কর্মক্ষেত্রে সফল হতে হলে দক্ষতা অর্জন ও কঠোর পরিশ্রমের বিকল্প নেই। এই বিশ্বাসকে সামনে রেখে এগিয়ে গেছেন সৈয়দা তাহিয়া হোসেন, যিনি বর্তমানে গ্রামীণফোনের চিফ হিউম্যান রিসোর্সেস অফিসার (CHRO)। তাঁর পেশাগত যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৯৬ সালে, তখনও তাঁর স্নাতক শেষ হয়নি। ব্যবসায়ী বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ করার ইচ্ছে থাকলেও বাবা তাঁকে আগে অন্য কোথাও কাজ শেখার পরামর্শ দেন। সেই পরামর্শকে গুরুত্ব দিয়ে তিনি চাকরির খোঁজ শুরু করেন এবং প্রথম কাজ পান একটি ডাচ চকলেট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানে। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ এইচআর ক্যারিয়ারের পথচলা।
মানুষের সঙ্গে কাজ করার প্রবল আগ্রহ থেকেই তাহিয়া মানবসম্পদ বিভাগে ক্যারিয়ার গড়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথম ইন্টারভিউ বোর্ডে তিনি বলেছিলেন, “আমি মানুষের জন্য, মানুষের সঙ্গে কাজ করতে চাই।” এই কথার প্রতিফলন তাঁর পুরো ক্যারিয়ারে দেখা গেছে। চাকরির শুরুতেই ম্যানেজিং ডিরেক্টরের পরামর্শে তিনি এইচআর বিভাগে কাজ শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তাহিয়া বিশ্বাস করেন, ব্যবসার পাশাপাশি কার্যকর এইচআর প্র্যাকটিস সম্পর্কে জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, শেখার প্রক্রিয়া থেমে গেলে ক্যারিয়ারে উন্নতি করা সম্ভব নয়।
একজন দক্ষ নেতা হিসেবে তাহিয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহমর্মিতা ও ভারসাম্য রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি মনে করেন, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় কাজ করতে হলে ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স ও সমতা রক্ষা করা জরুরি। অনেক সময় কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে কর্মীদের পক্ষে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
ডিজিটাল যুগে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। তাহিয়া মনে করেন, শুধুমাত্র টেলিকম খাতের চিন্তাধারা দিয়ে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়; বরং টেকনোলজির সাথে একীভূত হয়ে কাজ করতে হবে। নতুন স্কিল অর্জনের পাশাপাশি কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। তাহিয়ার মতে, এটি একটি বিশাল পরিবর্তন, যেখানে নতুন ট্যালেন্টের সাথে কাজ করার পাশাপাশি পুরোনো কর্মীদেরও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ দিতে হবে।
নারীদের কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরিতে গ্রামীণফোন বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তাহিয়া বলেন, গ্রামীণফোনে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয় না; যোগ্যতার ভিত্তিতেই সবাই সম্মান পান। একসময় ম্যানেজমেন্ট টিমে একমাত্র নারী সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বিশ্বাস করেন, নারীদের চিন্তাভাবনায় স্বতন্ত্রতা থাকে, যা ব্যবসায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করতে পারে। তাই কর্মক্ষেত্রে নারীদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
নারীদের অগ্রগতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চ্যালেঞ্জ গ্রহণের মানসিকতা। তাহিয়া মনে করেন, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে নারীদের পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে যে, তারা কী চান এবং কীভাবে তা অর্জন করা সম্ভব। অফিসে একজন নারীর নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করে জায়গা তৈরি করতে হয়, যা কখনো কখনো কঠিন হলেও, সেটাই তাদের দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করে। তাহিয়া বিশ্বাস করেন, “কাজের ওনারশিপ না দিলে নারীরা পিছিয়ে পড়বেন।”
তাহিয়া হোসেনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা তাঁর বাবা। তাঁর বাবা সবসময় তাঁকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে শিখিয়েছেন। বাবার ব্যবসায় কাজ করার ইচ্ছা থাকলেও তিনি প্রথমে চাকরির মাধ্যমে নিজেকে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। চার বছর পর যখন বাবা তাঁকে নিজ প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সুযোগ দেন, তাহিয়া তখন জানান, তিনি নিজের ক্যারিয়ার এখানে গড়তে চান। এই সিদ্ধান্তই তাঁকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
সৈয়দা তাহিয়া হোসেনের জীবনগল্প প্রমাণ করে যে, কর্মক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনের জন্য দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস ও নিরলস পরিশ্রম অপরিহার্য। নারীদের জন্য কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ তৈরি করতে হলে তাদের নিজেদের যোগ্যতা অর্জন করতে হবে এবং চ্যালেঞ্জ গ্রহণের মানসিকতা রাখতে হবে। তাহিয়ার মতো নারীরা যখন নিজেদের যোগ্যতা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হন, তখন এটি অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।