banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 240 বার পঠিত

 

বুয়েটের স্বঘোষিত ধর্ষক: কোথায় বাস করছি আমরা?

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)—দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষার্থীর স্বীকারোক্তি এখন পুরো জাতিকে নাড়া দিয়েছে।
বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের ২০২১ ব্যাচের শিক্ষার্থী ‘শ্রীশান্ত রায়’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রেডিটে লিখেছে, কীভাবে সে তার এক সহপাঠী মুসলিম মেয়েকে মাদক খাইয়ে ধর্ষণ করেছে। আরও অবাক করা বিষয় হলো—সে নিজ অপরাধ নিয়েই নির্লজ্জভাবে গর্ব করেছে।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই বুয়েট ক্যাম্পাসে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মঙ্গলবার রাতভর শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে, অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ক্যাম্পাস প্রকম্পিত করে তোলে। বিক্ষোভকারীদের কণ্ঠে ছিল ক্ষোভ, লজ্জা ও গভীর হতাশা। তারা যেন নিজেদেরই প্রশ্ন করছিল—“আমরা কি সত্যিই মানুষ হয়ে উঠতে পারছি?”

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ঘটনাটির পর জরুরি বৈঠক ডেকে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করে এবং বিস্তারিত তদন্তের আশ্বাস দেয়। তবে শিক্ষার্থীদের দাবি এই ধরনের অপরাধের কোনো স্থান কোনো ক্যাম্পাসে বা সমাজে হতে পারে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনা কেবল একজন অপরাধীর নয়; বরং এটি একটি প্রজন্মের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। আমরা শিক্ষা দিচ্ছি, ডিগ্রি দিচ্ছি—কিন্তু মানুষ গড়ার শিক্ষা দিতে পারছি না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম বলেন, “প্রযুক্তি আমাদের এগিয়ে নিচ্ছে, কিন্তু মূল্যবোধের শিক্ষা হারিয়ে যাচ্ছে। পরিবার ও সমাজ মিলে তরুণদের নৈতিক শূন্যতায় ঠেলে দিচ্ছে।”

তরুণদের একটি বড় অংশ এখন ফেসবুক, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ও রেডিটের মতো ভার্চুয়াল জগতে নিমগ্ন। সেখানে অশ্লীলতা, সহিংসতা ও বিকৃত আনন্দকে ‘স্বাভাবিক’ মনে করা হয়। ফলস্বরূপ, বাস্তব জীবনের নৈতিক মূল্যবোধ ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।

পরিণতিতে বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তাহীনতা এখন ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশে হাজারেরও বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এদের বড় অংশই কিশোরী বা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছাত্রী।
শিশু নির্যাতনের ঘটনাও বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীরা প্রভাবশালী হওয়ায় বিচার পেতে বছরের পর বছর কেটে যায়। অনেক সময় দেখা যায়, ধর্ষণের শিকার মেয়েটিই সমাজের কটূ মন্তব্য ও দোষারোপের শিকার হয়। এই অন্যায় সংস্কৃতিই অপরাধীদের সাহস জোগায়, তারা ভাবে—“কেউই কিছু করতে পারবে না।”

চলতি অক্টোবর মাসের প্রথম ২১ দিনেই দেশে অন্তত চারটি ধর্ষণের ঘটনা সামনে এসেছে। বুয়েটের ঘটনাটি যেন তারই ধারাবাহিকতা। সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও দেখা যাচ্ছে, প্রশাসন নীরব, মিডিয়াও অনেক সময় নিরব।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্নভাবে অপরাধীকে রক্ষা করার চেষ্টা চলছে। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও শাস্তি কার্যকর না হওয়াই আজ ধর্ষকদের সাহস বাড়িয়ে তুলছে। প্রশ্ন উঠছে—কেন বিচার হয় না? কারা বাধা হয়ে দাঁড়ায়?

বিশ্লেষকরা মনে করেন, শিক্ষা এখন কেবল পেশা ও ডিগ্রির সীমায় আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। পরিবারে নৈতিক শিক্ষা নেই, স্কুলে নেই চরিত্রগঠনের পাঠ, সমাজে নেই দায়িত্ববোধ। ফলে তরুণ প্রজন্ম এক ধরনের অন্ধকারে হাঁটছে, যেখানে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধকে ‘পুরনো’ মনে করা হয়।
আইন বিশ্লেষক ব্যারিস্টার আনিসুর রহমান বলেন, “ধর্ষণ এখন শুধু অপরাধ নয়, এটি এক সামাজিক রোগ। এর চিকিৎসা শুধুমাত্র আইনের মাধ্যমে নয়, মূল্যবোধ ও আত্মিক শিক্ষার মাধ্যমেই সম্ভব।”

বুয়েটের শিক্ষার্থীরা এখন রাস্তায়। তাদের প্রতিবাদ কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, এটি পুরো বাংলাদেশের বিবেকের লড়াই।
সমাজ যদি এখনই না জেগে ওঠে, তবে একদিন এই অন্ধকার আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গ্রাস করবে। এই দেশের মেয়েরা, শিশুরা, মায়েরা—তাদের নিরাপত্তা দান করা আমাদেরই দায়িত্ব। আর যদি আমরা এখনো নীরব থাকি, তবে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।

Facebook Comments Box