banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 279 বার পঠিত

 

রাসায়নিক নিরাপত্তায় বাংলাদেশের গর্ব অধ্যাপক ড. সৈয়দা রাজিয়া সুলতানা

অধ্যাপক ড. সৈয়দা রাজিয়া সুলতানা বাংলাদেশের এক উজ্জ্বল বিজ্ঞানী, গবেষক ও শিক্ষিকা, যিনি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং রাসায়নিক নিরাপত্তা ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে প্রফেসর হিসেবে কর্মরত আছেন।
ড. রাজিয়ার শিক্ষাজীবন শুরু হয় বুয়েটে, যেখানে তিনি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ও এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। উচ্চতর গবেষণার জন্য তিনি কানাডার ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টায় পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর আগ্রহ ছিল শিল্প প্রক্রিয়ার নিরাপত্তা, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি নিয়ে, যা পরবর্তীতে তাঁর গবেষণা ও শিক্ষাজীবনের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

পিএইচডি শেষ করার পর তিনি বুয়েটে শিক্ষকতা শুরু করেন। ধীরে ধীরে তিনি দেশের একজন পরিচিত কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর গবেষণার ক্ষেত্রের মধ্যে কেমিক্যাল সেফটি ও সিকিউরিটি, প্রক্রিয়া নিরাপত্তা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ডিস্টিলেশন ও সেপারেশন প্রক্রিয়া, এবং শিল্প বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত।
গবেষণা কাজগুলো শুধু একাডেমিক জগতে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং দেশের শিল্পখাতেও নিরাপত্তা সংস্কৃতি গঠনে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে।
তিনি নিয়মিত আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণা প্রকাশ করেন এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।

ড. রাজিয়ার আন্তর্জাতিক অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি OPCW (Organization for the Prohibition of Chemical Weapons)-এর Scientific Advisory Board-এর সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। এই পদে থাকাকালীন তিনি বিশ্বব্যাপী রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ এবং কেমিক্যাল সিকিউরিটির নীতি ও শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বাংলাদেশের একজন বিজ্ঞানী হিসেবে এই বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব দেশের জন্য গর্বের।

২০২৩ সালে ড. সৈয়দা রাজিয়া “The Hague Award” লাভ করেন, যা OPCW প্রদত্ত একটি সম্মানজনক পুরস্কার, রাসায়নিক নিরাপত্তা এবং শান্তিপূর্ণ গবেষণায় অসামান্য অবদানের জন্য প্রদান করা হয়। এই অর্জনের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী বিজ্ঞানী হিসেবে আন্তর্জাতিক এই মর্যাদাপূর্ণ সম্মান লাভ করেছেন। এটি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং বাংলাদেশের বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষাগত জগতে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

শিক্ষক এবং গবেষক হিসেবে ড. রাজিয়া শুধু শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই জ্ঞান নয়, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও নিরাপত্তাবোধ শেখান।
তিনি নিয়মিত কিছু কর্মশালা এবং প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন, যেখানে শিক্ষার্থী, প্রকৌশলী এবং শিল্পকর্মীরা রাসায়নিক ঝুঁকি এবং নিরাপদ প্রক্রিয়া পরিচালনার আধুনিক ধারণা শিখতে পারেন। তাঁর এই উদ্যোগগুলো দেশের শিল্পখাত ও একাডেমিয়ায় নিরাপত্তা সংস্কৃতি গঠনে অমূল্য ভূমিকা রেখেছে।

ড. রাজিয়ার গবেষণা এবং প্রকাশনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের কেমিক্যাল সেফটি, প্রক্রিয়া নিরাপত্তা, এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক মানদণ্ডে দেশকে পরিচিতি দিয়েছে। তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নাল ও সিম্পোজিয়ামে নিয়মিত অংশগ্রহণ করে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ভাগাভাগি করেন এবং বহু বৈজ্ঞানিক বোর্ডে সম্পাদনা দায়িত্ব পালন করেছেন।

ব্যক্তিগতভাবে, তিনি একজন প্রেরণাদায়ী শিক্ষক। তাঁর শিক্ষার্থীরা বলছেন, “ম্যাডাম শুধু ক্লাসে পড়ান না, জীবনেও শেখান কীভাবে দায়িত্বশীল ও নৈতিক গবেষক হওয়া যায়।” তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে বিজ্ঞান তখনই সত্যিকার অর্থে কল্যাণকর, যখন তা মানুষের জীবনকে নিরাপদ ও সুন্দর করে।

অধ্যাপক ড. সৈয়দা রাজিয়া সুলতানা বাংলাদেশের বিজ্ঞানচর্চার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর গবেষণা, নেতৃত্ব এবং নৈতিক দৃঢ়তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণা এবং তরুণ গবেষকদের জন্য এক দৃষ্টান্ত। তার মতে বিজ্ঞান কেবল জ্ঞান নয়, বরং একধরনের মানবিক দায়িত্ব। এই দায়িত্বকে তিনি নীরবে, নিষ্ঠাভরে দেশের ও বিশ্বের কল্যাণে পালন করছেন।

Facebook Comments Box