banner

বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 248 বার পঠিত

 

নারীর অদৃশ্য পরিশ্রমের দৃশ্যমান বাস্তবতা

বিশ্বজুড়ে নারী ও পুরুষের কাজের সময় নিয়ে আলোচনাটা আজ আর নতুন নয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত বছর পেরিয়ে গেলেও নারীর কাজের ঘন্টা—বিশেষ করে অবৈতনিক কাজের সময়—এখনো অর্থনীতির মূলধারায় যথাযথভাবে গণনা করা হয় না। এই পার্থক্য আইন বা নীতির কারণে তৈরি হয়নি, বরং এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা সামাজিক ধারণা, পারিবারিক ভূমিকা এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর ফল।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পরিসংখ্যান দেখায়, বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে নারীরা পুরুষের তুলনায় গড়ে কম সময় বেতনভুক্ত কাজে ব্যয় করেন। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁরা ঘরোয়া ও যত্নমূলক কাজে পুরুষের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি সময় দেন। অর্থাৎ, কাজের ঘন্টার হিসাবে নারীরা কখনোই কম পরিশ্রম করছেন না; বরং তাঁদের পরিশ্রমের বড় অংশটাই থেকে যাচ্ছে “অদৃশ্য”।

অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (OECD) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উন্নত দেশগুলোতেও কর্মঘণ্টায় লিঙ্গভেদ স্পষ্ট। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে প্রায় ২৮ শতাংশ নারী খণ্ডকালীন কাজে যুক্ত, যেখানে পুরুষের হার মাত্র ৮ শতাংশ। অর্থাৎ, নারীরা প্রায় চারগুণ বেশি হারে কম সময়ের চাকরি বেছে নিচ্ছেন।
তবে এই পার্থক্য কোনো আইনি বাধ্যবাধকতার ফল নয়। বরং সমাজের প্রচলিত রীতিনীতিই নারীদের এমন পেশা বেছে নিতে বাধ্য করে যেখানে সময়ের নমনীয়তা থাকে, যাতে তারা গৃহস্থালি, সন্তান লালন-পালন কিংবা বয়স্কদের যত্নের কাজ সামলাতে পারেন। ফলে নারীর কাজের ঘন্টা সংখ্যা হিসেবে কম মনে হলেও, বাস্তবে তা একেবারেই সঠিক চিত্র নয়।

উদাহরণস্বরূপ, ফ্রান্স, ডেনমার্ক ও নরওয়ের মতো দেশে পুরুষ ও নারী উভয়ের সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা প্রায় ৩৫ থেকে ৩৯ ঘণ্টা। কিন্তু নেদারল্যান্ডস ও সুইজারল্যান্ডে অনেক নারী সপ্তাহে ৩০ ঘণ্টার কম কাজ করেন। যুক্তরাষ্ট্রে নারীরা গড়ে প্রতিদিন ৭.৯ ঘণ্টা কাজ করেন, যেখানে পুরুষদের জন্য এই সময় ৮.৪ ঘণ্টা। পার্থক্যটা অল্প মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতা— পরিবার, সন্তানের দায়িত্ব ও গৃহস্থালি কাজের চাপ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো, নারীরা বৈতনিক কাজের বাইরে যে বিপুল সময় দেন ঘরোয়া কাজে, তা কোনো অর্থমূল্যে ধরা হয় না। ২০২৪ সালে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের (ILO) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭৪৮ মিলিয়ন মানুষ পরিচর্যা ও যত্নের কাজের কারণে শ্রমবাজারের বাইরে রয়েছেন— তাদের মধ্যে ৭০৮ মিলিয়নই নারী।
প্রতিবেদনটি আরও জানায়, নারীরা প্রতিদিন পুরুষদের তুলনায় গড়ে আড়াই গুণ বেশি সময় ব্যয় করেন রান্না, ঘর পরিষ্কার, শিশু ও বয়স্কদের যত্নের মতো কাজগুলোতে। অথচ এই কাজগুলোই পরিবার ও সমাজকে সচল রাখে। যদি এই সময়কে বৈতনিক কাজের সঙ্গে যোগ করা হয়, তবে দেখা যায়— নারীর মোট কর্মঘণ্টা পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু সমস্যা হলো, এই পরিশ্রমের কোনো বেতন নেই, কোনো ছুটি নেই, এমনকি অনেক সময় কোনো স্বীকৃতিও নেই।

বহু সমাজে এখনো গৃহস্থালি কাজকে নারীর “প্রাকৃতিক দায়িত্ব” হিসেবে দেখা হয়। এমন ধারণার কারণে অনেক নারী চাকরির ক্ষেত্রে নমনীয় সময়সূচি বেছে নিতে বাধ্য হন, অথবা পুরোপুরি কর্মক্ষেত্র থেকে সরে দাঁড়ান। ফলে অর্থনৈতিকভাবে তাঁরা পিছিয়ে পড়েন, কিন্তু গৃহস্থালি দায়িত্বের ভার হালকা হয় না।
যেসব দেশে পরিবার ও রাষ্ট্র মিলে শিশুসেবা বা বয়স্কদের যত্ন ভাগাভাগি করে নেয়, যেমন— স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো, সেখানে নারী-পুরুষ উভয়েরই কর্মঘণ্টা তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়া বা আফ্রিকার অনেক দেশে সামাজিক কাঠামো ও নীতিগত সহায়তার অভাবে নারীরা এখনো দ্বিগুণ পরিশ্রম করেন— একদিকে ঘর, অন্যদিকে কর্মক্ষেত্র।

নারীরা প্রতিদিন যে সময় ব্যয় করেন রান্না, কাপড় ধোয়া, সন্তান বা বৃদ্ধদের যত্নে— সেগুলো সমাজের চোখে “কাজ” নয়, কারণ তার কোনো বাজারমূল্য নেই। অথচ এই কাজগুলো ছাড়া কোনো সমাজই টিকতে পারে না। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যদি গৃহস্থালি কাজের আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়, তবে তা অনেক দেশের জিডিপির বড় অংশ হয়ে দাঁড়াবে।

নারী আজ অফিসে কাজ করছেন, সংসারও সামলাচ্ছেন— কিন্তু তাঁর এই অবদান দুই ভাগে বিভক্ত। এক ভাগের দাম আছে, আরেক ভাগের নেই। অথচ দুটি অংশই সমাজের চালিকাশক্তি। তাই এখন সময় এসেছে এই অদৃশ্য শ্রমকে দৃশ্যমান স্বীকৃতি দেওয়ার।
নারীর বৈতনিক ও অবৈতনিক—দুই ধরনের কাজই সমান মর্যাদা ও গুরুত্বের দাবিদার।
সুতরাং, বৈষম্যের মূল উৎস দূর করতে হলে শুধু চাকরির সুযোগ নয়, ঘরের ভেতরের দায়িত্ব ভাগাভাগিও জরুরি। নারী ও পুরুষ উভয়েই যদি সমঝোতা ও ইনসাফের ভিত্তিতে ঘর ও বাইরের দায়িত্ব বহন করেন, তবেই সমাজে প্রকৃত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে।

Facebook Comments Box