banner

রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

Daily Archives: January 16, 2026

আন্তর্জাতিক নারী দিবস সংখ্যা

8 march

 

অপরাজিতাবিডি ডটকম: নারী দিবস উদযাপনের পেছনে রয়েছে নারী শ্রমিকের অধিকার আদায় সংগ্রামের সুদীর্ঘ ইতিহাস। নারী দিবসের শুরু ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে নারী মজুরি বৈষম্য, শ্রমঘন্টা ১২ ঘন্টার কমিয়ে ৮ঘন্টা করানোর জন্য ও কাজের সুস্থ এবং কর্মোপযোগী পরিবেশের দাবিতে রাস্তায় আন্দোলনে নেমেছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের সুতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা। তার তিন বছর পর ১৮৬০ সালের একই দিনে গঠন করা হয় ‘নারী শ্রমিক ইউনিয়ন’।

 

১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হলো। এরপর ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। এ সম্মেলনে ক্লারা প্রতি বৎসর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। 

 

১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ পালিত হওয়া শুরু হয়। বাংলাদেশেও ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার লাভের পূর্ব থেকেই এই দিবসটি পালিত হতে শুরু করে। অতঃপর ১৯৭৫ সালে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। দিবসটি পালনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায় জাতিসংঘ। এরপর থেকে সারা পৃথিবী জুড়েই পালিত হচ্ছে দিনটি নারীর সমঅধিকার আদায়ের প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করার অভীপ্সা নিয়ে।

 

অপরাজিতাবিডিডটকম/আরআই/এ/৮মার্চ২০১৪

বেড়েই চলেছে আত্মহত্যা

অপরাজিতা ডেস্ক

 attohotta

 

রাজধানী ঢাকার খিলগাঁও, সি ব্লক বউবাজার এলাকার মোহাম্মদ আলমগীরের কন্যা ডা. আসমা সুলতানা (৩০)। ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সুদীর্ঘ ১০ বছর প্রেম করে ইঞ্জিনিয়ার স্বামী মাহাদী মাসুদকে দু’বছর আগে বিয়ে করেছিলেন। ৭ই ফেব্রুয়ারি শুক্রবার  কক্সবাজারের হোটেল মোটেল জোন কলাতলী সি-বিচ রিসোর্ট- এ ১১০ নম্বর কক্ষ থেকে সুইসাইড নোটসহ আসমার মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

 

গৃহবধূ বিউটি বেগম (২৫)। ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার পিরোজপুর গ্রামের শহিদুল ইসলামের কন্যা। একই উপজেলার আমবাগান গ্রামের মিঠু মিয়ার সঙ্গে তার বিয়ে হয় ২০১০ সালে। দু’বছর পর বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। স্বামী মিঠু মিয়া আবারও বিয়ের কথা বলে বিউটিকে কালীগঞ্জের কোলা গ্রামে নিয়ে যায়। সেখানে একটি কলাবাগানে তার সহযোগীদের নিয়ে শারীরিক নিপীড়ন করে। এর ভিডিওচিত্র ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়া হয়। হাতে হাতে পৌঁছে যায় এ ভিডিও চিত্র।  লজ্জা অপমান সইতে না পেরে ১৫ই ফেব্রুয়ারি  বিউটি বেগম তার নিজ বাড়িতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

 

কিশোরগঞ্জের ভৈরবের মুর্শিদ মুজিব উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্রী হাসি আক্তার জ্যোতি (১৫) স্থানীয় সুস্মিত সুলতান (২০) নামে এক যুবকের সঙ্গে পরিচয় থেকে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। তার কপট প্রেম বুঝতে পারেনি জ্যোতি। মনপ্রাণ উজাড় করে দেয় সুস্মিতকে। প্রেম গড়ায় শারীরিক সম্পর্কে। প্রতারক প্রেমিক সুস্মিত তাদের বিশেষ মুহূর্তের ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়। ফেসবুকে আপলোড করে। এরপরই  লজ্জায় অপমানে জ্যোতি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। প্ররোচনার অভিযোগে মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে সুস্মিত এখন কারাগারে। মামলা তুলে নেয়ার জন্য প্রভাবশালীরা চাপ দিচ্ছে জ্যোতির পরিবারকে। একদিকে মেয়ে হারানোর শোক, সামাজিক অসম্মান আর অন্যদিকে বিচার না পাওয়ার শঙ্কায় মুষড়ে পড়েছে জ্যোতির পরিবার।

