banner

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ ইং, ,

পোস্টটি 260 বার পঠিত

 

ওরিয়ানা ফালাচি: এক সাহসী কণ্ঠের উত্তরাধিকারী

বিশ্ব সাংবাদিকতার ইতিহাসে ওরিয়ানা ফালাচি একটি ব্যতিক্রমী নাম। তিনি ছিলেন একাধারে লেখক, দার্শনিক ও নির্ভীক সাংবাদিক। যুদ্ধক্ষেত্র হোক কিংবা রাষ্ট্রপ্রধানের কার্যালয়—যেখানেই দাঁড়িয়েছেন, সত্যের পক্ষে আপসহীন অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর কলম শুধু খবর পরিবেশনের যন্ত্র ছিল না; বরং একে তিনি ব্যবহার করেছেন অন্যায়, সহিংসতা ও মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হাতিয়ার হিসেবে।

১৯২৯ সালের ২৯ জুন ইতালির ফ্লোরেন্সে জন্মগ্রহণ করেন ওরিয়ানা ফালাচি। কৈশোরেই তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন প্রতিরোধ আন্দোলনের কর্মী, আর কিশোরী ওরিয়ানাও যুক্ত হন নাৎসিবিরোধী আন্দোলনে।
যুদ্ধকালীন এই অভিজ্ঞতা তাঁর মানসিক গঠনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে এবং পরবর্তীতে সাংবাদিকতা বেছে নেওয়ার অন্যতম প্রেরণা হয়ে ওঠে।

প্রথম জীবনে তিনি সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করলেও ধীরে ধীরে সাংবাদিকতাকেই জীবনের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন—“একজন সাংবাদিক কেবল তথ্য জানায় না; বরং সত্যকে উদঘাটন করে নির্ভয়ে প্রকাশ করে।”

ফালাচি যুদ্ধক্ষেত্রকে নিজের কাজের পরিসর হিসেবে গ্রহণ করেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, মেক্সিকোর ছাত্রবিদ্রোহ থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মুহূর্তে তিনি ছিলেন সরাসরি উপস্থিত।
নারী সাংবাদিকদের জন্য যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ প্রায় অসম্ভব ছিল, সেখানে তিনি সাহসের সঙ্গে প্রবেশ করেছিলেন।

ভিয়েতনাম যুদ্ধকালীন তাঁর রিপোর্টগুলো পশ্চিমা পাঠকদের কাঁপিয়ে তোলে। যুদ্ধের নির্মমতা, সৈন্যদের মানসিক অবস্থা এবং সাধারণ মানুষের দুর্দশা তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যা পাঠকদের চোখে যুদ্ধকে জীবন্ত করে তুলেছিল। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তিনি লেখেন বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Nothing and So Be It’।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় তিনি কলকাতায় অবস্থান করেন।
শরণার্থীশিবির, হাসপাতাল ও সীমান্তবর্তী এলাকা পরিদর্শন করে পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যা ও নির্যাতনের তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেন। তাঁর একাধিক প্রতিবেদন পশ্চিমা বিশ্বে আলোড়ন তোলে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখে। তিনি নির্দ্বিধায় এই যুদ্ধকে “Massacre” হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি সাক্ষাৎকার গ্রহণে তাঁর নির্ভীকতা ছিল অনন্য। ইন্দিরা গান্ধী, ইয়াসির আরাফাত, হেনরি কিসিঞ্জার, আয়াতুল্লাহ খোমেনি কিংবা গোল্ডা মেয়ার—প্রত্যেকের সঙ্গেই তিনি এমন প্রশ্ন করেছেন, যা অনেক সময় তাঁদের অস্বস্তিতে ফেলেছিল।

ফালাচির সাহিত্যকর্মও তাঁর সাংবাদিকতার মতোই গভীর ও প্রভাববিস্তারী। Letter to a Child Never Born মাতৃত্ব ও নারীত্ব নিয়ে লেখা এক আত্মজিজ্ঞাসামূলক উপন্যাস। Inshallah লেবাননের গৃহযুদ্ধ ও ধর্মীয় মৌলবাদের প্রেক্ষাপটে রচিত। আর ৯/১১-পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত The Rage and The Pride পশ্চিমা সভ্যতা ও ইসলামের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

২০০৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ওরিয়ানা ফালাচি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি কলম থামাননি। মৃত্যুশয্যায় থেকেও ঘোষণা করেছিলেন—“আমি মৃত্যুর বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করব, যেমন আমি অন্যায় ও মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়েছি।”

ওরিয়ানা ফালাচির জীবন কেবল একজন সাংবাদিকের নয়; এটি সাহস, নির্ভীকতা ও সত্য অনুসন্ধানের এক উজ্জ্বল দলিল। সাংবাদিকতার পেশায় নারীদের অংশগ্রহণের পথ সুগম করার পাশাপাশি তিনি দেখিয়েছেন—প্রশ্ন করা, সত্য বলা এবং ভয়কে অতিক্রম করাই সাংবাদিকতার মূল আত্মা।

Facebook Comments Box