রবিবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৭ ইং, ,

 

n-MUSLIM-WOMEN-628x314-300x150

কিভাবে মুসলিমরাই সত্যিকারের নারীবাদী

নারীবাদীরা কেমন হয়?  আমেরিকান নারী হিসাবে আমারা সবাই ধারণা করি যে নারীবাদী সাধারণত সেইসব ফ্রি ল্যান্সার নারী, পৃথিবীতে যারা সব ধরণের যৌন স্বাধীনতা ভোগ করার সাহস করে থাকে ।  কিন্তু আমেরিকান নারীবাদের সবচেয়ে বড় সমস্যাই এটা । এই ধরণের নারীবাদের সবটাই মূলত যৌন বিষয় এবং আমাদের দেহের স্বাধীনতা নিয়ে । বিশেষকরে গর্ভপাত এবং গর্ভনিরোধ করার স্বাধীনতা এই স্বাধীনতার একটা অংশ । কিন্তু বর্তমান সমাজে নারীদের নারীবাদের লড়াই অন্যদিকে মোড় নিয়েছে এবং তাতে একটা আলাদা ধরণের সূর ধ্বনিত হচ্ছে ।

যেমন স্তনের স্বাধীনতার বিষয় নিয়ে কাজ করার কারণে আমাদের নারী দেহের প্রতি অন্যদের অসম্মান সৃষ্টিতে কাজ করছে; এমনকি এই বিষয়কে আরও উৎসাহিত করছে । আমাদের চারপাশে যারা আছে তাদের মধ্যে আমাদের নারী দেহের প্রতি অসম্মানজনক সাধারণ আচরণ প্রদর্শনে আরও বেশি প্রভাবিত করে থাকে।

যদি আমরা নারী হিসাবে সম্মান ও শ্রদ্ধা পেতে চাই তাহলে নারীবাদের নতুন উৎসের প্রতি আমামদের খেয়াল করা উচিত । আর সেই নতুন উৎস হচ্ছে মুসলিম নারী । সত্যিকারের মুসলিম নারী ও পুরুষ প্রত্যেকের দেহকে পবিত্র উপাসনালয় হিসাবে বিবেচনা করে থাকে । বিশেষ করে নারী দেহকে আরও বেশি পবিত্র মনে করে  । সবার সম্মুখে নিজেকে উন্মুক্ত না করার মনোভাব তাদেরকে বিনম্রতা প্রদান করেছে ।

আমেরিকার খুব জনপ্রিয় ধ্যান- ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত বিষয় এই যে “ইসলামে নারীর ক্ষমতায়নের একটি অসাধারণ সংস্কৃতি এবং ইতিহাস আছে ।” কোরআনে ইহা সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ আছে যে নারী ও পুরুষ উভয়েই সমান গুরুত্বের অধিকারী তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম এবং দায়িত্বের দিক থেকে ।  পরিবার, দানশীলতা, শিশু, যৌনতা এবং অন্যান্য কর্তব্যের দিক থেকে নারী ও পুরুষ উভয়েরই প্রায় একই ধরণের কর্তব্য রয়েছে এবং এই কর্তব্য সমূহ সোজা সাপটা পথে পরিচালিত হবে ।

ইসলামের শুরুর দিকে মহিলাদের মধ্যে এই বিশ্বাস সদা উদ্ভাসিত ছিল । এই হিসাবে প্রথম মুসলিম নারী হচ্ছেন খাদিজা, মুহাম্মদের স্ত্রী । তার প্রভাব ছাড়া হয়তো ইসলাম যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে তাও না হতে পারতো । খাদিজা ছিলেন একজন ব্যবসায়ী নারী এবং আরব ভুমিতে একজন ভূস্বামী বা জমিদার স্বরূপ ছিলেন তিনি । যখন মুহাম্মদের উপর আয়াত নাজিল হতে থাকে তখন খাদিজাই প্রথম তাকে আস্বস্থ করেন যে তিনি মুহাম্মদ পাগল হচ্ছেন না । তিনি মুহাম্মদকে খুব পছন্দ করতেন এবং তাকে অনেক সাহস যোগাতেন ।খাদিজা  মুহাম্মদকে বলতেন প্রভু এবং তার পাঠানো ফেরেশতা যিনি প্রভু ও মুহাম্মদের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে কাজ করছেন তার কথা শুনতে । খাদিজাই মুহাম্মদকে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করতেন এবং তার মাঝে আত্মবিশ্বাস তৈরিতে সহায়তা করতেন যে মুহাম্মদই শেষ নবী ।