 

এতো গেল আত্মত্যার খবর। পত্রিকার পাতা খুললেই প্রতিদিনই চোখে পরে নারী নির্যাতেনর প্রতিচ্ছবি। নারীদের আত্মহত্যার এমন প্রবণতা এবং নির্যাতন বাড়ছে দিন দিন। বিভিন্ন নারী সংগঠন ও বেসরকারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী নারীদের আত্মহত্যার হার উদ্বেগজনক। নির্যাতন বা মর্যাদাহানির কারণে মেয়ের আত্মহত্যার অনেক খবর প্রকাশ হয় না বলে এর সঠিক পরিসংখ্যানও পাওয়া যায় না এসব সংস্থার দাবি। তবে সংস্থাগুলো বলছে, আত্মহত্যাকারীদের বেশির ভাগই বিভিন্ন বয়সী নারী।

 

নারী সংগঠনগুলোর অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রেমিক স্বামী কিংবা আপনজনের কাছ থেকে প্রতারিত ও ব্যর্থ হয়ে হতাশা, লজ্জা, ক্ষোভ, অপমান ও লোকলজ্জার ভয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে বিভিন্ন বয়সের নারীরা। এদের মধ্যে স্কুল, কলেজের ছাত্রী, গৃহবধূর সংখ্যাই বেশি। গ্রাম, শহর, পাড়া, মহল্লা সবখানেই উদ্বেগজনকভাবে এ সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

 

সহিংসতার মধ্যে রয়েছে ধর্ষণ, খুন, ধর্ষণ চেষ্টা, যৌন হয়রানি, এসিড নিক্ষেপ, যৌতুকের জন্য নির্যাতনসহ নানা ঘটনা। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে আত্মহত্যা করেছেন প্রায় তিন হাজারের বেশি বিভিন্ন বয়সী নারী। নারী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বলছেন সরকার বা পুলিশ বিভাগের কাছে এর সঠিক পরিসংখ্যান নেই আর থাকলেও তারা তা প্রচার করতে অনিচ্ছুক। প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি।

 

গত ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আইনি সংস্থা লিগ্যাল এইড উপ-পরিষদ দেশে নারী নির্যাতন ও আত্মহত্যা সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ সংক্রান্ত তথ্য। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড উপ-পরিষদে সংরক্ষিত ১৪টি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে এ পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়। তাতে দেখা যায়, ২০১৩ সালে বিভিন্ন বয়সী নারীদের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ৩৮৬টি। এর মধ্যে প্ররোচিত হয়ে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ৩৭টি।

 

 

বাংলাদেশ মহিলা পরিষেদর সভাপতি আয়শা খানম বলেন, এটা খুব অবক্ষয়ের ব্যাপার। এটা ঠিক না। তিনি মনে করেন আত্মহত্যা কোনো সমাধান না। এটা থেকে বের হয়ে আসার জন্য সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। আয়শা খানম আরো বলেন, হত্যা-নির্যাতনের প্রকৃতি এত ভয়াবহ ও নিষ্ঠুর রূপ লাভ করছে যে, ভাবতে অবাক লাগে। মানুষের সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক এত নির্মম রূপ পায়, যা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। তিন আরও বলেন, নারীরা সামাজিক আন্দোলনে রাজনৈতিক আন্দোলনে আসছে। বাংলাদেশে নারীদের ক্ষমতায়ন প্রতীকি ভাবে বাড়ছে । কিন্তু নারীর ক্ষমতায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এবং আইনি প্রদক্ষেপ নেয়ার দরকার বলেও মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, আমাদের দেশে যে নারীর ক্ষমতা বর্তমানে রয়েছ এটার ধারাবাহিক এবং স্থায়ীরুপ দিতে হবে। সমাজ এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে।

 

