ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে গত ১৮ অক্টোবর শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় অনুষ্ঠিত হলো এক ব্যতিক্রমধর্মী গোলটেবিল বৈঠক—প্রতিপাদ্য ছিল “নতুন বাংলাদেশের নেতৃত্বে শাসক নয়, সেবক চাই।” নারী নেতৃত্বভিত্তিক সংগঠন ‘সম্মিলিত নারী প্রয়াস’ আয়োজিত এই আলোচনায় অংশ নেন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা।
বক্তারা বলেন, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও দলীয় আনুগত্য নয়, বরং জনগণের কল্যাণে নিবেদিত সেবামুখী নেতৃত্বই পারে নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি মজবুত করতে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শেহরিন আমিন মোনামি বলেন, রাজনৈতিক স্বার্থে সমাজকে শ্রেণী ও মানসিকতায় বিভক্ত করা হয়েছে—গ্রাম-শহর, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, এমনকি রাজনৈতিক অবস্থানভেদেও। এই বিভাজনই শোষণের সুযোগ তৈরি করেছে। তার মতে, নারীর প্রতিনিধিত্ব কেবল মুখের বুলি নয়, বাস্তব কাজের মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়া উচিত। ভবিষ্যতের নেতৃত্বকে পরিচয়ের রাজনীতি নয়, কাজের নৈতিকতা ও দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে।
বুয়েটের এমএমই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তাকিয়া আনা ফখরুল বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ধর্মভিত্তিক বিদ্বেষ বা ইসলামফোবিয়া গভীর আকার ধারণ করেছিল। নতুন সরকারের পক্ষে তা একদিনে দূর করা সম্ভব নয়, তবে উদ্যোগ নিতে হবে সচেতনতার সঙ্গে। তিনি বলেন, নেতৃত্বে থাকতে হবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ভবিষ্যৎ ভাবনায় দক্ষতা—যে নেতা কেবল ক্ষমতায় নয়, পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করবেন।
ঢাবির জিনপ্রকৌশল ও জিনপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, প্রকৃত শাসক সে-ই, যিনি ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার নয়, বরং ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, দুর্নীতিমুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বই পারে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন বলেন, অতীতে যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন ছিল তুলনামূলক সহজ, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্নীতি, ভোট কেনাবেচা ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এই প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তিনি বলেন, জনগণের সচেতনতা ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থাই নেতৃত্ব নির্বাচনে গুণগত পরিবর্তন আনতে পারে।
তার মতে, ভবিষ্যতের শাসককে হতে হবে দ্বৈতধর্মী—একদিকে জনগণের সেবক, অন্যদিকে অপরাধ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর। এজন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, জবাবদিহিতা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি।
বৈঠকের সারসংক্ষেপে বক্তারা একমত হন যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এখন ‘শাসক মানসিকতা’ নয়, ‘সেবক মানসিকতা’ প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি। নৈতিকতা, দায়বদ্ধতা ও জনগণের প্রতি দায়বোধ—এই তিন মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠতে হবে নতুন নেতৃত্ব।














