বাংলাদেশে কন্যাশিশুরা এখনো নানামুখী সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে— এমন তথ্য উঠে এসেছে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি এই প্রতিবেদনে দেখা যায়, কন্যাশিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মাত্রা এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।
শনিবার (৪ অক্টোবর) বিকেল ৩টার পর রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটির তথ্য প্রকাশ করা হয়। জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছে শিশু অধিকার বিষয়ক সংস্থা এডুকো বাংলাদেশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে দেশে ৩৪ জন শিশু অপহরণ ও পাচারের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৮ জন কন্যাশিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও বাকিদের অবস্থান অজানা। একই সময়ে ৮৩ জন কন্যাশিশু খুনের শিকার হয়েছে এবং ৫০ জন কন্যাশিশুর রহস্যজনক মৃত্যু ঘটেছে, যাদের মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যায়নি।
এ ছাড়া, এই সময়ের মধ্যে ৫৪ জন কন্যাশিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে এবং ৩৯০ জন কন্যাশিশু ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, নানা মানসিক ও সামাজিক চাপের কারণে ১০৪টি শিশু আত্মহত্যা করেছে, যা সমাজে কন্যাশিশুর নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্যের চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেটর সৈয়দা আহসানা জামান এ্যানি। তিনি বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের মধ্য দিয়ে নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এমন একটি সমাজ গঠন করতে হবে যেখানে একজন নারী বা কন্যাশিশু কোনো ধরনের সহিংসতার ভয় ছাড়াই ঘর থেকে বের হতে পারবেন এবং নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবেন। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রেও নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সভাপতি ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, আমাদের সমাজে নারী ও কন্যাশিশুর অবস্থার কিছু পরিবর্তন হলেও তা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। বাল্যকাল থেকেই নারীদের প্রতি বঞ্চনা ও বৈষম্যের অবসান ঘটাতে হবে। তাদের শিক্ষা, পুষ্টি ও দক্ষতায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তিনি আরও বলেন, “নারীর অবস্থার পরিবর্তন মানে পুরো জাতির অবস্থার পরিবর্তন।”
সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংসদে নারীদের সরাসরি নির্বাচনের প্রস্তাব নিয়ে পাঁচবার আলোচনা হয়েছে, কিন্তু ১০০ আসনে নারীদের সরাসরি নির্বাচনের বিষয়ে এখনো ঐকমত্য হয়নি। তিনি মন্তব্য করেন, “এই ঘটনায় নারী রাজনৈতিক অধিকার পরাজিত হয়েছে— জয়ী হয়েছে পুরুষতন্ত্র।”
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, আইনি কাঠামোর কার্যকারিতা নিশ্চিতকরণ এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে শিশুবান্ধব পরিবেশ তৈরির বিকল্প নেই। ফোরামের মতে, কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র— তিন পক্ষকেই আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।