আত্মহত্যার তালিকায় বাসাবাড়ির গৃহপরিচারিকাও রয়েছেন। গৃহকর্তা বা গৃহকর্তীর মানসিক নিপীড়নে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে তারা। তাদের সংখ্যা ২৫। এছাড়া যৌন হয়রানির কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ২৪টি। বিভিন্ন কারণে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন ২২ জন নারী। এসব আত্মহত্যার নেপথ্যে থাকে প্রেমঘটিত প্রতারণা, বিশেষ মুহূর্তের গোপন ছবি ইন্টারনেটে প্রকাশ, ফেসবুক প্রতারণা, গোপন তথ্য ফাঁস হওয়া, জীবনসঙ্গীর পরকীয়া বা অন্য নারীর প্রতি আসক্তি, পারিবারিক মনোমালিন্য ও মানসিক নিপীড়ন, অভিভাবকদের অতিমাত্রায় শাসন, ইভটিজিং, যৌন হয়রানি, যৌতুক, প্রেমের সম্পর্কে জটিলতাসহ নানা কারণ। বিষয়টি খুবই উদ্বেগের বলে মনে করছেন আইন, মানবাধিকার ও নারী সংস্থার নের্তৃবৃন্দ।

 

খুশী কবির বলেন, নারীদের আত্মহত্যার প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। যদিও বিষয়টি অনেক আগে থেকেই হয়ে আসছে। বিশেষ ক্ষেত্রে আইন, সমাজের পাশাপাশি পরিবারও একজন নারীকে যথাযথ সমর্থন দেয়নি বা দেয় না। আর তখনি একজন নারী হতাশা, ক্ষোভ অভিমান নিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

 

খুশি কবির বলেন, যে পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। কখনও দেখা যায় হত্যার নামে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়া হয়। তাই নারীদের নিয়ে সমাজ ও পরিবারকে তার চিন্তাধারা বদলাতে হবে। এ দায়িত্বটি মূলত পুরুষদের। তাদের মানসিকতাও পরবির্তন করতে হবে। তিনি বলেন,  যতক্ষণ পর্যন্ত না মানসিকতার পরিবর্তন হবে ততক্ষণ এ অবস্থা চলতেই থাকবে। এক্ষেত্রে আইনের যথযথ প্রয়োগ, বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত একান্ত জরুরি।

 

নারী নেত্রী, মনোবিজ্ঞানী ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে সাধারণত নারীরাই আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন।

 

একজন সরকারি আইনজীবী (সহকারী  এটর্নি জেনারেল) এ বিষয়ে বলেন, নারীদের আত্মহত্যার প্ররোচনার জন্য বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু দেখা গেছে,  সেক্ষেত্রে মামলা হলেও শাস্তির নজির খুব একটা চোখে পড়ে না। এজন্য দায়ী আত্মহত্যার প্ররোচনার আইনগত সঠিক সংজ্ঞা না থাকা, মামলায় তথ্য, প্রমাণ, সাক্ষীর অভাব। যে কারণে নিম্ন ও উচ্চ আদালত থেকে আসামিরা সহজেই জামিন পেয়ে যায়।

 

সঙ্গত কারণে প্ররোচনাকারীদের আইন ও বিচারের মুখোমুখি করা যাচ্ছে না। নিম্ন ও উচ্চ আদালতের বেশ ক’জন আইনজীবী বলছেন বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারায় আত্মহত্যা করার উদ্যোগ নেয়াও একধরনের অপরাধ। সেক্ষেত্রে এক বছরের কারাদণ্ড ও আর্থিক জরিমানার কথা বলা হলেও এই আইনের প্রয়োগ বর্তমানে নেই বললেই চলে।

 

উদ্বেগজনকভাবে নারীদের আত্মহত্যার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সামাজিক অস্থিরতা, সহজলভ্য আকাশ সংস্কৃতি, ফেসবুক, ইন্টারনেটের সহজপ্রাপ্তি, মোবাইলের সহজলভ্যতাকেও দায়ী করছেন অনেকে। তারা বলছেন, এসব ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটছে। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

 

 

 

বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির প্রধান নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী বলেন, ‘রাজনৈতিক অপরাধও বাড়ছে। থানায় কেস না নিতে চাওয়া এবং আইনের আওতায় এনে অপরাধীকে শাস্তি না দিতে পারায় অপরাধ বাড়ছে।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. তানিয়া হক বলেন, সমাজে নারীদের শারীরিক নির্যাতন আমাদের চোখে পড়লেও তাদের প্রতি মানসিক নির্যাতন ও নিপীড়ন চোখে পড়ে না। বলা হয়, নারীরা মুখ খুলতে চায় না।

 