খাদিজা যিনি একজন নারী তার মাঝে এমন শক্তি ছিল যে তিনিই ইসলামকে স্বরূপে প্রস্ফুটিত হতে সহায়তা করেছেন । এই উদাহরণই আমাদের আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে সত্যিকারের মুসলিম নারীরা আসলে কেমন? তারা, স্বচালিত, নিশ্চিত, সাহসী এবং একজন নারীবাদের সর্বচ্চো চুড়ায় অবস্থান করে ।

অতএব ইহা এখন বলার কোন অপেক্ষা রাখে না যে বর্তমানে মুসলিম নারীরা এই প্রখ্যাত নারীর পরে কিভাবে নিজেদেরকে সবার সামনে অনুকরণীয় আদর্শ হিসাবে উপস্থাপন করছে ।

মুসলিম নারীরা দিকনির্দেশনার জন্য শক্তির নিদর্শনের দিকে দৃষ্টিপাত করে থাকে । সত্যিকারের মুসলিম নারীরা হিজাব পরে থাকে ।হিজাব হচ্ছে এক ধরণের হেড স্কার্ফ যা  অধিকাংশ মুসলিম  নারী পরিধান করে থাকে । এবং ইহা মনে করার কোন অবকাশ নেই যে সত্যিকারের হিজাবধারীরা স্বামী বা বাবার চাপে হিজাব পরে । হিজাব পরা আর না পারার বিষয়টা মুসলিম নারী তার নিজস্ব রুচিবোধ অনুসারে করে থাকে ।

আমার মনে হয় আমেরিকান সমাজে নারীবাদ মূলত একটা দেখানোর বিষয়ে পরিণত হয়েছে । এখানে নারীকে এমনভাবে দেখা হয় নারী মানেই শারীরিক মোহ প্রদর্শন করে থাকবে, লম্বা চুল রাখবে, মুখের নিখুঁত সৌন্দর্য থাকবে, অসাধারণ দেহাবয়ব থাকবে । আর যখন এসব প্রদর্শনের স্বাধীনতা আমাদের নারীরা অর্জন করে থাকে তখন আমরা ভাবি যে নারী হিসাবে আমরা স্বাধীন । আমাদের চারপাশে যেসব লোক আছে তাদের চোখে আমাদের কেমন দেখাচ্ছে এসব বিষয় নিয়ে বেশি চিন্তায় মশগুল থাকার মাধ্যমে আমরা মূলত প্রাকৃতিক নারীত্বকে নষ্ট ও দমন করার চেষ্টা করছি । সমাজের সব সমালোচনা উপেক্ষা করে আমাদের এটা বলার সাহস নেই যে “ আমার দেহ প্রদর্শনের জন্য নয় ।”

কিন্তু আমি অনেক মুসলিম নারীকে দেখেছি তারা এই সৎ সাহস অর্জন করার চেষ্টা করেছে । এভাবে তারা প্রতিদিনের অযথা বাহ্যিক চাপ থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করেছে ।প্রকৃত পক্ষে তাদের এটা বলার সৎ সাহস আছে যে “ হেই আমি কোন আনন্দের সামগ্রী নই, আমি একজন নারী । আমি কেমন দেখাচ্ছি তার ভিত্তিতে নয়; আমি আসলে কি এর ভিত্তিতে আমাকে সম্মান ও মূল্যায়ন করা উচিত । ”

