২১ জুলাই ২০২৫, সোমবার। সময় তখন দুপুর ১টা ৬ মিনিট। ঢাকা কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করা বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান (F-7 BGI) মাত্র কিছুক্ষণের মধ্যেই উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকায় মাইলস্টোন কলেজ ভবনের ঠিক ওপরেই বিধ্বস্ত হয়। তখনই শুরু হয় এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডির। স্কুল ছুটির মুহূর্তে শিশুদের ক্লাসরুমে আছড়ে পড়া বিমানটিতে আগুন ধরে যায় এবং মুহূর্তেই দুতলা ভবনজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র অগ্নিকাণ্ড। এতে ঘটনাস্থলেই বহু শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক দগ্ধ হন। শেষরক্ষা হয়নি বিমানের একমাত্র পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মোঃ তৌকির ইসলামেরও।
দুর্ঘটনার পরপরই এলাকাজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। শিশুদের স্কুল প্রাঙ্গণ মুহূর্তে পরিণত হয় এক বিভীষিকাময় মৃত্যুপুরীতে।
মাইলস্টোন কলেজের প্রভাষক তাসলিমা আক্তার, যাঁর সন্তান চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র, ঘটনার সময় কলেজেই ডিউটিতে ছিলেন। ঘটনার মুহূর্তে তাঁর নিজের চোখেই দেখা আগুনে পুড়ে যাওয়া ভবনের দৃশ্য আজও তাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন,
“আমি ফোনে ছেলের ফর্ম মাস্টারের সঙ্গে কথা বলার এক মিনিট পরই বিকট বিস্ফোরণ শুনি। দৌড়ে গিয়েই দেখি আমার ছেলের ক্লাস ভবনের সামনে আগুন। পুড়ে যাওয়া তিনটি শিশুর দেহ মাটিতে পড়ে আছে, পোড়া শরীর, কাপড় কিছুই নেই।”
তিনি আরও জানান, তাঁর সন্তান অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরলেও, একই ক্লাসের বাকি শিশুরা কেউ আর বেঁচে নেই। সবাই দগ্ধ হয়ে নিহত হয়েছে।
এ দিনের সবচেয়ে সাহসী চরিত্র হয়ে উঠে এসেছেন শিক্ষিকা মেহরীন চৌধুরী। তিনি ভবনের দ্বিতীয় তলায় আটকে পড়া ছাত্রছাত্রীদের উদ্ধারে নিজের জীবন বাজি রাখেন। সেনাবাহিনীর উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন,
“ম্যাডাম ভিতরে ঢুকে একে একে অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থীকে নিচে নামিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু নিজে আর বের হতে পারেননি।”
এক উদ্ধারকারী সেনা সদস্য চোখের জল সংবরণ করতে না পেরে বলেন,”এইযে মা! এইযে মা হয়ে গেসে, আরেকটু পরই বের হইতে পারত!”
৮০ শতাংশ দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনিও মৃত্যুবরণ করেন। দেশবাসী আজ তাঁর এই আত্মত্যাগে শোকাভিভূত, কিন্তু গর্বিতও।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুতলা ওই ভবনের নিচতলায় ৩য়, ৪র্থ, ৫ম শ্রেণির এবং উপরতলায় ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণির ক্লাস চলছিল। দুপুর ১টা থেকে ১টা ১৫ মিনিটের মধ্যে অনেক শিক্ষার্থী ক্লাসেই অবস্থান করছিল। তারা বেঞ্চে বসা অবস্থায়ই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। জানালা ভেঙে বের হবার প্রাণান্ত চেষ্টা করেও অনেকেই বের হতে পারেনি। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানালার গ্রিল ভেঙে যখন ঢুকছিলেন, তখন দেখা গেছে কিছু শিশুর অর্ধগলিত হাত জানালার ফাঁকে আটকে আছে।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, এটি ছিল ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মোঃ তৌকির ইসলামের প্রথম একক উড্ডয়ন (Solo Flight)। উড্ডয়নের কিছু সময় পরই তিনি কন্ট্রোল রুমে জানান বিমানটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছে। তিনি জানান, বিমান ভাসছে না এবং বারবার নিচে পড়ে যাচ্ছে। কন্ট্রোল টাওয়ার তাকে জরুরি ইজেক্টের নির্দেশ দিলেও, তিনি তা না করে বিমানটিকে জনবসতি এড়িয়ে নিয়ে যেতে চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং বিমানটি মাইলস্টোন কলেজ চত্বরে বিধ্বস্ত হয়।
তাঁকে সিএমএইচ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
দুঃখজনক ব্যাপার হলো দুর্ঘটনার সময় ও পরবর্তী সময়ে সাংবাদিকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্বজন হারানো মা-বাবা, দগ্ধ শিশুদের পাশে দাঁড়িয়ে বারবার ক্যামেরা তাক করা, ট্রমাটাইজড শিশুদের কাছ থেকে ‘অনুভূতি’ জানতে চাওয়ার ঘটনায় অনেকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। এক অভিভাবক বলেন,
“ভাই, আপনারা এগুলা রাস্তায় গিয়ে করেন, এখন আমার সন্তানকে খুঁজে পাই না।”
এছাড়া উৎসুক জনতা ও কিছু অসচেতন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল এলাকায় ভিড় করে উদ্ধার ও চিকিৎসা কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটিয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসেবে এখনও চূড়ান্ত হয়নি। ISPR জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১৬৪ জনের বেশি আহত এবং একাধিক শিশুসহ প্রায় ১০০ জন নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। মঙ্গলবার (২২ জুলাই) রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে পতাকা অর্ধনমিত থাকবে।
সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় মানুষদের সহযোগিতায় উদ্ধার কার্যক্রম চালানো হয়। বার্ন ইউনিট, ঢাকা মেডিকেল, সিএমএইচ সহ একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে। বার্ন ইউনিটে জরুরি হটলাইন চালু করা হয়েছে: 📞 ০১৯৪৯০৪৩৬৯৭
২১ জুলাই ২০২৫-বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালো দিন। সামান্য যান্ত্রিক ত্রুটি, একটি বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমান, আর হারিয়ে যাওয়া শতাধিক শিশুর প্রাণ। যারা এই শিশুগুলোর স্কুল ব্যাগ আর জুতা গুছিয়ে দিয়েছিল সকালে, তারাই বিকেলে পুড়ে যাওয়া পোড়া ব্যাগের চিহ্ন খুঁজে ফিরেছে।
মায়েরা তাদের সন্তানের শেষ খাওয়ানোর কথা স্মরণ করে কাঁদছেন। বাবারা হাসপাতালের করিডোরে দৌড়ে ফিরছেন সন্তানকে একবার দেখার আশায়।
দেশ কাঁদছে আজ, শুধু নিজের সন্তানের জন্য নয়, অপরিচিত ছোট্ট হাতগুলোর জন্যও।
ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
আল্লাহ শহীদ শিশুদের জান্নাত দান করুন এবং সকল আহত ও স্বজনদের ধৈর্য ও সান্ত্বনা দিন। আমিন।