এ জন্য তারা আত্মঘাতী পথ বেছে নেয়। তিনি বলেন, নারীরা এখনও কেন আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে তা বোধগম্য নয়। টিনএজ বা স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতার বিষয়ে ড. তানিয়া হক সরাসরি দায়ী করেন বিভিন্ন দেশের অপসংস্কৃতির আগ্রাসনকে। এ ছাড়া ফেসবুক, ইন্টারনেট, মোবাইল ফোনের অপব্যবহার ও সহজলভ্যতাও এক্ষেত্রে দায়ী বলে মনে করেন তিনি। তথ্যসূত্র: ওয়েবসাইট

 

অপরাজিতাবিডিডটকম/আরএ/এ/৮মার্চ২০১৪

নারীর অগ্রগতির জন্য নারী সহায়ক পরিবেশ প্রয়োজন

regular_5522_news_1394215149সেলিমা আহমদ। মা-মরহুমা রহিমা হক, বাবা-মরহুম এ কে এম ফজলুল হক। বাবা মেয়েকে ভীষণ আদর করতেন। কারণ, কন্যাটি ছিল বাড়ির সবচেয়ে ছোট্ট মেয়ে। পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া স্বচ্ছ জলের মতো সারা দিন ননস্টপ কথায় বাবা ফজলুল হক এতটুকু বিরক্ত হতেন না। মেয়েকে তার বুকের কাছে আগলে রাখতেন আর ইহলৌকিক, পারলৌকিক ও দিব্য জগতের নানান বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান দিতেন। গল্পচ্ছলে বাবা মেয়েতে চলত নানা আলাপচারিতা সারা দিন ঘরেবাইরে পুতুল খেলার ঘরে, মাঠে, স্কুলের সব আলাপ যেন ছোট্ট সেলিমা জমিয়ে রাখত বাবা অফিস থেকে ঘরে ফেরার অপেক্ষায়। স্কুলের নিয়মশৃঙ্খলা, সময় ধরে একটানা দুই ঘণ্টা পরীক্ষার হলে বসে লেখা এসব সেলিমার একদম ভালো লাগত না। কখনো মা এতটুকুন ফুটফরমাশ দিলে বাবা তাতে বাদ সাধত আর বলত ‘আমার ছোট্ট রাজকন্যাকে একদম কাজ করতে বলবে না ও আমার ছোট্ট টুনটুনি পাখি। মা, রাগ করলে বাবা বলত দেখো একদিন তোমার মেয়ে দেশবরেণ্য মানুষ হবে ওর মেধা আছে একদিন তা কাজে লাগবে।’ বাবা যেন ভবিষ্যৎ দেখতে পেতেন। বাবার কথা আসতেই সেলিমা আহ্মাদ একটু যেন থেমে গেলেন।

 

বাবাকে তিনি ভীষণ ভালোবাসতেন বাবার উৎসাহ, প্রেরণা, স্নেহমাখা আদেশ উপদেশ সব যেন পাথেয় হয়ে রয়েছে তাই ছোট্টবেলায় পড়ায় ফাঁকিঝুঁকি মারলেও কাস নাইন-টেনে এসে তা পুষিয়ে নিয়েছেন পড়াশোনায় ভীষণ রকম সিরিয়াস হয়ে। এমনি করে খুলনার ফাতেমা হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন।

 

কলেজে ভর্তি হওয়ার পরপরই তার বিয়ে হয় আবদুুল মাতলুব আহমাদের (নিটোল নিলয় গ্রুপের চেয়ারম্যান) সাথে। ভীষণ রকম উদ্যমী ও বিনয়ী এই মানুষটি স্ত্রী সেলিমাকে সব সময় তার কাজের ব্যাপারেও সহযোগিতা করেছেন, এগিয়ে নিয়ে গেছেন। ১০০% সাহস জুুগিয়ে। আর তাই কোনো রকম ব্রেক ছাড়াই হলি ক্রস কলেজ থেকে এইচএসসি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট বিভাগ থেকে বিকম (সম্মান) এমকম ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই বড় ছেলে আবদুল মুসাব্বির আহমাদ, নিটোলের জন্ম হয়। সেলিমা আহমাদ ছাত্রাবস্থায়ই সংসার-সন্তান লালনপালনের সাথে সাথে হ্যান্ডিক্রাফট রফতানির মাধ্যমে তার বিজনেস শুরু করেন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের তৈরি নানা রকম প্রয়োজনীয় সব উৎপাদিত পণ্য দেশে-বিদেশে সম্মান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে সহায়তা করছে আজো। সারা দেশে তার কর্মীবাহিনীর সংখ্যা হাজার হাজার। যারা নিজেরাও আজ স্বাবলম্বী। উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ফাউন্ডার প্রেসিডেন্টও তিনি। বর্তমানে তিনি নিটল নিলয় গ্রুপে অব ইন্ডাস্ট্রিজ-এর ভাইস চেয়ারপাসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিশাল এ ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান তিনি পরিচালনা করেন সফলতার সাথেই।

