শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ ইং, ,

 

পিতা পুত্রের আত্মকাহিনী

গাজী আনোয়ার শাহ্


পৃথিবীতে নিজের খুশিমত আসিনি, খুশিমতো চলেও যাব না। জীবন হাত ধরে নিয়ে এসেছিল বলেই এসেছি। মৃত্যু
হাত ধরে নিয়ে চলে যাবে, তখন চলে যাব।

সব সময় বৃষ্টির ফোঁটার হাত থেকে বাঁচাত। রাতের বেলা আকাশের তারা গোণা হতো এই বটগাছের ছায়ায় বসে। হঠাৎ বটগাছটা বাতাসে মিলিয়ে যায়, মিলিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বুঝিনি, এর মর্ম কি। আজ বুঝি।

ওহ হ্যাঁ,বাবার কথা বলছিলাম আর কি।

“বাবা”এই চরিত্রটা একটু অদ্ভুত। কখনো হয়ত খুব কাছ থেকে আপনি তাকে পাবেন না। তবে দুরে গেলেই হয়ত বুঝতে পারবেন বাবা নামক এই মানুষটি আপনার কত কাছে ছিলো। প্রত্যেক বাবার কাছেই তার মেয়ে রাজকন্যা এবং তার ছেলে রাজপুত্র । এই বাবা তার সন্তানের জন্য কতটা ছাড় দিয়ে থাকেন তা হয়ত একটা ছেলে বাবা হওয়ার আগে টের পায় না।

জানেন, আমাদের দেশের মায়েরা সন্তানদের সারাদিনই বকাবকি করে, আর সে সময়টাতে সন্তানের আশ্রয়স্থল থাকে বাবা। মায়ের বকাবাদ্য হয়ত বাবার কোল পর্যন্ত শোনা যায় না। তাই পরম শান্তিতে বাবার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়া যায়। তবে, বাবারাও হয়ত রাগে। সে সময়টাতে হয়ত মায়ের কোল পর্যন্ত গিয়েও সন্তানের নিস্তার হয় না।

একটা কথা শুনেছিলাম, একটা মেয়ে তখনই মা হয় যখন সে জানতে পারে সে মা হতে চলেছে। আর একটা ছেলে তখনি বাবা হয় যখন সে তার নিজ সন্তানকে কোলে নিয়ে দুচোখ ভরে দেখতে পারে।

আমার বাবাটাও না ঠিক একই রকম ছিলো, শেষ সময়টায় বাবা খুব অসুস্থ ছিলো। সেবার জন্য নিজের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করে বাবাকে খুশি রাখতে পেরেছি বলে মনে হতো। বাবা সন্তান হিসেবে হয়তো দোয়া করতো। মাঝে মাঝে বাবা হাসতো, খুব অদ্ভুত একটা হাসি। হয়ত বুঝি নি, সেই হাসিটাতে ছিলো শত কষ্টের মাঝেও আমাকে খুশি রাখার জন্য বিশেষ প্রচেষ্টা।

আমার বাবাটা হয়ত খুব স্বার্থপর ছিলো, তাই যখনই কোন ভালো কাজ করতাম তখনই বলে উঠতো:-

আমার ছেলে।
আর খারাপ কাজ করলেই হয়ে যেতাম মায়ের ছেলে।এটাই হয়ত প্রত্যেক বাবার রীতি।

সেই বাবাটা আজ নেই। হারিয়ে গেছে সেই বটগাছটার মত। আজ বুঝি, এই বাবাটা আমার কত কাছে ছিলো।আমার এখনো মনে পড়ে বাবার সাথে আমার শেষ স্মৃতিগুলো। পাশেই বসা ছিলাম শেষ সময়টা পর্যন্ত।

ছয় মাস হতে চললো ক্যাম্পাস, বন্ধু, আড্ডা কোন কিছুতেই কেউ খুঁজে পায়নি আমাকে। আমিতো বাবার মাথার পাশে বসে বাবাকে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখাতাম। বাবার সাথে গল্প করতাম। বাবার খত মাংসের ড্রেসিং করতাম। মাঝে মাঝে গোস্তের স্তুপ কেটে তার উপর আমাকেই ব্যান্ডেজ করতে হতো। রক্ত, পুঁজ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটা ছেঁড়া আমাকে বিরক্ত করতে পারেনি, আমি বাবাকে ভালোবাসি। বাবার কোলে শিশুবেলা ঘুমাতাম। তাই আমিও গল্প বলে বাবার ঘুম পাড়াতাম।
বাবা নয় কেবল পুরো পরিবারের মধ্যমনি হয়ে উঠেছি। আমার অনুপস্থিতি কেউ মেনে নিতে পারতো না।

