শুক্রবার, ১৯ জানুয়ারী ২০১৮ ইং, ,

ব্রেকিং নিউজ :

Daily Archives: January 19, 2018

 

বইয়ের সাথে সখ্যতা

বৈশালী রহমান


বাংলা সাহিত্যের একটা শাখা নিয়ে আমার একটু ক্ষোভের মতো আছে। সেটা হলো, ভৌতিক গল্প।

গত এক বছর ধরেই ফেসবুকিং কমিয়ে পড়াশোনা করছি প্রচুর। শুধু রিসার্চের পড়াশোনাই নয়, বাংলা সাহিত্য, গল্প, উপন্যাস, নন ফিকশন ইত্যাদিও ঝালাই করে নিচ্ছি খানিকটা।

সাহিত্যের অন্য শাখাগুলো যেমন রোমান্টিক, রহস্য, রম্য, ট্র্যাজেডি ইত্যাদিকে বাংলা সাহিত্য এবং সাহিত্যিকেরা আপন করে নিলেও এই হরর বা ভৌতিক শাখাটা কেন যেন অবহেলিতই রয়ে গিয়েছে। অধিকাংশ সাহিত্যিকরাই ভূতের গল্প লিখতে গিয়ে সেটাকে করে ফেলেছেন একেবারে ছেলেমানুষি বিষয়, হাস্যকর বস্তু, যেমনটা দেখা যায় প্রখ্যাত সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের “অদ্ভুতুড়ে সিরিজ” এ, নয়তো বিদেশী পিশাচ বা জম্বি কাহিনির অক্ষম অনুকরণ, যেটা করেছেন রহস্য পত্রিকা বা সেবা প্রকাশনী কেন্দ্রিক লেখকেরা।

বাংলার প্রকৃতি, পরিবেশকে আপন করে নিয়ে তার ভিত্তিতে গা ছমছমে ভূতের গল্প লিখতে দেখেছি খুব কম লেখককেই। তবে ভূতের গল্পে চমৎকার মানবিক প্রলেপ নিয়ে এসেছেন তারাশঙ্কর, মনোজ বসু বা পরশুরাম।

পরশুরামের বিখ্যাত গল্প “ভূষণ্ডীর মাঠে” তে ধর্মীয় কিছু সংস্কার নিয়ে ভূতের সংলাপের মাধ্যমে চমৎকার স্যাটায়ার রয়েছে। আবার “মহেশের মহাযাত্রা” পরশুরাম সুলভ স্যাটায়ার দিয়ে শুরু হলেও শেষ দিকে বেশ গা ছমছম করেই ওঠে। হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায় নামে এক স্বল্প পরিচিত লেখকও চমৎকার কিছু ভূতের গল্প লিখেছেন। শরদিন্দু তাঁর বিখ্যাত চরিত্র বরদাচরণের জবানিতে লিখে গেছেন কয়েকটি অসাধারণ ভৌতিক গল্প।

বাংলায় প্রথম সম্পূর্ণ ভৌতিক উপন্যাস লেখেন ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়, যদিও তাঁর লেখার মধ্যেও “শিশুদের জন্য প্রযোজ্য” ছাপই প্রবল। বড়োরা ওইসব লেখা পড়ে ভয় পাবে, এই সম্ভাবনা কম। মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারও চমৎকার দুটি পিশাচ উপন্যাস এবং কিছু ভৌতিক ছোটো গল্প লিখেছেন। কিন্তু সেইসব লেখার অধিকাংশের মধ্যেও কিছুটা মৌলিকতার অভাব আছে বলে মনে হয়েছিল আমার কাছে। বিদেশী গল্পের ছাপটা বেশ প্রকট। তবে কিছু কিছু গল্প সত্যিই চমৎকার।

আমার মতে, সার্থক ভৌতিক গল্প সেটাই, যেটা দেশ-কাল-পরিস্থিতি-পরিবেশকে তুলে ধরে এমন একটা ভয়ংকর আবহ এর সৃষ্টি করবে, যাতে করে গল্প পড়ার পর পাঠকের একা একা অন্য রুমে যেতেই ভয় লাগবে। যেখানে বাংলায় সার্থক ভূতের গল্পেরই অভাব, সেখানে ভূতের গল্পের একটা অনবদ্য অনুষঙ্গ, তন্ত্র, তান্ত্রিক সন্ন্যাসী প্রভৃতি সহযোগে বেশ “উপাদেয়” ভৌতিক গল্পের অভাব থাকাটা স্বাভাবিক। এই অভাব খানিকটা পূরণ করেছিল প্রখ্যাত সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর হাতে সৃষ্ট এবং পরবর্তীতে তাঁর সুযোগ্য পুত্র তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এর হাতে জীবন্ত রূপ পাওয়া চরিত্র তারানাথ তান্ত্রিকের গল্পগুলো। তারপর হাতে এলো অলাতচক্র। তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এর আরেকটি মাস্টারপিস। এরপর তন্ত্র এবং তান্ত্রিক চরিত্র সম্বলিত ভূতের গল্প পড়ার জন্য মনটা আনচান করছিল। কিছু থার্ড ক্লাস গল্প হাতে এসে মনটাই খারাপ হয়ে গেল।