 

ব্যক্তিগত জীবনে সেলিমা আহমাদ অত্যন্ত বিনয়ী, সদালাপী ও মমতার আধার। তাই তো তার শুভাকাক্সীর সংখ্যা অনেক। সেলিমা আহমাদের ছোট ছেলে আব্দুল মারিব আহমাদ নিলয় (ভাইস চেয়ারম্যান নিটোল নিলয় গ্রুপ) মায়ের কাজকর্মে সব সময় সহযোগিতা করেন। তাদের গ্রুপ অব বিজনেসে সবাই অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা এই নারী ব্যক্তিত্বকে ৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবস নিয়ে প্রশ্ন করতেই তিনি জানান ‘আজকে এই সময় নারীরা সারা বিশ্বে তার মেধা মননে অনেক বেশি এগিয়ে এসেছে। বিশ্বায়নের এই যুগে গ্রামবাংলার নারীরাও অনেক বেশি কর্মক্ষম হয়ে নিজের ও পরিবারের অবস্থার পরিবর্তন করছে। এতে একটি পরিবার, তারপর সমাজ, তারপর দেশের আপাত চেহারা পাল্টে যাচ্ছে। খুব বেশি দিন লাগবে না এর ব্যাপক প্রসার হতে। তবে এর জন্য প্রয়োজন ঘরের পিতা-মাতা ও পরে স্বামী বা শ্বশুর বাড়ির মানুষদের সহযোগিতা। তা না হলে বাংলাদেশের উন্নয়ন কখনো সম্ভব নয়। তিনি আরো বলেন, ৮০-র দশকে আমি যখন ব্যবসায় শুরু করি তখন একজন নারীর জন্য ব্যবসায় বাণিজ্যের সাথে যুক্ত হওয়া অনেক বেশি সমস্যা ছিল। নারীকে ব্যবসায়ী হিসেবে দেখতে তখনো সমাজ অভ্যস্ত ছিল না। কিন্তু আজকে উদ্যোক্তারা নিজ কর্মক্ষেত্রে, ব্যাংকে, এয়ারপোর্ট এসব জায়গায় গেলে তেমন উল্লেখযোগ্য বিরূপতা ফেস করতে হয় না। তবে আজকে বড় সমস্যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। এ অবস্থা এমনই ভয়ঙ্কর যে নারীর জন্য এটা মিট করে ব্যবসায় করা খুবই কঠিন হচ্ছে। পুলিশের অপ্রতুল সহযোগিতা মাস্তানদের উপদ্রব, এসব নারী উদ্যোক্তার জন্য বর্তমানে বড় প্রতিবন্ধকতা। ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স, ইআরসি, আইআরসি, টিআইএন করতে হয়। এগুলো করতে নানা রকম অনিয়ম ও ঘুষের আশ্রয় নিতে হয়। এসব করতে যেসব অযাচিত হয়রানি তা আমাদের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্রতিবন্ধকতা। কারণ ব্যবসায়ী কর্মজীবী নারীকে একই সাথে পরিবার, ব্যবসায় ও অন্যান্য সেক্টর দেখতে হয়। ফলে নারীর জন্য উৎকোচ হাতে ফাইলের পিছে পিছে ফেরা ও তদবির করা কঠিন এবং ওই বাধাটা কাজের ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হয়। তিনি আরো বলেন, নারীর অগ্রগতির জন্য নারী সহায়ক পরিবেশ প্রয়োজন। নারী উদ্যোক্তারা অনেক পণ্য উৎপাদন করছে কিন্তু বাজারব্যবস্থায় প্রবেশ করতে পারছেন না। এসব ব্যাপারে সরকারি সহযোগিতা দরকার, পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাদের স্বার্থে আরো প্রতিষ্ঠান হওয়া দরকার।

 

