শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ ইং, ,

 

অন্য, এক নীল ব্যাথা- বেবি ব্লুস

ফাতিমা খান


নীল আকাশ, নীল জল, নীল নির্জনতা কিংবা নীল নীল ব্যাথার কথা আমরা গল্প, কবিতা বা গানে অনেক শুনেছি। কিন্তু এমন এক নীল কষ্টের কথা কি কেউ জেনেছেন যা একজন মা সন্তান জন্মদানের পর থেকে ভুগেন? আমরা কজনে জানি তাদের কষ্টের কথা?

তাহলে আসুন একটা গল্প বলি। গল্প না ঠিক, সত্য ঘটনা।

ভদ্রমহিলা আমার ডাক্তার কলিগের স্ত্রী।ঘটনা তাদের তৃতীয় সন্তান জন্মের সময়ের। এমনিতে তিনি অত্যন্ত অমায়িক ও স্বামী সংসারের প্রতি বেশ যত্নশীল । কিন্তু কি যে হল, বাচ্চার জন্মের পর থেকেই তিনি হঠাত করে একদম বদলে গেলেন। সারাক্ষন কাঁদেন, খাওয়া দাওয়া বন্ধ, ঘুম নাই চোখে, বড় দুই বাচ্চাকে শুধু শুধুই বকা ঝকা করছেন, তার জীবনের কিছু বাকী নাই…জাতীয় কথাবার্তা বলেন।
এদিকে নানা জনে নানারকম কথা বলছে, ‘ বাচ্চা সুস্থ হয়েছে তো?’ ‘মেয়ে বাচ্চা বলে কি মন খারাপ?’ ‘মায়ের জন্য মন কাদছে কি? দেশে পাঠিয়ে দেন’ ইত্যাদি ইত্যাদি।

স্বামী বেচারা টেনশনে পড়ে গেলেন। ডিউটি করবেন নাকি ঘর সামলাবেন। ঘটনা চরমে পৌছালো যখন একদিন ভদ্রলোক বাসায় ফিরে দেখেন তার স্ত্রী চাকু নিয়ে বসে আছেন স্বামীকে খুন করবে বলে !

ডাক্তার সাহেব অবশেষে সব সামাল দিয়েছেন অনেক ধৈর্যের সাথে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের জ্ঞান ভাল কাজে লেগেছিল সেদিন। এখন তারা ভালই আছেন।

প্রসুতি মায়ের এই সমস্যার নাম পোস্ট পার্টাম ব্লুস ( Postpertum blues) বা বেবি ব্লুস ( baby blues) অথবা পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন (Postpertum depression)।

আজ দেখা হয়েছে এমন আরেকজন মায়ের সংগে। দাতের চিকিৎসার জন্য আসলেও উনার প্রোফাইলে গাইনোকলজিস্ট এর কমেন্টে দেখলাম উনি পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশনে ভুগছেন। অযথাই কান্নাকাটি করছেন, স্বামীকে সহ্য করতে পারছেন না।

বেবি ব্লুস এ আক্রান্ত মায়েরা কিছুটা বিষন্নতায় ভুগেন। শতকরা প্রায় ১৫ জন মা ই বেবি ব্লুসে আক্রান্ত হন।কিন্তু আমরা অনেকেই কিংবা তার পরিবার ও স্বজনরা ব্যাপারটা বুঝতে পারিনা।সবসময় মন খারাপ থাকা, খাওয়া দাওয়া না করা, অকারণে কান্নাকাটি করা,ঠিকমত না ঘুমানো, কখনো কখনো ভয় পাওয়া এর কিছু লক্ষণ। সাধারনত সপ্তাহ দুয়েক এরকম সমস্যা স্থায়ী হতে পারে। কখনো এর বেশীও হয়।

লক্ষণগুলো যদি তীব্র হয়ে যায় একপর্যায়ে রোগিনীর সুইসাইডাল টেন্ডেন্সি হতে পারে। কখনো নিজের সন্তান বা স্বামীকেও খুন করার ইচ্ছে জাগতে পারে। এই অবস্থাকে বলা হয় পোস্ট পার্টাম সাইকোসিস।

জেনে রাখা ভাল যে বেবি ব্লুস এ আক্রান্ত মায়েরা কিন্তু মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত বা পাগল নন। তাদের সমস্যাগুলো সাময়িক। প্রসবের পরপর হরমোনের পরিবর্তনের কারণে এমনটা হতেই পারে। এসময় দরকার তার অনেক যত্ন আর সাইকোলজিকাল সাপোর্ট।পুষ্টিকর খাবার, রুটিন লাইফ ও রিল্যাক্স থাকলে দ্রুত সেরে ওঠা যায়। কখনও যদি এ সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হয় তবে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা প্রয়োজন।

দশ দশটি মাস একটি ভ্রূনকে গর্ভেধারন, নিজের স্বাস্থ্য, পুষ্টি থেকে প্রতিদিন একটু একটু নিঃশেষ করে একটা পুরা মানব শিশুর বৃদ্ধি অত:পর প্রসব খুব নগন্য কোন ঘটনা নয়। এসময় তাদের দেহ, মন, হরমোন সবকিছুতেই এক বিরাট পরিবর্তন আসে। এমনিতেও একজন প্রসুতি মা পরিবারের সবার যত্ন আত্তির হকদার ও মধ্যমণি হওয়া উচিত। মনে রাখবেন একজন সুস্থ মা ই আপনাকে একজন সুস্থ সন্তান দিতে পারে।

লেখিকা: আল হিবা মেডিক্যাল গ্রুপ, জেদ্দা, সৌদি আরব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই রকম আরও খবর