banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 373 বার পঠিত

 

গুম কমিশনের মস্তিষ্ক ড. নাবিলা ইদ্রিস

বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় বলপূর্বক গুম ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের অনুসন্ধানে গঠিত “গুম অনুসন্ধান কমিশন” এখন এক ঐতিহাসিক প্রয়াসের প্রতীক। এই কমিশন শুধু অতীতের অন্ধকার উন্মোচন করছে না, বরং রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের নতুন এক আলোচনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এই উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ড. নাবিলা ইদ্রিস—যিনি বর্তমানে “গুম কমিশনের মস্তিষ্ক” হিসেবে সর্বত্র পরিচিত।

ড. নাবিলা ইদ্রিস আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন গবেষক ও নীতিবিশ্লেষক। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যের Open University-তে ভিজিটিং ফেলো হিসেবে কাজ করছেন, যেখানে তিনি বৈশ্বিক সামাজিক সুরক্ষা (Global Social Protection Fund) বিষয়ক গবেষণায় যুক্ত। একইসঙ্গে তিনি বাংলাদেশের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (BIGD)-এর খণ্ডকালীন গবেষক হিসেবেও কাজ করছেন।
তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের US State Department IVLP প্রোগ্রামের ফেলো হিসেবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। চীন, থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশে নীতি বিশ্লেষণ, শাসনব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিয়ে তার বিস্তৃত কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

তার গবেষণার মূল ক্ষেত্র হলো বাংলাদেশের ক্ষমতার কাঠামো, নীতি নির্ধারণের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা। এই তাত্ত্বিক গভীরতা ও বিশ্লেষণী নেতৃত্বের ফলেই গুম অনুসন্ধান কমিশন আজ একটি প্রমাণনির্ভর, নিরপেক্ষ ও নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

কমিশনের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বে কাজ চললেও, কমিশনের দিকনির্দেশনা, গবেষণা পরিকল্পনা, তথ্য বিশ্লেষণ ও সুপারিশ প্রণয়নের মূল দায়িত্বে রয়েছেন ড. নাবিলা ইদ্রিস। তার তত্ত্বাবধানে কমিশন ইতোমধ্যে দুটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন ও একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশ করেছে, যেখানে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সংঘটিত শতাধিক বলপূর্বক গুমের সত্যতা ও পদ্ধতি তুলে ধরা হয়েছে।

প্রামাণ্যচিত্রে উঠে এসেছে ভয়াবহ সব তথ্য—গাড়ির ভেতরে ইনজেকশন পুশ করে হত্যা, বিষ প্রয়োগ, কিংবা লাশ রেললাইনে ফেলে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের হাতে হ্যান্ডকাফসহ মৃতদেহ পাওয়া গেছে। এমন অগণিত প্রমাণ কমিশনের প্রতিবেদনে যুক্ত হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের নির্মম বাস্তবতাকে নগ্নভাবে প্রকাশ করেছে।

ড. নাবিলার নির্দেশনায় কমিশন শুধু ঘটনাগুলোর তদন্তেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ভবিষ্যতের জন্য নীতিগত সংস্কারেরও প্রস্তাব দিয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে প্রণীত গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো হলো—
গুমের শিকার পরিবারদের জন্য “ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স সার্টিফিকেট” প্রবর্তন, যাতে তারা আইনি স্বীকৃতি ও ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব ও সম্পদ সংরক্ষণের জন্য বিশেষ আইনি সুরক্ষা।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য মানসিক ও আর্থিক সহায়তা তহবিল গঠন।

নাগরিক সমাজের বিশ্লেষকরা বলছেন, ড. নাবিলা ইদ্রিস এই কমিশনকে কেবল তথ্য-সংগ্রহের কাঠামোতে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং তিনি এটিকে এক নৈতিক আন্দোলনে পরিণত করেছেন—যেখানে প্রতিটি সাক্ষ্য, প্রতিটি দলিল, প্রতিটি পরিবারিক কান্না হয়ে উঠছে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার দলিল।

একজন বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মীর ভাষায়, “নাবিলা ইদ্রিস হচ্ছেন সেই কণ্ঠ, যিনি ভয় নয়, তথ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। তার মতো মানুষের হাতেই জনগণের আস্থা ফিরছে ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়ায়।”

আজ “গুম অনুসন্ধান কমিশন” শুধু নিখোঁজদের তথ্যভান্ডার নয়, এটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের ইতিহাসে ন্যায়, সাহস ও মানবতার নতুন সংলাপ।
আর এই সংলাপের সূক্ষ্ম নকশাকার—ড. নাবিলা ইদ্রিস, যিনি প্রমাণ করছেন, গবেষণা ও নৈতিকতার সমন্বয়েই সম্ভব সত্যের পুনরুদ্ধার।

রাষ্ট্রের নীরব অন্ধকারের ভিতর থেকে তিনি যেন আলোর রেখা টেনে আনছেন-একজন নারী, এক গবেষক, এক নির্ভীক কণ্ঠস্বর—বাংলাদেশের গুম ইতিহাসে ন্যায়ের নতুন নির্মাতা, ড. নাবিলা ইদ্রিস।

Facebook Comments Box