মনে হচ্ছিল, আমি লিখলেও বোধহয় এর চেয়ে ভালো লিখতে পারতাম। ঠিক এ সময়েই খানিকটা রহস্যজনক ভাবেই ঠিক গতকাল রাত দুটোর সময় হাতে চলে এলো গজেন্দ্রকুমার মিত্র মহাশয়ের “অলৌকিক কাহিনি সমগ্র”।

মিত্রমশাইয়ের নাম যারা মনে করতে পারছেন না, তাঁরাও অনেকেই বোধহয় তাঁর রচিত বিখ্যাত উপন্যাস “পৌষ ফাগুনের পালা”র নাম শুনে থাকবেন। এটি মূলত একটি ট্রিলজি, যার প্রথম দুটি হলো “কলকাতার কাছেই” এবং “উপকণ্ঠে”। এই ভদ্রলোক যে এত অসাধারণ ভূতের গল্প লিখতে পারেন এটা জানা ছিল না। কী অসাধারণ পরিবেশ তৈরি করেন তিনি! অভিজ্ঞতা নিশ্চয় জানেন ভূতের গল্পে ভয় পাওয়ার জন্যে পরিবেশ একটা বিরাট ভূমিকা রাখে। আর মিত্রমশাইয়ের গল্পের আরেকটি অসাধারণ বিষয় হলো প্লট। হাজারবার শোনা বা পড়া ভূতের গল্পের চিরাচরিত প্লটের মতো নয়।

বইটির সব গল্প ভালো লাগেনি। অন্তত দশটি গল্প নিম্নমানের মনে হয়েছে। তবে ছয়শ পৃষ্ঠার একটি সংকলনে এটুকু ছাড় বোধহয় দেওয়াই যেতে পারে।

তারানাথ তান্ত্রিক এবং অলাতচক্র পড়ার পরে যাদের কাছে অন্য সব ভূতের গল্পই পানসে বলে মনে হচ্ছে, তারা এই বইটি পড়ে ফেলতে পারেন। সময়টা বৃথা যাবে না। বিশেষ করে শীতের রাতে কম্বলের তলায় ঢুকে বইটা পড়লে ভয় পাওয়ার গ্যারান্টি ১০০%।

লেখিকা: ডেপুটি ডাইরেক্টর, বাংলাদেশ ব্যাংক।

 

মাতৃত্বকালীন ছুটি ও প্রাসঙ্গিক কথা

ডা. সাকলায়েন রাসেল


মাত্র মাসের ব্যবধানে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেল..দু’জন মা! না.. গ্রামের কোন এক অজপাড়া গাঁয়ের জরিনা খাতুন না..। আমিও কাউকে ছোট করে বলছি তা ঠিক না।

মারা গেল একেবারে শিক্ষা ও আর জ্ঞানের আলোয় পরিপূর্ণ দুই মা..দু’জনেই পেশায় চিকিৎসক! সবে মাত্র জীবন শুরু করেছিল..দেশকে, পরিবারকে কিছু দেয়ার আগে হারিয়ে গেল একেবারেই অকালে.. একজনতো গেল পেটে ৯ মাসের বাচ্চা সহ!

খবর দু’টো চোখ ভিজিয়ে দেয়..জীবনের সব ছন্দ যেন মুহুর্তেই থামিয়ে দিতে চায়..প্রশ্নরা আঁছড়ে পড়ে মনের কোণে?

চলে যাওয়াটা যদি এতোই স্বাভাবিক.. বেঁচে থাকার তবে কেন এত্তো আয়োজন!!!

কেন এত্তো স্বপ্নকে আলিঙ্গন করা?
প্রেগন্যান্সিটাকে আমার কাছে.. ১০ নং বিপদ সংকেতের মত মনে হয়… চুল থেকে মাথা পর্যন্ত যেন মায়ের শরীরে ঝড় বইতে থাকে.. এ ঝড়কে আড়াল করার প্রবণতা প্রথম চোখে পড়ে গ্রামে..শহরেও কিছুটা!

বউকে ডাক্তার দেখাননি কেন?..এমন প্রশ্নের উত্তরে কিছু পুরুষের উত্তর থাকে..ওর তো কোন সমস্যা ছিল না তাই দেখাইনি! ভাবখানা এমন যে প্রেগন্যান্ট তো কি হইছে, অসুস্থ তো আর না! অথচ প্রেগনেন্সি নিজেই একটা বড় রোগের নাম!

অন্তত আমার কাছে! যতই তাকে ফিজিওলজিক্যাল কন্ডিশন বলা হোক না কেন…গ্রামের অজ্ঞ স্বামীর চেয়েও এগিয়ে যাচ্ছে শহরের আধুনিক মেয়েরা! গ্রামের মেয়েদের মত শহরের মেয়েরা  আড়াল করে না!..স্মার্টলি শো করে! গ্রামের ‘সাধ’ অনুষ্ঠান তাই শহরের আধুনিকতায় ‘বেবি শোয়ার’ হয়ে যায়!

