, শরীয়তপুর অঞ্চলে তাঁকে সবাই ‘মুক্তি আপা’ নামেই চিনতো৷

এছাড়া ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানেও সক্রিয় ছিলেন খালেদা৷ আর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তিনি মহিলা সম্পাদিকা হিসেবে নির্বাচিত হন৷ সেসময় চট্টগ্রামে মহিলা রাজনীতিকের সংখ্যা খুব কম ছিল বলে একইসাথে মহিলা আওয়ামী লীগের সাথেও কাজ করতেন খালেদা খানম৷

শুধু তাই নয়, তাঁরা পাঁচ বোনই রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন৷ ফলে তাঁদের বাড়ি ছাত্র লীগের ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিল৷ এমনকি আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ প্রায়ই তাঁদের বাসায় আসতেন, বৈঠক করতেন বলে জানান খালেদা খানম৷

মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকের ঘটনা সম্পর্কে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ শুরুর দু’দিন আগে ২৪শে মার্চ আমরা মিছিল-মিটিং করছি৷ নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমেদ চৌধুরী৷ তাঁর কাছ থেকে আমরা খবর পাই যে, চট্টগ্রামে জাহাজ থেকে অস্ত্র নামানো হচ্ছে৷ আমরা তখন সিদ্ধান্ত নিলাম জাহাজ থেকে অস্ত্র নামানো ঠেকাবো৷ তাই আমরা মিছিল করে বন্দরের দিকে রওয়ানা দিলাম৷ আমরা মহিলারা সামনে ছিলাম৷ এরপরেই ছাত্র লীগ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ছিলেন৷ কিন্তু আগ্রাবাদে গিয়ে আমরা কাঁদানে গ্যাস ও গুলির মুখে পড়ি৷ ফলে সেখান থেকে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং অস্ত্র নামানো আমরা ঠেকাতে পারিনি৷

২৬শে মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর খালেদা খানম এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা শরীয়তপুরে গ্রামের বাড়িতে চলে যান৷ কিন্তু দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য যিনি সেই কলেজ জীবন থেকেই আন্দোলন করছেন তিনি তো আর বাড়িতে গিয়ে চুপ করে বসে থাকতে পারেন না৷ সেখানে গিয়ে ভাবতে থাকেন কীভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে কাজ শুরু করা যায়৷ অবশেষে কীভাবে একদিন সেই সুযোগ তৈরি হলো তা জানালেন খালেদা খানম৷

তাঁর ভাষায়, একদিন দেখলাম একটা ছেলে আসল চাদর গায়ে দিয়ে৷ প্রথমে আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না যে, সে কে এবং কেন আসল৷ তারপর সে আমাকে দেখে বলল, আমি মুক্তিযোদ্ধা৷ মুক্তিযোদ্ধাদের একটা দল আসছে ভারত থেকে৷ তখন আমি তাকে আমাদের বাড়িতে রাখলাম এবং সব খোঁজ খবর নিলাম৷ এরপর স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ভারত থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল আসল৷ আমাদের বাড়িটা ছিল অনেক বড়৷ বাড়িতে অনেকগুলো ঘরও ছিল৷ ফলে আমরা আমাদের বাড়িটাকে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি বানিয়ে ফেললাম৷ কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের খবর গ্রামের কেউ যেন পাক সেনা কিংবা তাদের দোসর রাজাকারদের না দেয়, সেজন্য আমি এবং আমার বোন রাশিদা আমিন গ্রামের মহিলাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বোঝাতে শুরু করলাম৷ গ্রামের মানুষ তো এটাকে গণ্ডগোল বলতো৷ কিছুই বুঝতো না৷ তাদেরকে বোঝালাম স্বাধীনতা কী, যুদ্ধ কী? কে কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে এবং কেনইবা যুদ্ধ করছে?

আমি ব্যক্তিগতভাবে একটা নৌকা নিয়ে গ্রামে গ্রামে গিয়ে মানুষদের মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি বোঝাতাম৷ বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে উঠান বৈঠক করতাম৷ এমনকি আমার এসব কর্মকাণ্ডের কারণে শরীয়তপুরের মানুষ আমাকে ‘মুক্তি আপা’ বলে ডাকা শুরু করেছিল৷ এভাবে আমরা গ্রামের নারী-পুরুষদের বুঝিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন করে ফেলি৷ কারণ তা না হলে গ্রামের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন অভিযান খুব ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়তো৷ এরপর আমরা আগ্রহী নারীদের নিয়ে আমাদের বাড়িতেই মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে অস্ত্র চালনা এবং প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করি৷ আমাদেরকে স্টেনগান, রিভলবার, গ্রেনেড ছোঁড়ার প্রশিক্ষণ দিল৷

অপরাজিতাবিডি ডটকম/আরআই/এ/২৬ মার্চ,২০১৪

 

