banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 328 বার পঠিত

 

পবিত্র মহররম ও আশুরা: কলুষিত হৃদয়ের জন্য এক আত্মশুদ্ধির আহ্বান

হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম আমাদের সামনে হাজির হয় এক আত্মমূল্যায়নের বার্তা নিয়ে। এটি শুধু বছরের সূচনা নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—যেখানে পবিত্র কুরআনের ভাষায় বলা হয়েছে, “আল্লাহর বিধানে মাস বারোটি, তার মধ্যে চারটি সম্মানিত (আরবা’আতুন হুরুম)” (সূরা আত-তাওবা, ৯:৩৬)। সেই সম্মানিত মাসগুলোর অন্যতম হলো মহররম, আর এরই দশম দিন – আশুরা, ইসলামী ইতিহাসে এক বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং অতল গুরুত্ববাহী দিন।

পবিত্র কুরআনের ঘোষণা মতে ‘আরবাআতুন হুরুম’—চার সম্মানিত মাসের একটি। সেই মাহাত্ম্যপূর্ণ মাসে প্রতিটি মুহূর্ত যেন আল্লাহর নৈকট্যের সন্ধানে একটি সুযোগ।

মহররম মাসের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে হাদিস শরীফে স্পষ্টভাবে এসেছে, “রমজানের পর সবচেয়ে উত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩)। এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, এই মাসে নফল রোজার গুরুত্ব অপরিসীম। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, “আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে রমজান এবং আশুরার দিন যত গুরুত্ব দিয়ে রোজা রাখতে দেখেছি, অন্য কোনো দিন এত গুরুত্ব দিতে দেখিনি।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০০৬)।

নবীজি (সা.) আশুরার রোজা সম্পর্কে বলেন, “আমি আল্লাহর কাছে আশা করি যে, এই রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের (ছগীরা) গুনাহ মাফ করে দিবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)। তাই নবীজি শুধু নিজেই রোজা রাখেননি, বরং সাহাবাদেরও উৎসাহিত করেছেন এদিন রোজা রাখতে। তিরমিজি শরীফে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রমজানের পর যদি রোজা রাখতে চাও, তবে মহররমে রাখো। কেননা, এ মাস আল্লাহর মাস।” (তিরমিজি, হাদিস: ৭৪০)।

হজরত হাফসা (রা.) বলেন, “নবীজী চারটি আমল কখনো বাদ দিতেন না—আশুরার রোজা, জিলহজের প্রথম দশকের রোজা, প্রতি মাসের তিনটি রোজা এবং ফজরের আগের দুই রাকাত সুন্নত নামাজ।” (সুনানে নাসায়ি: ২৪১৫)
কিন্তু আশুরার রোজা কেবল একটি দিনে সীমাবদ্ধ নয়। নবীজির নির্দেশনায় পাওয়া যায়, ইহুদিদের সঙ্গে সাদৃশ্য পরিত্যাগ করার জন্য তিনি আশুরার আগের বা পরের দিন একটি অতিরিক্ত রোজা রাখতে বলেছেন। “তোমরা আশুরার রোজা রাখ এবং একদিন আগে বা পরে আরেকটি রোজা রেখো।” (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২১৫৪)। এমনকি তিনি বলেন, “আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি, তাহলে ৯ তারিখেও রোজা রাখব।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩৪)।

আশুরা কেবল রোজা পালনের দিন নয়, বরং ইসলামী ইতিহাসে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার স্মারক। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত রয়েছে, এই দিনেই আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও তার অনুসারীদেরকে সমুদ্র পার করিয়ে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীকে ধ্বংস করেছিলেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪০১)। এই উপলক্ষে মুসা (আ.) রোজা রেখেছিলেন কৃতজ্ঞতা স্বরূপ, এরই ধারাবাহিকতায় ইহুদি সম্প্রদায় এই দিন রোজা রাখতো। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “আমি মুসার ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার।” অতঃপর তিনি রোজা পালন করেন এবং সাহাবাদেরও তা করতে বলেন (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩০)।

অনেক বর্ণনায় এসেছে, এই দিনেই হজরত আদম (আ.)-এর তওবা কবুল হয়, হজরত নূহ (আ.)-এর কিসতী জুদী পাহাড়ে অবতরণ করে, হজরত ইব্রাহিম (আ.) আগুন থেকে মুক্ত হন, হজরত ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে নিঃসরণ হন, হজরত ঈসা (আ.) আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়। যদিও এসব ঘটনার স্পষ্ট সহিহ সনদ নেই, তথাপি বহু সালাফ থেকে এব্যাপারে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তাই নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস না করেও এই দিনটিকে বরকতময় হিসেবে বিবেচনায় রাখা যায়।
তবে আশুরা নিয়ে যেসব ভিত্তিহীন কাহিনি চালু রয়েছে—যেমন, এই দিনে কিয়ামত হবে, হজরত ইউসুফ জেল থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন, কিংবা হজরত ইয়াকুব দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছিলেন—এগুলোর কোনো সহিহ প্রমাণ নেই।

কারবালা
মহররম মাসে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা হলো কারবালার প্রান্তরে হজরত হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত। সত্য ও অন্যায়ের মুখোমুখি অবস্থানে তিনি তাঁর জীবন উৎসর্গ করেন। এ ঘটনা মুসলিম উম্মাহর জন্য বেদনার হলেও ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে—শোক পালন হবে আত্মিক ও আত্মোন্নতিবিধান সাপেক্ষে, জাহেলি যুগের আদলে হবেনা।
নবীজি (সা.) বলেন, “আমাদের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই, যে বুক চাপড়ায়, কাপড় ছিঁড়ে বা জাহেলি যুগের কথা বলে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১২৯৪)। তাই শোক র‌্যালি, মাতম, তাজিয়া বের করা, শরীর রক্তাক্ত করা এসব ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড। এগুলো এ মাসের মাহাত্ম্য ও উদ্দেশ্যকে বিকৃত করে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে এখনো অনেকে মহররমকে ‘অশুভ মাস’ মনে করে। কেউ কেউ এ মাসে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে ভয় পায়। অথচ ইসলাম এই মাসকে ফজিলতের মাস হিসেবে ঘোষণা করেছে। নবীজির যুগে এ ধরণের ভয়-ভীতির কোনো অস্তিত্ব ছিল না। তাই এসব কুসংস্কার বর্জন করে কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক জীবনচর্চা জরুরি।

এই মাসে করণীয়
এই মহররম মাস যেন শুধু একটি দিন বা ঘটনার স্মরণে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং তা হয়ে উঠুক আত্মশুদ্ধির অনুপ্রেরণা। রোজা, তাওবা-ইস্তিগফার, কুরআন তিলাওয়াত, তাহাজ্জুদের নামাজ ও দান-সাদকার মাধ্যমে এই মাসকে আমরা পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পারি। পাশাপাশি কুসংস্কার, বিদআত, অপসংস্কৃতি ও লোকদেখানো কর্মসূচি থেকে নিজেকে দূরে রাখা অপরিহার্য।

আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের এই সম্মানিত মাসের হক আদায় করার তাওফিক দেন।
আল্লাহুম্মা আমিন।

Facebook Comments Box