banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 76 বার পঠিত

 

অন্তঃসত্ত্বা শিক্ষক নুসরাতের সাত বছরের লড়াই

বর্তমানে নুসরাত বেতন অ্যাকাউন্ট সচল করা ও জব্দ করা ব্যক্তিগত মালামাল ফেরত পাওয়ার জন্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছেন। 

দীর্ঘ অন্ধকার সময় পেরিয়ে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও, এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের এক বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে থাকবে।

ফেসবুকে একটি পোস্ট শেয়ার করার কারণে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় কারাবরণ, চাকরিচ্যুতি ও দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের শিকার হন, পটুয়াখালীর কলাপাড়ার দক্ষিণ টিয়াখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নুসরাত জাহান সোনিয়া। প্রায় সাত বছর পর অবশেষে তিনি মামলা থেকে অব্যাহতি পান এবং পুনরায় চাকরিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ ফিরে পান।

২০১৮ সালের জুলাই–আগস্টে নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় নুসরাত ফেসবুকে অন্যের একটি লেখা শেয়ার করেন। ওই শেয়ারের জেরে ২০১৮ সালের ৪ আগস্ট গভীর রাতে তাঁকে আটক করে কলাপাড়া থানায় নেওয়া হয়। পরদিন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।

গ্রেপ্তারের সময় নুসরাত সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। তাঁকে প্রায় ১২ ঘণ্টা থানায় বসিয়ে রাখা হয় এবং পরে ১৪ দিন কারাগারে থাকতে হয়। একই সময় তাঁকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়, যা তাঁর পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে গভীর সংকট তৈরি করে।

কারাগারে থাকাকালীন নুসরাতকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে হয়েছে বলে তিনি জানান। বড় পেট নিয়ে মেঝেতে পাতলা কম্বলের ওপর ঘুমানো, পর্যাপ্ত খাবারের অভাব এবং মানসিক চাপে দিন কাটাতে হয়েছে তাঁকে। জামিন শুনানির সময়ও রাষ্ট্রপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে আপত্তি তোলে।

জেল থেকে বের হওয়ার পর নুসরাতকে নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক অপবাদ ও ভয় তাঁকে দীর্ঘদিন ঘরবন্দী করে রাখে। অনেকেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ এড়িয়ে চলতেন, যা মানসিকভাবে তাঁকে আরও বিপর্যস্ত করে তোলে।

জেল থেকে বের হওয়ার পর নুসরাতকে নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক অপবাদ ও ভয় তাঁকে দীর্ঘদিন ঘরবন্দী করে রাখে। অনেকেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ এড়িয়ে চলতেন, যা মানসিকভাবে তাঁকে আরও বিপর্যস্ত করে তোলে।

দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ২০২৪ সালের ২২ মে হাইকোর্ট মামলাটি বাতিল করেন। আদালত বলেন, মামলার চার্জশিট দাখিলের সময় সংশ্লিষ্ট আইন কার্যকর ছিল না, ফলে এটি আইনের অপব্যবহার হিসেবে বিবেচিত হয়।

এরপর গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের আদেশে নুসরাতের সাময়িক বরখাস্ত প্রত্যাহার করা হয়। বরখাস্তকালীন সময় চাকরিকাল হিসেবে গণ্য হবে এবং বকেয়া বেতন–ভাতাও তিনি পাবেন বলে জানানো হয়। ২৯ ডিসেম্বর তিনি পুনরায় কর্মস্থলে যোগ দেন।

নুসরাতের গর্ভে থাকা সন্তানটির বয়স এখন সাত বছরের বেশি। সেই সন্তান আজ মায়ের কাছে জানতে চায়, তাকে পেটে নিয়ে কেন মাকে জেলে যেতে হয়েছিল। এই প্রশ্ন নুসরাতকে এখনো মানসিকভাবে নাড়া দেয়।

মানবাধিকার সংগঠন ব্লাস্টের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন বলেন, নুসরাতের সঙ্গে যা ঘটেছে তা গুরুতর অন্যায়। এ ঘটনার পূর্ণ তদন্ত হওয়া উচিত এবং দায়ীদের জবাবদিহির পাশাপাশি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বর্তমানে নুসরাত বেতন অ্যাকাউন্ট সচল করা ও জব্দ করা ব্যক্তিগত মালামাল ফেরত পাওয়ার জন্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছেন। 

দীর্ঘ অন্ধকার সময় পেরিয়ে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও, এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের এক বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে থাকবে।

Facebook Comments Box