স্বাধীনতা যুদ্ধে আশালতা বৈদ্য

oddadar

 

অপরাজিতাবিডি ডটকম, ঢাকা: আশালতা বৈদ্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর সৈনিক। দেশের জন্য যুদ্ধ করেই তিনি শুধু ক্ষান্ত দেননি। তিনি একাধারে একজন রাজনীতিবীদ ও সমাজসেবিকা।

 

স্কুল জীবন থেকে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থাকাকালে রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে ভাবে জড়িত হয়ে পড়েন তিনি। তারই ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তিনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আন্দোলনের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি এসএসসি পরীক্ষার্থী।

 

এ সময় তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য ৮ ও ৯নং সেক্টরের গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া সীমানা সাব সেক্টরের হেমায়ত বাহিনীতে যোগ দেন। হেমায়েত বাহিনীতে মহিলা বাহিনী নামে আলাদা একটা বাহিনী গঠন করা হয়। এ মহিলা বাহিনীতে মোট ৩৫০ জন নারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। এই বিশাল নারী মুক্তিযোদ্ধার বাহিনীর একমাত্র কমান্ডার ছিলেন আশালতা বৈদ্য। তার নেতৃত্বে ৪৫ জন সশস্ত্র নারী মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

 

তিনি নিজেই তুলে ধরেন মুক্তিযুদ্ধের সময়কার নানান কথোপকথন। ৭১ সালে হেমায়ত বাহিনী ছিল একটি সুসংগঠিত দল। সাতটি বিভাগ ছিল হেমায়ত বাহিনীর। এর মধ্যে মহিলা দলে কমান্ডার ছিলাম আমি। সাতটি দলে কাজ করতো হেমায়ত ভাইয়ের অধীনে। সুশৃঙ্খলিত হওয়ার কারণে কোটালীপাড়ায় পাকিস্তানি বাহিনী প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। আমরা ১৬ ডিসেম্বরের আগেই কোটালিপাড়াকে শত্র“মুক্ত ঘোষণা করেছিলাম।

 

তিনি বলেন, নারীযোদ্ধা সত্ত্বেও আমার দলের ৪৫ জন নারী মুক্তিযোদ্ধা সশস্ত্র পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। কলাবাড়িতে, ঘাঁঘর নদীর পাড়ে , বাশঁ বাড়িয়ায়, হরিণা হাটি ও রামশীল পয়সার হাটে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে আমাদের বেশির ভাগ যুদ্ধ হয়। রামশীল নদী পাড়ে একদিন লঞ্চে করে কয়েক হাজার রাজাকার পাকিস্তানি বাহিনীসহ আসে। সেখানে হানাদার বাহিনীর সঙ্গে আমাদের তুমুল যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধ ৩ ঘন্টা স্থায়ী হয়েছিল। হাজার হাজার রাজাকার ও পাকিস্তানি বাহিনী নিহত হয় মাত্র কয়েক’শ মুক্তিযোদ্ধার হাতে। এই যুদ্ধে আমাদের বাহিনীর মধ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা মকবুল মারা যান। এছাড়া হেমায়ত ভাইসহ ৫ থেকে ৬ জন আহত হয়।

 

আশালতা বলেন, যুদ্ধের শুরু থেকে আমাদের কঠিন প্রশিক্ষণে অংশ গ্রহণ করতে হয়েছিল। হেমায়ত কমান্ডারের হাতে আমরা মহিলা কমান্ড প্রশিক্ষন নিয়ে যুদ্ধ অংশগ্রহণ করেছি।

 

শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে রাজনীতিতে যোগদানের পর তিনি বিভিন্ন সময় ছাত্র লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধেও চেয়েও ‘বঙ্গবন্ধু’কে হত্যার সময়টা দুর্বিসহ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে যখন হত্যা করা হয় সে সময়ে তাকে জাতীয় নেতাদের সঙ্গে অসংখ্য মামলায় আসামি করা হয়। পওে রোকেয়া হল থেকে তৎকালীন সেনাবাহিনী আমাকে প্রেফতার করে। ঐ সময় সামরিক বাহিনীর হাতে আমাকে ও আমার পরিবারের সদস্যদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়।

 

ছাত্র জীবন শেষ করে সূর্যমূখী নামক একটি সমবায় সেবামূলক সংস্থা দিয়ে তার সমাজ সেবামূলক কর্মকান্ডের শুরু। বর্তমানে তিনি এ সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক।

 

আশালতা বৈদ্য তার বৈচিত্র্যময় জীবনের সেবামূলক কাজের জন্য ২০০৫ সালে শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার বাছাই কমিটিতে মনোয়ন পেয়েছিলেন। এছাড়া তিনি শ্রেষ্ঠ মহিলা সমবায়ের প্রেসিডেন্ট স্বর্নপদক, রোকেয়া পদক, প্রশিকা মুক্তিযোদ্ধা পদকসহ অনেক পুরষ্কার লাভ করেন। তবে এতোকিছুর বাইরেও একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি আজও কোনো রাষ্ট্রীয় উপাধি পাননি।

