আলেয়া বেগম, একজন গৃহকর্মী, প্রতিদিনের কঠোর পরিশ্রমে অভ্যস্ত ছিলেন। ঘর মোছা, কাপড় ধোয়া—এই সব কাজের পর শরীরে ব্যথা হওয়াটা তার কাছে স্বাভাবিকই মনে হতো। কিন্তু একদিন প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর, তিনি বুঝতে পারেন এটি সাধারণ ক্লান্তি নয়। হাসপাতালে পরীক্ষা করানোর পর ধরা পড়ে—তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত।
চিকিৎসা চলাকালীন তিনি বেশ কিছুদিন কাজে যেতে পারেননি। এই সুযোগে তার কর্মস্থলে অন্য গৃহকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে অসুস্থতার কারণে শুধু যে তার শারীরিক দুর্বলতা বেড়েছে তা-ই নয়, জীবিকাও হারিয়েছেন তিনি। সুস্থ হওয়ার পর নতুন কাজ খুঁজতে গিয়েও নানা সমস্যার সম্মুখীন হন।
আলেয়ার গল্পটি দেশের হাজারও নিম্নআয়ের নারীর চিত্র ফুটিয়ে তোলে, যারা ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর কর্মসংস্থান হারানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতার শিকার হন।
ডেঙ্গুতে নারীরা বেশি ঝুঁকিতে কেন?
২০২৪ সালে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ৫৭৫ জনের মধ্যে ২৯৫ জনই ছিলেন নারী। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নারীদের শারীরিক ও সামাজিক অবস্থান তাদের ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
১. জৈবিক কারণ: নারীদের শরীরে রক্তস্বল্পতা, উচ্চ রক্তচাপ ও হরমোনজনিত জটিলতা বেশি থাকে, যা ডেঙ্গুর প্রভাবকে তীব্র করে তোলে।
২. সময়মতো চিকিৎসার অভাব: নিম্নআয়ের নারীরা চিকিৎসা নিতে দেরি করেন, ফলে ডেঙ্গু গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
3. সামাজিক কারণ: পরিবারের দেখভালের দায়িত্ব নারীদের ওপর বেশি থাকে। তারা নিজের অসুস্থতা এড়িয়ে যান, যা পরে গুরুতর সমস্যা তৈরি করে।
অর্থনীতিতে প্রভাব
দেশের মোট কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪০% নারী, যারা প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু ডেঙ্গুর মতো রোগে আক্রান্ত হলে, তারা শুধু নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, বরং দেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
আলেয়ার মতো গৃহকর্মীরা অসুস্থ হলে তাৎক্ষণিকভাবে কাজ হারান, চিকিৎসার জন্য খরচ বহন করতে হয় এবং সুস্থ হওয়ার পর নতুন কাজ পেতে বাধার সম্মুখীন হন। তাদের জন্য কোনো সামাজিক সুরক্ষা না থাকায়, একবার অসুস্থ হলে তারা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দীর্ঘ সময় নেন।
নারীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবায় দরকার বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ
ডেঙ্গু মোকাবিলায় নারীদের জন্য বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সময়মতো চিকিৎসা ও সচেতনতার অভাব অনেক নারীর জীবন সংকটে ফেলে দেয়।
১. সচেতনতা বৃদ্ধি: ডেঙ্গুর লক্ষণ ও প্রতিরোধ সম্পর্কে নারীদের মধ্যে বিশেষ প্রচারাভিযান চালানো প্রয়োজন।
২. ওয়ান-স্টপ সার্ভিস বুথ: নারীদের চিকিৎসা সহজ করতে এক জায়গায় পরীক্ষা, চিকিৎসা ও ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
৩. ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প: নিম্নআয়ের নারীদের জন্য বিনামূল্যে প্লাটিলেট কাউন্ট ও অন্যান্য পরীক্ষা সুবিধা নিশ্চিত করা দরকার।
ডেঙ্গু শুধু একটি রোগ নয়, এটি নারীদের জীবিকা, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপর বড় ধাক্কা সৃষ্টি করে। আলেয়ার মতো হাজারো নারী এই সমস্যার শিকার হচ্ছেন, অথচ তাদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। নারীদের স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা গেলে, এই ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকার ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে নারীদের জীবন ও জীবিকা রক্ষা করতে।
তথ্য সুত্র ঃ দ্য ডেইলি স্টার