banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 430 বার পঠিত

 

ইসলামে নারীর সম্পত্তিতে অধিকার

ইসলাম ধর্ম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান যা মানবজাতির প্রতিটি দিককে নির্দেশনা দিয়েছে। নারীর মর্যাদা ও অধিকারের প্রশ্নে এমন এক সময়ে ইসলাম যুগান্তকারী ঘোষণা দিয়েছে , যখন নারীদেরকে সমাজে অবজ্ঞা করা হতো, সম্পত্তির অধিকার তো দূরের কথা, তাদের মানুষ হিসেবে বিবেচনাও করা হতো না। অথচ আজ, মুসলিম সমাজে নারীদের সেই ইসলাম-স্বীকৃত অধিকার, বিশেষত সম্পত্তিতে অধিকার, ব্যাপকভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে।

সম্পত্তিতে নারীর অধিকার: স্পষ্ট কোরআনিক ঘোষণা
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে:
“পুরুষদের জন্য রয়েছে অংশ তাদের পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে। আর নারীদের জন্যও রয়েছে অংশ তাদের পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে—অল্প হোক বা বেশি—এটি একটি নির্ধারিত অংশ।”
(সূরা নিসা: আয়াত ৭)
এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, নারীরাও সম্পত্তিতে সমানভাবে অধিকার রাখে। ইসলাম আগমনের পূর্বে আরব সমাজে নারীরা সম্পত্তির কোনো দাবিদার ছিল না। ইসলাম এসে এই অধিকার প্রতিষ্ঠা করে নারীর মর্যাদাকে নিশ্চিত করেছে।

উত্তরাধিকার সূত্রে নারীর অধিকার: কন্যা, স্ত্রী, মা, ও বোনের মর্যাদা
ইসলামী উত্তরাধিকার আইনে (ফরায়েজ) নারীর অংশকে নির্ধারণ করা হয়েছে তার আত্মীয়তার সম্পর্ক ও অবস্থানের ভিত্তিতে। কন্যা সন্তান বাবার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে পায়। স্ত্রী স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর সম্পত্তির নির্দিষ্ট অংশের মালিক হয়। যদি সন্তান থাকে, স্ত্রী পায় অষ্টমাংশ; সন্তান না থাকলে পায় চতুর্থাংশ। মা তাঁর সন্তানের সম্পত্তিতে ষষ্ঠাংশ পান, আর বোন নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে ভাইয়ের সম্পত্তিতে অংশীদার হন।
কোরআনে বলা হয়েছে:
“তোমাদের স্ত্রীদের যদি সন্তান না থাকে, তবে যা কিছু তারা রেখে যায়, তার অর্ধেক তোমরা পাবে। আর যদি সন্তান থাকে, তবে যা কিছু তারা রেখে যায়, তার চতুর্থাংশ তোমরা পাবে।”
(সূরা নিসা: আয়াত ১২)

“পুরুষ দ্বিগুণ পায়” – এই বিধান কেন?
সাধারণভাবে বলা হয়, পুত্র সন্তান দ্বিগুণ পায়, কন্যা পায় অর্ধেক। কোরআনে বলা হয়েছে:
“আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে নির্দেশ দেন—পুরুষ সন্তানকে দুই নারীর সমান অংশ দিতে হবে।”
(সূরা নিসা: আয়াত ১১)
অনেকেই এই আয়াতকে বৈষম্য মনে করেন, কিন্তু এর পেছনে রয়েছে যৌক্তিকতা। ইসলাম পুরুষের উপর পরিবারের ভরণপোষণ, স্ত্রীর খরচ, সন্তানদের শিক্ষা, বোনের বিয়ে, এমনকি বৃদ্ধ মা-বাবার দেখাশোনার দায়িত্বও নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। অর্থাৎ, অধিক সম্পত্তির বিপরীতে পুরুষের উপর আর্থিক দায়িত্বও অধিক। পক্ষান্তরে, নারীকে সম্পত্তি প্রদান করা হলেও তাঁর উপর কোনো বাধ্যতামূলক আর্থিক দায়িত্ব নেই। সে চাইলে ব্যয় করতে পারে, না চাইলে তা সঞ্চয় করতেও পারে।

