banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 203 বার পঠিত

 

দিবস উদযাপনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সহিংসতা

সে রাজকন্যা নয়, না কোনো রূপকথার চরিত্র। তবু দক্ষিণ এশিয়ার কোটি শিশুর অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে সে। তার কণ্ঠস্বর স্কুলে পাঠিয়েছে মেয়েদের, শিখিয়েছে স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের উপায়, আর সাহস জুগিয়েছে বাল্যবিবাহ ও যৌতুকের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে। তার নাম মিনা—যে কেবল কার্টুনের কাগুজে চরিত্র নয়, বরং কন্যাশিশুর অধিকার নিয়ে কথা বলার প্রতীক।

মীনার বয়স আমরা জানি না, জানি না তার গ্রাম বা স্কুলের নামও। তবু দক্ষিণ এশিয়ার কোটি শিশু তাকে নিজেদের মতো করে চিনে নিয়েছে। কারণ মীনা কেবল একটি কার্টুন চরিত্র নয়, সে শিশুদের অধিকার নিয়ে সমাজকে ভাবিয়েছে, বিশেষ করে মেয়েশিশুদের শিক্ষা ও স্বপ্নের কথাই সে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়ে বলেছে।

১৯৯০ থেকে ২০০০ সালকে দক্ষিণ এশিয়ার কন্যাশিশুর দশক ঘোষণা করা হয়। সেই প্রেক্ষাপটে ইউনিসেফ তৈরি করে মীনা কার্টুন, যা বাংলাদেশসহ একাধিক দেশে শিশুদের সচেতনতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৯৮ সাল থেকে প্রতিবছর ২৪ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে মীনা দিবস।

অন্যদিকে বাংলাদেশে ২০০০ সাল থেকে প্রতি বছর ৩০ সেপ্টেম্বর পালন করা হচ্ছে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস। লক্ষ্য একটাই—কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতা বন্ধ করা, তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

কন্যাশিশু দিবস বা মীনা দিবস—দুটিই আমাদের মনে করিয়ে দেয় রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্বের কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন ছবি দেখায়।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, আইন থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২২-২৪ বছর বয়সী নারীদের অর্ধেকের বেশি ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়।

শুধু বাল্যবিবাহ নয়, নানা নির্যাতন ও সহিংসতার খবরও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৯০১ কন্যাশিশু নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪০০ জন, ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১১৭ জনের ওপর। সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র মার্চ মাসে—এ মাসেই ২৪৮ কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার হয়, যাদের মধ্যে ৭৮ জন প্রাণ হারায়।

তবে প্রকাশিত সংখ্যাগুলো পুরো ছবিটা তুলে ধরে না। অনেক নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনা পরিবার ও সমাজের আড়ালে চাপা পড়ে যায়। ভুক্তভোগী কন্যাশিশুরা নীরবে যন্ত্রণা সয়ে যায়, আর সমাজে তৈরি হয় এক অদৃশ্য ভয় ও অবিশ্বাসের দেয়াল।

মীনা দিবস বা কন্যাশিশু দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। শিশুদের প্রতি সহিংসতা রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ, শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং পরিবারে সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি।

কন্যাশিশুরা কেবল ভবিষ্যৎ নয়, তারা বর্তমানের নাগরিকও। তাদের অধিকার সুরক্ষিত হলে তবেই সমাজ সত্যিকার অর্থে মানবিক হয়ে উঠবে।

Facebook Comments Box