banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 240 বার পঠিত

 

ইসরায়েলি সংসদে পশ্চিম তীর ও মসজিদে আকসা দখলের আইন অনুমোদন

(আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে ‘ডি ফ্যাক্টো’ অধিগ্রহণের পথে ইসরায়েল)

আন্তর্জাতিক আইনের চোখে স্পষ্টভাবে অবৈধ হলেও, ইসরায়েলি সংসদ ‘নেসেট’-এ গত বুধবার(২৩ জুলাই) ৭১-১৩ ভোটে একটি বিতর্কিত বিল পাশ হয়েছে, যার মাধ্যমে অধিকৃত পশ্চিম তীর কার্যত ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ইসরায়েল “ইহুদি, সামারিয়া ও জর্ডান উপত্যকায়” সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করবে। এই অঞ্চলগুলো মূলত পশ্চিম তীরের অংশ, যেগুলো ১৯৬৭ সাল থেকে ইসরায়েলের দখলে রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে অবৈধভাবে অধিকৃত বলে বিবেচিত।
এই বিল ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী পশ্চিম তীর দখলকে এখন থেকে ‘বৈধ’ বলে গণ্য করবে। যদিও আন্তর্জাতিক মহল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো একে একপেশে জবরদখল এবং দখলদারিত্বের শামিল বলেই আখ্যা দিচ্ছে।

এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—পশ্চিম তীরের অন্তর্গত পবিত্র শহর বায়তুল মাকদিস (জেরুজালেম) এবং মুসলমানদের প্রথম কেবলা, মসজিদে আকসার উপর এখন ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ কার্যত আরও দৃঢ় হতে যাচ্ছে।

মূলত ‘ডি ফ্যাক্টো অ্যানেক্সেশন’—অর্থাৎ, আনুষ্ঠানিকভাবে না বললেও, বাস্তবে ভূখণ্ড দখল করে ফেলা—এই নীতিকে কার্যকর করতেই আইনটি পাশ করানো হয়েছে। ইসরায়েল এখন থেকে পশ্চিম তীরে তাদের বসতি নির্মাণ, নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণসহ সব ধরনের কর্মকাণ্ডকে ‘আইনি’ কাঠামোর ভেতরেই চালাতে পারবে।

ইসরায়েলের ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিম তীর ও আল-আকসা মসজিদ সংলগ্ন এলাকাগুলোতে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে সক্রিয় ছিল। এই আইন পাশের মাধ্যমে সেই লক্ষ্য পূরণের দিকেই আরেকটি বড় পদক্ষেপ নেওয়া হলো।

অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব এই সিদ্ধান্তকে ‘মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী অস্থিরতা ডেকে আনার মতো ভয়াবহ উসকানি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে এক বিবৃতিতে জানায়, “এটি একটি উপনিবেশবাদী পদক্ষেপ, যা পশ্চিম তীরে বর্ণবাদী বা ‘আপারথেইড’ শাসনব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করছে।” তারা আরও বলেছে, এই প্রস্তাব জাতিসংঘের বিভিন্ন রেজল্যুশন এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) উপদেষ্টা রায়েরও অপমান।

জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অনেক আন্তর্জাতিক সংগঠন আগেই পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলি কার্যকলাপকে অবৈধ দখল হিসেবে ঘোষণা করেছে। কিন্তু সেসব আন্তর্জাতিক অবস্থানকে উপেক্ষা করে ইসরায়েল এবার সরাসরি সংসদীয় প্রক্রিয়ায় একে আইনিভাবে অনুমোদন দিয়ে চরম এক পূর্বপরিকল্পিত দখলনীতির বাস্তবায়ন করলো।

বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিম তীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের অংশ করে নিলে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তিতে গৃহীত দুই-রাষ্ট্র সমাধান প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। বর্তমানে পশ্চিম তীরে প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনি এবং পাঁচ লাখের বেশি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বাস করেন। বসতির সংখ্যা ও প্রভাব প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে, যা শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও দুর্বল করে তুলছে।

তাদের মতে, এটি শুধু একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং একটি গভীর ধর্মীয় ও ভূরাজনৈতিক বার্তা বহন করে। মসজিদে আকসা মুসলিমদের বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও ইতিহাসের এক অনন্য প্রতীক। এই স্থানকে কেন্দ্র করেই ইসরায়েল বহু বছর ধরে সহিংসতা ও বৈষম্যের রাজনীতি চালিয়ে আসছে।

বর্তমানে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আরব লিগ, ওআইসি (OIC) এবং অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর জোরালো কূটনৈতিক প্রতিবাদ জরুরি হয়ে পড়েছে। ফিলিস্তিনিদের জমি ও ধর্মীয় অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিমধ্যে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বহু মানুষ হ্যাশট্যাগ #FreePalestine ও #SaveAlAqsa ব্যবহার করে এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলছে

Facebook Comments Box