দেনমোহর ও ব্যক্তিগত সম্পত্তি:
ইসলামে নারীর জন্য বিবাহের সময় দেনমোহর নির্ধারণ করা বাধ্যতামূলক। এটি স্বামীর দ্বারা স্ত্রীর প্রতি একটি সম্মানসূচক উপহার ও তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি। এটি পরিশোধ না করে স্ত্রীকে তালাক দিলে বা স্বামী মৃত্যুবরণ করলে, স্ত্রী আইনি ও শরয়ি অধিকার অনুযায়ী দেনমোহর দাবি করতে পারে।
কোরআনে বলা হয়েছে:
“তোমরা নারীদেরকে তাদের মোহর আনন্দ সহকারে প্রদান করো। যদি তারা স্বেচ্ছায় মোহরের কোনো অংশ ছেড়ে দেয়, তবে তা তোমরা খেয়ে ফেলতে পারো আনন্দের সঙ্গে।”
(সূরা নিসা: আয়াত ৪)

নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা:
ইসলাম নারীর উপার্জন ও সম্পত্তির উপর তার একচ্ছত্র মালিকানা স্বীকার করেছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে:
“পুরুষ যা অর্জন করে, তা তার জন্য; আর নারী যা অর্জন করে, তা তার জন্য।”
(সূরা নিসা: আয়াত ৩২)
এখান থেকে প্রতীয়মান হয় যে, নারীর উপার্জন তারই সম্পদ, কেউ জোরপূর্বক তা নিতে পারে না। এমনকি স্বামীও নয়। এটি আধুনিক নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তার একটি যুগান্তকারী ভিত্তি।

সামাজিক বাস্তবতা: কেন নারীরা বঞ্চিত?
বিস্ময়ের বিষয় হলো, ইসলাম নারীদের সম্পত্তিতে অধিকার নিশ্চিত করলেও আমাদের সমাজেই নারীরা সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত। গ্রামাঞ্চলে তো বটেই, এমনকি শহরের শিক্ষিত পরিবারেও অনেক নারী তাদের পিতৃসম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হন। “বিয়েতে অনেক পেয়েছে”, “ছেলেরা তো সংসার চালায়”—এই অজুহাতে ইসলামি অধিকার লঙ্ঘন করা হয়।
এটি একপ্রকার জুলুম। আল্লাহ বলেন:
“তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।”
(সূরা বাকারা: আয়াত ১৮৮)
হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
“যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারো হক আত্মসাৎ করবে, সে কিয়ামতের দিন সাতবার জাহান্নামে যাবে।”
(সহীহ বুখারী)

এছাড়াও; বর্তমান বিশ্বে ‘নারীর স্বাধীনতা’ ও ‘সমান অধিকার’ স্লোগানে পশ্চিমা নারীবাদীদের একটি অংশ ইসলামকে আক্রমণের অস্ত্র বানিয়েছে। তারা সমতার নামে এমন এক সমাজ গড়ে তুলছে যেখানে একজন নারীকে তার স্বাভাবিক শারীরিক, মানসিক ও পারিবারিক চরিত্র থেকে সরিয়ে অর্থ উপার্জনের যন্ত্রে পরিণত করার চেষ্টা চলছে।

তাদের দাবি, নারী-পুরুষকে সব দিক থেকে এক রকম করতে হবে—এমনকি দায়িত্ব ও শারীরিক কাঠামোর পার্থক্য উপেক্ষা করে হলেও। এর বিপরীতে ইসলাম নারীর সম্মান ও মর্যাদাকে রক্ষা করে ভারসাম্যপূর্ণ দায়িত্ব বন্টন করেছে। ইসলাম সমতা নয়, ন্যায় (Justice) প্রতিষ্ঠা করে—যা প্রকৃত মানবিকতার ভিত্তি।

রাসূল (সা.) বলেন:
“তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, এবং প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।”
(সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

পরিশিষ্ট
ইসলামেই নারীর প্রকৃত অধিকার
ইসলাম নারীকে কেবল সম্পত্তির অধিকার দেয়নি; দিয়েছে সম্মান, মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা। যে সমাজ ইসলামি শরীয়ত মেনে চলে, সেখানে নারী কখনো বঞ্চিত হয় না। বরং যারা ইসলামি জ্ঞান ও ন্যায়বিচার থেকে সরে গেছে, তারাই নারীদের প্রকৃত শত্রু। তাই আমাদের উচিত ইসলাম প্রদত্ত নারীর সম্পত্তির অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এবং তা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হওয়া।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে কোরআন-হাদীস অনুযায়ী নারীর অধিকার বাস্তবায়নের তাওফিক দান করুন। আমীন।

Facebook Comments Box