 

এ সর্ম্পেকে আশালতা বলেন, রাষ্ট্রীয় উপাধি আমি আশা করি না, এটা আমার প্রাপ্তি। তবে সরকারের কাছে আর কোন আশা করি না কারণ সরকারের সময় কই আমাকে উপাধিতে ভূষিত করার। উপাধির জন্য যুদ্ধ করিনি, দেশপ্রেমের কারণে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম।

 

অপরাজিতাবিডিডটকম/আরআই/এ/২৬মার্চ২০১৪

নারী মুক্তিযোদ্ধা

12b6d8a6581f872de87e415d6b6f60a8

 

অপরাজিতাবিডি ডটকম, ঢাকা: আজ ৪৩তম মহান স্বাধিনতা ও জাতীয় দিবস । আমাদের কাছে দিনটি অনন্য সাধারণ । তেতাল্লিশ বছর আগে যে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছিল সেই যুদ্ধে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অংশগ্রহণ ছিলো উল্লেখ করার মতো।

নজরুলের ভাষায় বলতে হয় –

‘কোন কালে একা হয়নি ক’ জয়ী পুরুষের তরবারি

প্রেরণা দিয়াছে,শক্তি দিয়াছে বিজয়-লক্ষী নারী।

এদেশের স্বাধীনতার যে ইতিহাস রচিত হয়েছে সেই ইতিহাসে কি নারী মুক্তিযোদ্ধাদের কথা আছে? দু:খজনক হলেও সত্য যে , এদেশের নারী মুক্তিযোদ্ধাদের কথা গুটি কয়েক লোক ছাড়া কেউ বলে না । স্বীকৃতি নেই তাদের অবদানের । এমন কি সরকারি উদ্যোগে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধের ১৬ খন্ডের গ্রন্থে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের কোন তথ্য নেই। বাংলাদেশে পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা হয়েছে কয়েকবার কিন্ত নারী মুক্তিযোদ্ধাদের কোন পূর্ণাঙ্গ তালিকা এ পর্যন্ত করা হয়নি। আমাদের নারীরা যেমন অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে তেমনি তারা মুক্তিযোদ্ধাদের আত্নরক্ষার ক্ষেত্রে ভুমিকা রেখেছে, অস্ত্রের ভাণ্ডার পাহারা দিয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের খাবারের জোগান দিয়েছে, নিজের ছেলে স্বামীর হাতে রাইফেল তুলে দিয়েছে, সন্তান হারা স্বামী হারা হয়ে বেছে নিয়েছে সীমাহীন কষ্টের জীবন ! তাদের এ অবদানকে আমরা কি ভাবে অবমূল্যায়ন করতে পারি!

আরেকটি কথা স্বাধীনতা অর্জনে আমাদের যে প্রত্যাশা ছিলো তার কতটা কাছাকাছি আমরা পৌছতে পেরেছি?

girls2

 

২০১০ সালের এক জরিপ অনুযায়ী ,র্বতমানে বাংলাদেশে র্কমক্ষেত্রে নিয়োজিত আছে ১কোটি ৬২লাখ নারী। ২০০৬ সালে এর সংখ্যা ছিলো- ১ কোটি ১৩ লাখ । অর্থাৎ এই চার বছরে ৪৯ লাখ নারী শ্রম বাজারে প্রবেশ করেছে । ২০০৬ সালে ২৯ এবং ২০১০ সালে ৩৬ শতাংশ হয়েছে ।

এ থেকে বুঝা যায় যে অর্থনীতিতে নারী অর্জন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিনিময়ে নারী কি পেয়েছে?

কমেছে কি নারী নির্যাতন?

পাক বাহিনী যে জঘন্য

পশুরুপে আমাদের নারীদের উপর ঝাপিয়ে পড়েছিল সেই একই রুপ কেন দেখা যায় স্বাধীন দেশে?

কেন আজও নারীরা পথে, ঘাটে, বাসে, ট্রেনে ধর্ষিত হবে ?

যত দিন নারীরা নিজের সম্মান, মর্যাদা নিয়ে মাথা তুলে দাড়াতে না পারবে ততদিন যে সমস্ত নারী মুক্তিযুদ্ধে তাদের সম্ভ্রম বিলিয়ে দিয়েছে তার দায় শোধ হবে না।

যত দিন নারীদের অন্তঃনিহিত শক্তি, অদম্য ইচ্ছা আর আত্নসম্মান বোধ বিকশিত না হবে ততদিন স্বাধীনতার স্বাদ অপূর্ণৃই রয়ে যাবে।

 

অপরাজিতাবিডিডটকম/আরআই/এ/২৬মার্চ২০১৪