শেষ সময়টা বাবাকে কালেমা পড়াচ্ছিলাম আর মুখে হালকা পানি দিলাম। তখনো বুঝতে পারিনি বাবা ঠিক এখনি এতিম করে চলে যাবে। খুব কষ্ট পেতো বাবা, কিন্তু সব সময়ই একটি দোয়া করতাম বাবা তোমার অসুখটা যেন না বেড়ে যায়, যেভাবে আছো, থাকো। আমি এখানেই স্বর্গের সুখ খুঁজে পেয়েছি। সন্ধ্যে বেলা প্রায়শই ঘরে থাকা হয় না। কিন্তু বাবার মৃত্যুর দিন আমি বিকাল থেকেই ঘরে।

বাবা আজ আর নেই। আমি কান্না করিনি। কেনো জানি ভুলে গিয়েছিলাম কান্না করতে। আমি পারি না কাঁদতে। সবাই আকাশ ভারি করে ফেলছে, আমি নিতান্তই চুপ। আমার কান্নাগুলোকে হিমালয়ের স্তুপের নিচে চাপা দিয়ে দিয়েছি।

(মাইকে ভেসে আসছে
“একটি শোক সংবাদ…..।” লইন্নালিল্লাহির………রাজীউন।
মরহুমের জানাযার নামাজের সময়…………. )

পুরোটা রাত ধরেই বাবার নিথর দেহের পাশে নিশ্চুপ বসে আছি। তখনো আমি কান্না করিনি। হয়ত বুঝতে পারছি ঠিক করে নিজের ব্যাথার পাহাড় ভাঙ্গবো। এখনো কান্না করি না, শুধু মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে জ্বলজ্বল করা তারাগুলোর মাঝে বাবাকে খুঁজি। হয়ত একদিন খুঁজে পাবো বাবাকে ওই দূর আকাশে, যে আমায় দেখে হাসছে আর দোয়া করছে।

বাবার দেহকে চার খুঁটির খাটে নিয়ে সকালেই বের হলাম ইদগাহের দিকে। নামায হবে, শেষ নামায। আমিই নামায পড়াই। বাবারও তাই ইচ্ছা ছিলো। শেষ করে নিয়ে চললাম স্থির পায়ে গোরস্তানের ছোট্ট সে ঘরের দিকে। পিছনে মানুষের স্রোত। নির্বাক আমি। বাবাকে রেখে দিলাম সে ঠিকানায়, যে ঠিকানায় যাবে বলে জন্মেছিলো বাবা। আজ তাকে রবের কাছে সমর্পণ করে দিলাম। মাটির পর মাটি পড়ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে গেল বাবা।

ফিরে আসছি ঘরের দিকে, বাবাকে একা রেখে অন্ধকারের সে ছোট্ট কুঠিরে। কাল পর্যন্ত আমার সব ছিলো, ঠিক এখন আমি এতিম। গভীর রাত এখন, শুয়ে আছি বাবার স্মৃতিকে বুকে জড়িয়ে। যে খাটে বাবা নির্বাক শুয়ে ছিলেন মাসের পর মাস। আজ একাই শুয়ে আছি আমি।

বাবা এখন আমি তোমার জন্য কাঁদবো। পৃথিবীর সব ঘুমিয়ে পড়েছে, নিশ্চুপ চারিপাশ। নিরব, নিথর, ঘুটঘুটে অন্ধকার। এ সময়ে বাবা ঘুম থেকে উঠে রবের দুয়ারে হাত তুলো কাঁদতো। আজ আমি রবের কাছে কেঁদে বলছি, হে প্রভু তুমি বাবাকে জান্নাতের মেহমান করে নাও। তোমার প্রিয় পাত্র হিসেবে কবুল করো। (আমিন)

ভালো থাকুক সকল বাবারা। এপারের অথবা ওপারে।

পর্ব -১
আনোয়ার শাহ্
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়,
আরবি বিভাগ,
৪র্থ বর্ষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই রকম আরও খবর