নিজেদেরকে স্বাধীন করার এমন সাহস আমেরিকান সংস্কৃতি থেকে তাদেরকে  আলদাভাবে উপস্থাপন করেছে । প্রদর্শনের বাহানায় নারীরা যেসব চাপের মধ্যে থাকে সেই চাপ থেকে নিজেদেরকে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন করার শক্তি মুসলিম নারীদের রয়েছে । তারা কখনও দেহ প্রদর্শনের কাজে মনোযোগ দেয় না বরং কিভাবে নিজের স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা উপস্থাপন করা যায় সেদিকে মনোযোগ দেয় ।তারা সৌন্দর্য চর্চার পূজারী নয় । এর ফলে মুসলিম নারীরা সম্মান ও শ্রদ্ধা অর্জন করে থাকে এবং তাদের কমিউনিটিতে তাদেরকে বেশ গুরুত্ব দেয়া হয় ।

নারীবাদ যা হওয়া উচিৎ ইহা কি আসলে তাই নয়? এইভাবেই কি নারীরা সত্যিকারের মর্যাদা অর্জন করে না ? এইভাবে কি আমাদের নারীদের দেহের প্রতি তাকিয়ে বাজে মন্তব্য না করে কেউ একজন নারীর কথা শুনে না ? আমি বিশ্বাস করি যে এর উত্তর হবে “হ্যাঁ” । মুসলিম আমেরিকান কমিউনিটি এবং এমনকি বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের কিছু অংশে সভ্য নারী হিজাব পরুক বা হিজাব না পরুক সর্বদা শ্রদ্ধা অর্জন করে থাকে । এ ব্যাপারে আমাদের মূলধারার মিডিয়া আমাদের নানা কিছু উল্টা পাল্টা বুঝাক না কেন ।

কয়েক সপ্তাহ আগে আমি ইসলামে নারীবাদ বিষয়ে একটা লেকচার শুনতে গিয়েছিলাম ।এসব চিন্তাধারা আমার মাথার মধ্যে গুরপাক খেতে লাগলো । লেকচারার ছিলেন হিজাব পরা একজন মুসলিম নারী  । তিনি এতো সুন্দরভাবে কথা বলছিলেন যে সকলেই অভিভূত হয়ে তার বক্তব্যে মনোনিবেশ করেছিল ।বক্তব্য শুনার প্রায় দেড় ঘণ্টা খানেক পরে আমার মনে হতে লাগলো যে স্তন্য স্বাধীন করার নারীবাদ নিয়ে যারা ব্যস্ত আছে তারা কতটাই বস্তুবাদী ও পলকা বিষয় নিয়ে কাজ করছে । এই ধরণের বিষয় নিপাত যাওয়া উচিৎ । আমি ভাবতে থাকলাম আমরা কিভাবে বিশ্বাস করতাম যে আমেরিকান নারীরা স্বাধীন এবং মুসলিম নারীরা নিপীড়িত । এই বিষয়টা আমার কাছে উল্টে গেল ।আমি অবশেষে বুঝতে পারলাম পুরুষতান্ত্রিক সমাজে কারা স্বাধীন এবং কারা নির্যাতিত । নির্যাতিত মূলত আমরাই আমেরিকান নারীরা, মুসলিম নারীরা নয় । যে নারীরা হিজাব পরে তারা মূলত পুরুষ এবং সমাজের নারীর দেহ দর্শনের মাধ্যমে বিবেচনা করার দাসত্ব থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করেছে । বস্তুবাদী নারীবাদীরা যা পারেনি; এভাবে তারা পুরুষতান্ত্রিক বিশ্বের গহীনে পতিত হয়ে গেছে এই বিশ্বাস নিয়ে যে তারা শ্রদ্ধা অর্জন করবে ।

তাই আমি বস্তবাদি চিন্তা ধারার তথা স্তনের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী নারীবাদীদের বলতে চাই মুসলিম নারীদের দিকে দৃষ্টিপাত করুন । তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এমন এক নারীবাদের ধারা সৃষ্টি করুন যা সবাইকে শেখাবে যে নারীদেহ উপাসনালয়ের মতো, কোন খেলনা সামগ্রীর মতো নয় ।এখনই আমাদের নারীবাদকে অন্য দৃষ্টিতে দেখা উচিৎ । বিনম্রতা এবং আমাদের অমিয় সুধা পানের সাহস নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় । বিশ্বের মুসলিম নারীবাদীদের আহবান করুন ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

এই রকম আরও খবর