উদ্যোক্তা হিসেবে বাজারে আত্মপ্রকাশের জন্য একজন নারীকে কী কী শর্ত পালন করতে হবে? এ প্রসঙ্গে তিনি জানান, ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য সর্বাগ্রে দরকার কমিটমেন্ট ও জ্ঞান, বিশেষ করে ব্যবসায়িক বিষয়ে জ্ঞান থাকা ও নিজস্ব ক্যাপাসিটি বিল্ডআপ করা। নিজের সেক্টরে সব নখদর্পণে থাকা। একজন সার্থক মালিক বা ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা হওয়া সম্ভব হয় যখন তার মধ্যে সব সেক্টরের জ্ঞান থাকে। সমাজে বিদ্যমান নারী-পুরুষ বৈষম্য বা বিদ্বেষটাকে দূর করতে হবে। আর নারী বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে গেলে ও দায়িত্ব নিলে অচিরেই তা দূর হবে।

 

নারীর ব্যক্তি চরিত্রে ধৈর্য, ডিগনিটি, বাঙালিত্ব এসব থাকতে হবে। অনেক নারী আজকে নিজেদের বেশি স্বাধীন ভেবে স্বাধীনতার অপব্যবহার করে। বস্তুত সমাজের রীতিশৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধা থাকলে সবার সহযোগিতা পাবে, অন্য রূপ হলে সব মহল থেকে সহযোগিতা চলে যাবে। সেলফ রেসপেক্ট থাকতে হবে এবং সর্বক্ষেত্রে তা বজায় রাখতে হবে। অন্যথায় আজকের কোনো ভুল পদক্ষেপ পরবর্তী প্রজন্মকে ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা হতে নিরুৎসাহিত করবে।-নয়াদিগন্ত

সেলিমা আহমদ:ফাউন্ডার প্রেসিডেন্ট, বিডব্লিউসিসিআই এবং ভাইস চেয়ারপারসন, নিটল নিলয় গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রি

ট্রেন চালাতে ভয় কেটেছে সালমার

14172_f2সালমা ট্রেন চালান, এটা এখন পুরনো কথা। বাংলাদেশ রেলওয়ের একমাত্র নারী সহকারী ট্রেনচালক সালমা খাতুন। দশ বছর আগে ২০০৪ সালের ৮ই মার্চ চাকরিতে যোগ দেন। দিনে-রাতে কত নগর, বন্দর, গ্রামকে পেছনে ফেলে হুইসেল বাজিয়ে ছুটে চলে তার ট্রেন, কিন্তু সালমাকে কেউ পেছনে ফেলতে পারবে না। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী ট্রেনচালক। একান্ত আলাপচারিতায় সালমা বলেন, যেদিন প্রথম এই কাজ শুরু করলাম তখন মনে কিছুটা ভয় কাজ করছিল। নতুন জায়গা, নতুন চাকরি মানিয়ে নিতে পারবো কিনা এই একটা চিন্তা ছিল। তবে এখন সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আমি নিজের জায়গা নিজে তৈরি করে নিয়েছি। চ্যালেঞ্জের এই চাকরিতে আসার উদ্দেশ্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার সবসময় একটা ইচ্ছা ছিল একটু ভিন্ন কিছু করবো, তবে ভিন্নকিছু বলতে ট্রেনের চালক হবো- তা কখনও মনে ছিল না। একদিন মেজো ভাই আবুল কালাম আজাদ ফোন করে জানান, রেলওয়ের একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। বিজ্ঞপ্তি খুঁজে বের করে সহকারী লোকোমোটিভ মাস্টার পদে আবেদন করি। তখন ভাবলাম দেখি না এখানে কোন মেয়ে নেই, আমি কিছু করতে পারি কিনা। এই চিন্তা থেকেই এখানে আসা।

