ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি সবসময়ই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এর মধ্যেই ডাকসু নির্বাচন একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব নির্বাচন করে, অন্যদিকে জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনারও ইঙ্গিত দেয়। এবারের নির্বাচনে বিশেষভাবে নজর কেড়েছেন ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’-এর নারী প্রতিনিধি সাবিকুন্নাহার তামান্না।
বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীসংস্থার সভানেত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। ক্যাম্পাসে নারীর নেতৃত্ব এখনো সীমিত হলেও তামান্নার প্রার্থিতা সেই সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে এক সাহসী পদক্ষেপ।
প্রচারণার শুরুতেই তিনি এক কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর নেকাব করা ছবি বিকৃত করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যা সাইবার বুলিংয়ের ভয়াবহ রূপ নেয়। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করা হলেও প্রত্যাশিত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে সহপাঠী ও সহপ্রার্থীরা একযোগে প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, এমন ঘটনার বিচার না হলে নারী শিক্ষার্থীরা নিরাপদ বোধ করবেন না। তামান্না নিজেও দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে প্রকৃত গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হবে না।”
প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়েও হাল ছাড়েননি তামান্না। তিনি এবং কয়েকজন নারী প্রার্থী মিলে উচ্চ আদালতে একটি রিট আবেদন করেন। তাঁদের দাবি ছিল—ভোটার তালিকায় নারী শিক্ষার্থীদের ছবি ও ব্যক্তিগত তথ্য সীমিতভাবে প্রদর্শন করা হোক। প্রয়োজনে রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করা যেতে পারে, যাতে কারও তথ্য বা ছবি অপব্যবহার না হয়। এই উদ্যোগ শুধু বর্তমান নির্বাচন নয়, ভবিষ্যতের নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার পথও প্রশস্ত করছে।
নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ নিয়েও তামান্না গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তাঁর মতে, পরিবারিক বাধা, নিরাপত্তাহীনতা এবং পরীক্ষার সময়সূচির কারণে অনেক নারী শিক্ষার্থী ভোট দিতে আসতে পারেন না। এজন্য তিনি ভোটকেন্দ্র পুনর্বিন্যাস এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেন। তাঁর বক্তব্য ছিল স্পষ্ট—“নারীরা যদি নির্ভয়ে ভোট দিতে না পারেন, তবে গণতান্ত্রিক চর্চা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।”
তামান্নার নির্বাচনী ইশতেহারে উঠে এসেছে নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, নির্বাচিত হলে ক্যাম্পাসে সাইবার-সুরক্ষা সেল গঠন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বিশেষ অভিযোগ কমিটি চালু এবং নারীদের সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবেন। তাঁর ভাষায়, “নারীরা শুধু দর্শক নয়, তারা নেতৃত্বেও সমানভাবে জায়গা করে নেবে।”
ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরে সবসময়ই অরাজকতা ও সহিংসতার শঙ্কা থাকে। তবুও সাবিকুন্নাহার তামান্নার দৃঢ়তা স্পষ্ট করে প্রতিকূলতার ভেতর দিয়েই নতুন পথ তৈরি করা যায়।
তাঁর লড়াই কেবল একটি নির্বাচনী আসনের জন্য নয়; বরং নারী শিক্ষার্থীদের অধিকার ও নেতৃত্বের স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। তিনি এক নতুন আশা দেখাচ্ছেন—যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে নারীরা সমান অংশীদার হয়ে উঠবে।