শুধু তাই না…তারা জানে বর্ধিত দেহ অবয়বকে কিভাবে আড়াল করতে হয়!..জানে কিভাবে দেহের আগলি ভাবকে মেক আপের আড়ালে লুকিয়ে রাখতে হয়!

প্রেগন্যান্সিতে তাই তারা সৌন্দর্যের আলাদা শিল্পে পরিণত করে! থামতে হয় না তাই শহরের মেয়েদের.. কিংবা থামার সুযোগ পায় না শহরের কর্মজীবী মহিলারা..প্রেগন্যান্সিতে সমভাবে সচল থাকে তারা!

ছুটি মাত্র ৬ মাসের!!

আপনার ইচ্ছায় আপনি তা যেকোন সময় নিতে পারেন! অনেকেই… ঠিক অনেকে না, প্রায় সবাই তাই হিসাব করে..কষ্ট করে প্রেগন্যান্সির সময়টি চালিয়ে নেই ছুটি ছাড়া..বাচ্চা হলে ছুটিটা বেশি কাজে লাগবে…

আর সে কারণে প্রায় সবাই বাচ্চা হওয়ার পর ছুটি নেয়! অনেকে কানাঘুষা করে.. ডাক্তার মেয়েদের বাচ্চাকাচ্চাদের ইদানিং অনেক বেশি সমস্যা হচ্ছে.. বৃহৎ অর্থে কর্মজীবী মায়েদের সন্তানদের মধ্যে সমস্যাযুক্ত সন্তান জন্মদানের হার বেশি!! না এ ব্যাপারে কোন গবেষণা আমার জানা নেই… এসব শুধু বাতাসে শুনি! হতে পারে এর পিছনে,

২ কারণ:

  •  প্রেগন্যান্সিকালীন বিশ্রামহীনতা কিংবা অতিরিক্ত কর্মক্ষম থাকা।
  •  চিকিৎসক কিংবা কর্মজীবী মায়েরা বেশি সচেতন বলে…আগেভাগেই তারা রোগ নির্ণয় করছেন!

অথবা.. আপনি চাইলে আমাকে গালমন্দ করতে পারেন… লোকটা নারী বিদ্বেষী… ইনিয়ে বিনিয়ে চাকরি জীবি মায়ের বিপক্ষে…আর হাউজ ওয়াইফ মায়ের পক্ষে বলছে!

সরি, আমি ঠিক সেভাবে ভাবছিনা! ভাবছি…
কোথাও তো একটা কিছু আছে আছে..না থাকলে চিকিৎসক কিংবা কর্মব্যস্ত “”মায়েদের সন্তানের এতো বেশি শারীরিক ও মানসিক সমস্যা কেন হচ্ছে?””

সমাধান তবে কি?

ছুটিটাই যেহেতু প্রধান সমস্যা..আমি তাই আমি এটা নিয়েই কথা বলতে চাই!

সিউর না…তবে শুনেছিলাম…ইন্ডিয়ায় একজন কর্মজীবী মা মাতৃত্বকালীন ছুটি সব মিলিয়ে ৫ বছর পান..এ ছুটি তিনি এক সাথে নিতে পারবেন না… ভেংগে ভেঙে মোট ৫ বছর নিতে পারবেন!

এতে দুই সুবিধা:

  • বাচ্চা জন্ম দেয়ার সময় লম্বা ছুটি নিয়ে বিশ্রামে থাকতে পারে।
  • ছেলে মেয়েদের পরীক্ষার সময় পাশে থাকতে পারে!

এই দুই সুবিধার পিছনে বড় সুবিধা হল…পরিবারের লোকজন চাকুরীজীবী মা কে স্বাগত জানায়…ধরেই নেয় যে, চাকরী করলেও বাচ্চাকাচ্চা লালনে মা ভাল সময় দিতে পারবেন!

কারণ, এই বাংলাদেশেরই অনেক মা সন্তানের কারণেই এক সময় চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাচ্চা পালনকেই অধিক শ্রেয় মনে করেন!

জানি এটা অনেক বড় স্বপ্ন.. পুরণ হতে আরো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে! কিন্তু স্বপ্ন দেখতে দোষ কি!!

৫ বছর না হোক…৯ মাস তো পাব!! এর মধ্যে ৩ মাস প্রেগনেন্সি পিরিয়ডে… বাধ্যতামূলকভাবে! বাকী ৬ মাস…সন্তান লালন পালনে! তাও যদি পাওয়া না যায়…

তবে ৬ মাসের কয়েক মাসেক বরাদ্দ থাকুক প্রেগনেন্সি পিরিয়ডে! সন্তানরা আসুক সুস্থতা নিয়ে… মায়েরা বাঁচুক সন্তানদের আঁচলে রেখে…ভরসার সবটুকু জায়গা জুড়ে!

সহকারী অধ্যাপক, ভাসকুলার সার্জারী
ইব্রাহিম কার্ডিয়াক, বারডেম।