সালমার গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার ভূঞাপুরের অর্জুনা গ্রামে। বাবা প্রয়াত বেলায়েত হোসেন খান। মা সায়রা বেগম। তিন ভাই, দুই বোনের মধ্যে সালমা খাতুন চতুর্থ। তিনি অর্জুনা মহসীন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০০০ সালে এসএসসি ও ২০০২ সালে কুমুদিনী সরকারি কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। এরপর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগে সম্মান শ্রেণীতে ভর্তি হন। সালমা খাতুন একদিকে চাকরি করছেন অন্যদিকে সংসার করছেন। ২০১১ সালের ২০শে জুলাই বিয়ে করেন ঢাকা জজকোর্টে কর্মরত ঝিনাইদহের ছেলে হাফিজ উদ্দিনকে। তাদের ১ বছরের একটি কন্যাসন্তান আছে। তার নাম আদিবা ইবনাত লাবন্য। পরিবারের সবার সহযোগিতায় খুব ভালভাবেই তিনি চাকরি করছেন। এক্ষেত্রে তার স্বামীর সহযোগিতা অনেক বেশি। সালমা জানান, ২০০৩ সালের ১৮ই জুলাই রেলওয়ের রাজশাহী জোনাল অফিসে টাঙ্গাইল জেলা থেকে আরও ১৩৪ জন পরীক্ষার্থীর সঙ্গে তিনিও লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন। ঢাকার ১৭টি জেলা থেকে মাত্র দু’জন মেয়ে আবেদনকারী ছিলেন। ওই বছর ২৮শে সেপ্টেম্বর তার বাড়ির ঠিকানায় আসে মৌখিক পরীক্ষার চিঠি।

২০০৪ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি হাতে পান নিয়োগপত্র। এটিই ছিল তার জীবনে চাকরির প্রথম আবেদন এবং সফলতা। তার কাজ ট্রেনচালকের পাশে বসে সহযোগিতা করা। নিয়োগের পর টানা দু’বছর সালমা চট্টগ্রাামের হালিশহর প্রশিক্ষণ একাডেমী, পাহাড়তলী ও ঢাকা লোকোমোটিভ শেডসহ বিভিন্ন ওয়ার্কশপে হাতে-কলমে শিক্ষা নেন। দুই বছরের প্রশিক্ষণ শেষে ঢাকা লোকোমোটিভ বিভাগে যোগ দেন। এরপর থেকে তিনি চালকের সঙ্গে ট্রেন চালান। প্রথমদিন ট্রেনে ওঠার অনূভুতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২ বছর বিভিন্ন জায়গায় ট্রেনিং শেষে প্রথম ট্রেন চালান ২০০৬ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি। রুট ছিল লাকসাম-নোয়াখালী। তিনি বলেন, যেদিন আমি সহকারী চালক হিসেবে ট্রেনে উঠি সেদিনের অনূভূতি বলে প্রকাশ করতে পারবো না। একদিকে মনে আনন্দ, অন্যদিকে একটু একটু ভয়। এ নিয়ে আগেরদিন ঘুমাতে পারিনি।

সকালে উঠে আমি যে বাসায় থাকতাম সে বাসার খালা-খালুকে বললাম তখন তারা বললেন তুমি ভয় পেয়ো না আমরা সেখানে থাকবো। তারপর তাদের দোয়া নিয়ে লাকসাম-নোয়াখালী রুটে প্রথম ট্রেন চালালাম। এ কাজ করতে গিয়ে সালমাকে অনেক স্থানে অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখে পড়তে হয়েছে। ২০০৬ সালের ১৯শে ফেব্রুয়ারি নোয়াখালী থেকে ফিরছিলেন। রাত ৮টা বেজে যায় নোয়াখালীতেই। জানাজানি হয় ট্রেনে নারী চালক রয়েছেন। সোনাইমুড়ী স্টেশনে আসতেই ভিড় করে লোকজন। সালমা ট্রেন থামিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বললে শান্ত হয় পরিস্থিতি। তিনি বলেন, আরও একটি প্রমোশনের পর পূর্ণাঙ্গ চালক হয়ে তিনি একাই ট্রেন চালাতে পারবেন। তিনি আরও বলেন, এ পেশায় এখনও মেয়েদের কাজ করার পরিবেশ পুরোপুরি তৈরি হয়নি। তবে এ পেশায় মেয়েদের সংখ্যা বেড়ে গেলে পরিবেশ তৈরি হয়ে যাবে। প্রথমে অনেকে আমার এই চাকরিটাকে স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। কিন্তু এখন সব ঠিক হয়ে গেছে। যারা এটাকে ভাল চোখে দেখতো না তারাও আমাকে উৎসাহিত করেন। মেয়েদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, স্পিকার নারী। সব জায়গায় নারীদের অগ্রগতি বাড়ছে। কে কি বললো সেদিকে কান না দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে তাহলে আমাদের দেশের নারীরা অনেক ভাল কিছু করতে পারবে।

অপরাজিতাবিডি ডটকম/মানবজমিন/আরআই/এ/৮মার্চ২০১৪